ভিয়েতনাম

শিশুদের আটকে কাজ করানো হয়

বিভিন্ন স্থান থেকে পাচার করে আনা শিশুদের আটকে রেখে জোর করে কাজ করানো হচ্ছে ভিয়েতনামে। ভাগ্য খুব ভালো হলে কখনো কখনো ওই শিশুরা নামমাত্র অর্থ পায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুরা পারশ্রমিক পায় না। কাজে ভুলভাল হলে উল্টো কপালে জুটে নির্দয় পিটুনি। মানব পাচার রোধে সমপ্রতি একটি আইন পাস হয়েছে ভিয়েতনামে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ না থাকায় ও পাচারকারীদের সামান্য শাস্তির বিধান থাকায় সেখানে এখনো চলছে মানব পাচার। গত বছর হো চি মিন সিটির একটি বহুতল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন কিশোর যে যেদিকে পারে দৌড় শুরু করে। পরে জানা গেছে, কারিগরী প্রশিক্ষণের কথা বলে তাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসে আটকে রাখা হয়েছিল। ওই তিন কিশোরের এক জন হিউ। বয়স ১৮। সে জানায়, যাতে ধরা না পড়ি সেজন্য ভয়ে আমি দৌড়াতে থাকি। খামু নামে ক্ষুদ্র নৃতাত্তিক গোষ্ঠীর সদস্য হিউ এর বাড়ি ডিয়েন বিয়েনের ছোটো একটি গ্রামে। ভিয়েতনামের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রদেশটি ভিয়েতানামের অন্যতম দরিদ্র প্রদেশ। এর পাশেই চীন সীমান্ত। হিউ তার গ্রামে কয়লা দিয়ে ইট তৈরি করতো। কিছুদিন পর অপরিচিত এক নারী হিউকে জানাল তাকে কারিগরী প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। হিউ এর বাবা-মাও এতে খুব খুশি হয়। কারণ তারা মনে করেছিল এর ফলে হিউ আগের চেয়ে আরো বেশি অর্থ উর্পাজন করতে পারব। হিউ এর মতো আরো ১১ জন শিশুকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় ২১০০ কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ ভিয়েতনামের হো চি মিন শহরে। সেই থেকে পরবর্তী দুইটি বছর তাদেরকে একটি ছোট রুমে গাদাগাদি করে রাখা হত আটকে। কাজ করতে বাধ্য করা হত একটি ছোট গার্মেন্টস কারখানায়। সকাল ছয়টায় কাজ শুরু হত। কাজ শেষ হত গভীর রাতে। কাজে কোন ছোটখাট ভুলভাল হলে তাদের কপালে জুটত লাঠিপেটা। ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাচার হওয়া প্রায় ২৩০ জন শিশুকে উদ্ধার করেছে ভিয়েতনামের দাতব্য সংস্থা ব্লু ড্রাগন চিলড্রেন ফাউন্ডেশন। যখন ওই শিশুদের অভিভাবকরা জানতে পারল তাদের সন্তানের বিভিন্ন জায়গায় আটকে রেখে জোর করে কাজ করানো হচ্ছে তখন তারা তাদের ফিরিয়ে নেয়। পাচার করে আনা শিশুদের পতিতাবৃত্তি থেকে শুরু করে ভিক্ষাবৃত্তি অর্থাত্ এমন কোন কাজ ছিলনা যা করানো হত না। বেশিরভাগ শিশুকে কাজ করতে বাধ্য করা হতো ভিয়েতনামের বৃহত্তম শিল্প শহর হো চি মিনে। ব্লু ড্রাগনের এক কর্মকর্তা বলেন, গত বছর আমরা একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ১৪ জন শিশুকে উদ্ধার করি। ওখানে একটি ছোট রুমে কারখানার মেশিনের পাশে খাবার খাওয়া, কাজ এবং ঘুমাতে হত তাদের। কারখানার মালিক তাদের দিনে মাত্র একবারই বাথরুমে যেতে দিত। তাও মাত্র আট মিনিটের জন্য। ওই সময়ের ভেতরই তাদের দাত ব্রাশ, গোসল ও অন্যান্য কাজ সারতে হত। ওই শিশুদের বেশিরভাগই ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর। মূলত পাচারকারীরা ভিয়েতনামের প্রত্যন্ত এলাকা থেকেই দরিদ্র শিশুদের ধরে নিয়ে আসত। তাছাড়া যে এলাকা থেকে তাদের ধরে নিয়ে আসা হত, সেই এলাকার মানুষ জনও আসলে জানে না মানব পাচার কি? পাচারকারীরা গ্রামে গ্রামে অভিভাবকদের গিয়ে বলে, আপনাদের সন্তানদের আমাদের কাছে দিন, ওদেরকে কারিগরী প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পরে তারা অনেক অর্থ আয় করবে। প্রলোভনে পড়ে অভিভাবকরাও কোন কিছু না ভেবেই সন্তানতের তুলে দেন পাচারকারীদের হাতে। বেসরকারি সংস্থার মতে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। চীন, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার পতিতালয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে নারীদের পাচার করে আনা হচ্ছে। এছাড়া চীনের এক শিশু নীতির কারণে সেখানে ছেলে শিশুর চাহিদা বাড়ছে। ভিয়েতানামি মায়েরাই এ ক্ষেত্রে তাদের ছেলে শিশুদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দিচ্ছে চীনাদের কাছে। আবার অনেক সময় চীনের প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বিক্রি করা হচ্ছে চীনাদের কাছে, তাদের গর্ভ ব্যবহার করার জন্য। যে গার্মেন্টস কারখানা হিউকে জোর করে আটকে রেখে কাজ করাত সেই প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৫০০ ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। বহাল তবিয়তে ওই কারখানার মালিক এখনো কারখানার কাজ কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।