৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় সেরিব্রাল পলসি দিবস
ওদের জন্য আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:২৪
বিয়ের পর সবার জীবনে একটাই আকাঙ্ক্ষা থাকে তাদের সন্তান সুস্থ-সবল হয়ে জন্ম নিক। আমরাও তার বাইরে ছিলাম না। বহু প্রতীক্ষার পর মায়ের কোল জুড়ে এলো আনিলা। কিছুদিন যেতেই আমরা বুঝতে পারলাম আর দশটা শিশুর মত বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়গুলো স্বাভাবিক নিয়মে আনিলার ধাপে-ধাপে এগোচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। বুকে আশা নিয়ে যে আমাদের সন্তানের কোন রকম সমস্যা নেই এই কথাটি শুনবো। কিন্তু আনিলা সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত শনাক্ত করে দিলেন ডাক্তাররা। মাত্র একটি শব্দ লিখে তাদের দয়িত্ব শেষ করে দিলেন। শব্দটি আমাদের কাছে ছিল একদমই নতুন।
সদ্য শনাক্তকৃত একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু যে কিনা আর দশজন স্বাভাবিক শিশুর মত প্রকৃতির নিয়মে বেড়ে উঠবে না সেই কথা বুঝিয়ে বলে সদ্য বাবা-মা হওয়া দম্পতিকে মানসিকভাবে সহযোগিতা কেউ করলো না। শুধুমাত্র একটি শব্দই আমাদের জীবনে সবকিছু ওলট-পালট করে দিল, স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে গেল, মাথায় বাজ পড়ল। প্রতিদিনই আশা করতাম ডাক্তারদের সব কথা মিথ্যা হবে। ধীরে ধীরে আত্মস্থ হয়ে জীবনের আরো এক নতুন অধ্যায়ের যাত্রা শুরু করলাম। খুব বেশি অপেক্ষা না করে নিজেকে প্রস্তুত করে বিভিন্নজনের পরামর্শ মোতাবেক আমার সন্তানকে নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম।
সেই সব কষ্টের, দুঃখের, বেদনার দিনগুলোতে আমার পরিবারের সেই ছোট্ট সদস্য থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ আমাদের মত সদ্য শনাক্তকৃত সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত (শারীরিক প্রতিবন্ধী) শিশুর বাবা-মাকে যেভাবে ভালবাসা দিয়ে, তাদের শ্রম দিয়ে, প্রতি মুহূর্ত আমাদের সাহস যুগিয়ে সাহায্য, সহযোগিতা করেছিল তা যদি সেদিন আমরা না পেতাম তাহলে আজ আমরা আনিলা নামক সেই শিশুর গর্বিত বাবা-মা হতে কখনই পারতাম না। হতাশা নামক শব্দটি গ্রাস করে ফেলতো আমাদের। যাদের ঘরে এ ধরনের শিশুর জন্ম হয় তাদের প্রথম সাহায্য প্রয়োজন পরিবার থেকে। আমরা ভাগ্যবান ছিলাম এমন পরিবার পেয়ে যাদের কাছে শিশুর পরিচয় শুধুমাত্র শিশু হিসাবে, প্রতিবন্ধী শিশু হিসাবে নয়।
আমাদের দেশের মত উন্নয়নশীল দেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্মের জন্য সর্বপ্রথম মাকে দোষ দেয়া হয়, মাকে নানাভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, কটুক্তি শুনতে হয় এমন কি শেষ পর্যায়ে হয়তো সংসারটাই ভেঙ্গে যায়। এ সকল শিশুকে পিতা-মাতার পাপের ফসল হিসাবে ধরে নেয়া হয়। চিকিত্সা তো দূরের কথা ঝাড়, ফুঁক, পানিপড়া, তাবিজ-কবজ করাতে করাতে শিশুর জীবন থেকে তার সুস্থ হওয়ার মূল্যবান সময়টুকু পর্যন্ত চলে যায়। আবার অনেক পরিবারই আছে যারা ঘরে আটকিয়ে রাখেন তাদের সন্তানটিকে। তথাকথিত শিক্ষিত সমাজে এ দৃশ্য খুবই দেখা যায়। আর স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর আয়ের উত্স হিসাবে এই শিশুগুলোকে ভিক্ষাবৃত্তির উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। আমি কষ্ট পাই তখন, যখন দেখি একজন মা-ই তার দু’সন্তানকে দু’রকম ভাবে দেখছেন।
আমাদের দেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। আমি মনে করি আনিলাসহ তার মত প্রতিটি শিশুরই শিক্ষা থেকে শুরু করে বিনোদন, অবসর যাপনের জন্য ঘুরে বেড়ানোর অধিকার রয়েছে। তাই প্রতিবছর আমরা ওকে কোন না কোন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। জাফলং, লালা খাল, চা বাগান, মাধবকুন্ড, বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়, নীলগিরি, সেন্টমার্টিন, ছেড়া দ্বীপ, কক্সবাজার এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আমরা ওকে বেড়াতে নিয়ে যাইনি। তবে এই নিয়ে যাওয়াটা খুব মসৃণ নয়।
