প্রজন্ম মুখ

সভ্যতার উেসর সন্ধানে

চাঁদপুর শহরে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন রাখী রায়। পরিচিত জনদের কাছে যিনি পিউ নামেই বেশি পরিচিত। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে তার ভর্তির বিষয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. সৈয়দ কামরুল আহসান টিটু। অবশ্য প্রত্নতত্ত্ব বিষয়টিকে আত্মীকরণে সহযোগিতা করার জন্য তিনি তার বিভাগীয় সকল শিক্ষকের নিকট কৃতজ্ঞ। তাদের দেখেই প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে কাজ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হন রাখী। তার বাবা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এবং মা শিক্ষিকা ছিলেন। তার ভাই রূপক রায় চাঁদপুর সরকারি কলেজের প্রভাষক। চার সদস্যের পরিবারে পিউ বড় হয়েছেন শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে। মাতৃপীঠ সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও চাঁদপুর সরকারি কলেজ হতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনার পাট চুকান। ছেলেবেলায় বাবা-মায়ের উত্সাহে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মা-বাবা তাকে শিখিয়েছেন, নিজের নীতি বিসর্জন না দিয়ে যেকোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় শুধুমাত্র মেধা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। তার স্বামী বিষ্ণু রায় বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। তার দুই সন্তান—পূর্ণ অর্চিত ও রূপকথা বুনন। স্বামী-সন্তান-শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে তার একান্নবর্তী পরিবার। তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে পিউ বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে মাস্টার্স সম্পন্ন করে কিছুদিন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, এরপর CODA কলেজ এবং তারপরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে যোগদান করি। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি এর প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে যোগদানের ফলে। সোনারগাঁও উপজেলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জরিপ, কুমিল্লা ময়নামতিতে উত্খননসহ দেশ-বিদেশে (ভারত, দ. কোরিয়া) বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছি। চট্টগ্রাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে কর্মরত থাকা অবস্থায় মুরং, চাকমাসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর জীবনাচরণ ও হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যকলা বিষয়ে গবেষণা করেছি। বর্তমানে আমি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রত্ন.) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি এবং Origin of Stone Artifact বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছি।’ নিজের পেশা নিয়ে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ব হলো নিজের, জাতির সভ্যতার উেসর সন্ধান করা। বাংলাদেশের সকল প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সম্বলিত নিদর্শনের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে কাজ করতে পেরে আমি ঈশ্বরের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। সহকর্মীদের সহযোগিতা, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ—বিশেষ করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে কাজের পরিবেশ খুবই স্বাচ্ছন্দ্যময়। এ ছাড়া প্রায়ই আমাদের মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হয়। প্রত্ন এলাকার পার্শ্ববর্তী স্থানীয় জনসাধারণের, প্রশাসনের সচেতনতা ও সার্বিক সহযোগিতা কাজের গতিকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলে।’ নতুনদের কাজের মূল্যায়নে তিনি বলেন, ‘নবীনরাই ইতিহাসকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। পৃথিবীব্যাপী আবিষ্কৃত নতুন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসমূহ নবীনরা প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় প্রয়োগ করে থাকে। সুতরাং তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেক শিক্ষণীয় রয়েছে। তারা উত্খনন ও অন্যান্য গবেষণা কাজে প্রচুর পরিশ্রম করে তাদের বহুমাত্রিক চিন্তাধারা প্রত্নতত্ত্বকে সকল জনগণের নিকট উপস্থাপনে সহায়তা করে থাকে।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন সম্পর্কে জানালেন। পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটি সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতিমুক্ত বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মতো একটি স্বদেশ পায় এই স্বপ্ন দেখেন তিনি। রাখী রায় ডাক নাম :পিউ জন্মতারিখ :২২ আগস্ট মায়ের নাম :বন্দনা পোদ্দার বাবার নাম :রাম নারায়ণ রায় প্রথম স্কুল :৪নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদপুর প্রিয় মানুষ :আমার সহজ সরল মা, যিনি নিজের জন্য কখনও ভাবেন না। প্রিয় উক্তি :সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। প্রিয় পোশাক :শাড়ি সাফল্যের সংজ্ঞা :যে অবস্থানেই কাজ করি না কেন তার গভীরে পৌঁছাতে সমর্থ হওয়া, পরস্পরকে সহযোগিতা প্রদান ও গ্রহণের মাধ্যমে ফলাফল সঠিকভাবে উপস্থাপন করা।