আমার আনিলার সীমাবদ্ধতা অনেক। প্রতি মুহূর্তে আমাকে বলে: ‘মা আমি বড় হচ্ছি, আমার ভাল লাগে না সব কাজে তোমাদের সাহায্য নিতে’। কিন্তু আমরা এমন এক হতভাগা সমাজে বসবাস করি যে সমাজের মানুষগুলো বুঝে নাকি না বুঝে এরকম অবুঝ শিশুগুলোকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় বা দিতে কার্পণ্য করে না তারা আর দশজন শিশু থেকে অন্যরকম। এইতো দু’দিন হলো আমরা বান্দরবান, কক্সবাজার ঘুরতে বেরিয়েছি। সমুদ্র ওর খুব পছন্দের জায়গা। দেশ-বিদেশে যেখানেই হোক ও সমুদ্রে যেতে পছন্দ করে। প্রায়ই এমন হয় যে ছোট থেকে শুরু করে বড় মানুষ পর্যন্ত সব কাজ ফেলে ওকে দেখে। একদিন এমনিই একটি ঘটনা ঘটল যে একদল শিশু, বয়স্ক মানুষ সমুদ্র দেখা বাদ দিয়ে আনিলাকে দেখা শুরু করলো এবং বিভিন্ন প্রশ্ন করে বিরক্তির পর্যায় নিয়ে গেলো। মা হয়ে এরকম অবস্থা দেখা ও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়া যে কত কষ্টদায়ক তা কেউ বুঝবে না।
আমার কষ্টের চেয়ে শতগুণ বেশি কষ্ট আনিলার এবং হয়তো এখন এই বয়সে কিছুটা লজ্জা লাগারও। একপর্যায়ে ও বলেই ফেললো: ‘আমাকে দেখার কি আছে, সামনে এত সুন্দর সমুদ্র, আপনারা সমুদ্র দেখেন’। আমি জানি না এ সমাজের মানুষের জ্ঞান, সচেতনতা বৃদ্ধি কবে হবে? নাকি আদৌ হবে না। তারা বোঝে না তাদের এই নেতিবাচক দৃষ্টি, মনোভাব, এই সকল শিশুর মনকে কতটা ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে। পরিসংখ্যান মতে, আনিলার মত শিশু এদেশে অনেক আছে। কিন্তু তাদের পরিবার যদি তাদের সন্তানদের নিয়ে সব জায়গায় বের হতো তাহলে মানুষ তাদেরকে সমাজের বাইরের কেউ না ভেবে তাদেরই একজন ভাবার মানসিকতা গড়ে তুলতো। এসকল শিশুকে বাইরে যেহেতু খুব কম দেখা যায়, তাই তাদের এত কৌতূহলোদ্দীপক দৃষ্টি।
আমাদের মত হতভাগ্য বাবা-মাকে এভাবেই প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে আমাদের সন্তানদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে। সমাজের আর দশজন ব্যক্তির মত এসকল বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুকে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বসবাস করার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য পরিবার, সমাজ, সর্বোপরি রাষ্ট্রের এগিয়ে আসা একান্ত জরুরি।
সর্বোপরি আমাদের রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব এসব শিশুর শিক্ষাসহ সকল মৌলিক অধিকার থেকে শুরু করে বিনোদন, অবসর কাটানোর সবরকম সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে দেয়া। এই লেখার মাধ্যমে আমার সন্তানসহ সমাজের অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কিছু বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই—
হযরত শাহজালাল (রা.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জায়গায় প্রতিবন্ধী বান্ধব টয়লেট থাকা একান্ত জরুরি যা বর্তমানে নেই।
বিভিন্ন স্টেশনের ট্রেন ও প্লাটফর্মের দূরত্ব ঠিক করা এবং র্যাম্প করে দেয়া। যেমন: রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে যে র্যাম্প রয়েছে তাতে যেকোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সব হোটেলে না হলেও পর্যটন স্থানগুলোর কিছু হোটেলে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণ। যেহেতু সমুদ্র সৈকতের বালুতে হুইল চেয়ার নিয়ে যাওয়া কঠিন। তাই সমুদ্রতটের কাছ পর্যন্ত সিমেন্টের পথ করে দেয়া, যা হয়তো কিছুটা স্বস্তি দিবে তাদের এবং তাদের পরিবারকে।
সেন্ট মার্টিনে যেতে হলে যে কাঠের ব্রীজ ব্যবহার করা হয় তা যদি স্থায়ীভাবে করা হয় তাহলে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী অনেক ব্যক্তি, শিশুই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হবে না।
পাসপোর্ট অফিসের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কমপক্ষে ১০টি সিঁড়ি নিচে নেমে বেইজমেন্টে গিয়ে ছবি তুলতে হয়, যা এ ধরনের শিশুসহ শারীরিকভাবে অন্যান্য প্রতিবন্ধিতার স্বীকার ব্যক্তিবর্গের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।
সরকারিভাবে প্রতিটি স্কুলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ভর্তি নেয়ার ব্যাপারে বলা হচ্ছে। কিন্তু গুটিকতক স্কুল এই সকল শিশুর ভর্তি নিচ্ছে, আর সবাই এ বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। যা খুবই দুঃখজনক। তবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ক্লাস সেটআপ, অভিভাবকদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বোপরি প্রবেশগম্যতার অভাবের ফলে এ সকল শিশু তাদের ইচ্ছেমত যেকোন স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না। আনিলা আজকাল বলে— স্কুলের ছোট ছাত্রছাত্রী, অন্যান্য অভিভাবকের সামনে পাঁজাকোলা করে দোতলায় স্কুলে উঠতে তার আত্মসম্মানে লাগে। যেহেতু স্কুলের টয়লেট খুব ছোট সেহেতু পাঁচ ঘন্টা টয়লেটে না যেতে পেরে তার পেটব্যথা করে। এতকিছু সীমাবদ্ধতার পরেও আমাদের করার কিছু নেই। আমরা নিরুপায়, অসহায়।