আত্মঘাতী মাদকাসক্তি ও ইয়াবা নিয়ে নতুন কৌশল

ভয়ঙ্কর এক নেশার নাম ‘ইয়াবা’। রাসায়নিক চরিত্র, শক্তি, কার্যকারিতা ও প্রতিক্রিয়া বিচারে অ্যামফিটামিন, মেথামফিটামিন কিংবা কোকেনের চেয়েও ইয়াবা শক্তিশালী উচ্চমাত্রার উত্তেজক মাদকদ্রব্য। এটি দীর্ঘদিন ব্যবহারে ধীরে ধীরে ফুসফুস, লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়। এ নেশায় আসক্ত ব্যক্তির চরম অবসাদ, হতাশা, বিষাদ ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। ব্যবহারকারী তখন যে কোনো রকম অপ্রত্যাশিত আচরণ করতে পারে, এ অবস্থায় মানুষ খুন করাও বিচিত্র কিছু নয়। এমনকি হতাশা থেকে মাদকাসক্তকে আত্মহত্যার দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা শুরু থেকে ইয়াবাকে এক ধরনের যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট হিসেবে প্রচার করে। তখন এর নাম বলা হয় ক্রেজি মেডিসিন, হিটলারস ড্রাগ, টেস্টি ভায়াগ্রা প্রভৃতি। পরে তরুণীরা ব্যাপকভাবে ইয়াবা ব্যবহার শুরু করলে এর আরো একটি নাম যোগ হয় ‘দ্য কুইন’। মেয়েরা মনে করে এ ট্যাবলেট খেলে লাবণ্য বাড়ে, শরীর ঝরঝরে থাকে ও স্লিম হওয়া যায়। এটা যে নেশার ট্যাবলেট অনেকে তা জানে না। কিছুদিন খাওয়ার পর তার মনে হয় এই ট্যাবলেটের প্রতি এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়েছে। সুতরাং ইয়াবা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা থেকেই তরুণ-তরুণীরা ইয়াবার দিকে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

ইয়াবা ও মাদক চোরাকারবারিরা পাচারের ধরন পাল্টেছে। বর্তমানে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার কারণে পাচারকারীরা চালান পাচার নির্বিঘ্ন করতে বেছে নিয়েছে তাদের পাকস্থলি। টাকার লোভে মৃত্যু ভয়কেও তোয়াক্কা করছে না তারা। পুরুষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকস্থলিতে ইয়াবা ও মাদক পাচারকারীদের মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে।

গত ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের সময় এক ব্যক্তির পেটে পাওয়া গেছে ১১ প্যাকেট ইয়াবা। ইতিপূর্বে গত ৩ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে টেকনাফের মৃত নারীর পেট থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল দেড় হাজার পিস ইয়াবা। এগুলোতে ৫৭টি প্যাকেট রাখা ছিল। এর আগেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাকস্থলিতে ৪২ শ ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় কক্সবাজার থেকে আসা বিমানযাত্রী। ইয়াবা বের করার জন্য তাকে ভর্তি করা হয়েছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। প্রায় ১৮ ঘণ্টা চিকিত্সা শেষে পাকস্থলি থেকে বের করা হয় ইয়াবার চালান। পেটের ভেতর ইয়াবা লুকিয়ে যাতায়াত এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়ানো সহজ। বেশি টাকার লোভে পড়ে পাকস্থলিতে ইয়াবা বহন করছিল পাচারকারীরা। একজন দিনমজুর মাত্র ১৫ হাজার টাকার জন্য নিজেই ইয়াবার পোঁটলা বানিয়ে গিলে খেয়েছিলেন।

গত ২৯ মার্চ কক্সবাজারের টেকনাফে ১৩ রোহিঙ্গার পেটের ভেতর থেকে ৪৩ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। টেকনাফ সীমান্ত অতিক্রম করা ২৩ রোহিঙ্গাসহ ২৬ জনকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ রোহিঙ্গার পেটে এক্স-রে করে ইয়াবা নিশ্চিত করা গেছে। তাদের প্রত্যেকের পেটে ৩ হাজার পিসেরও বেশি ইয়াবা পাওয়া যায়।

সূত্র থেকে জানা যায়, যাদের পাকস্থলি থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে তাদের প্রায় সবারই বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে, এইসব পাচারকারী টেকনাফ থেকে ইয়াবা চালান বহন করে ঢাকায় নিয়ে আসে। বিগত দুই বছর ধরে তারা এ বিপজ্জনক পেশায় জড়িত। ইতোমধ্যে তারা ২০ থেকে ৩০টি করে চালান ঢাকায় পৌঁছে দিয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন কৌশলে তারা ইয়াবার চালান এনেছে। পুরনো পদ্ধতিগুলো আইনশৃঙ্খলা সদস্যরা জেনে যাওয়ায় তারা কৌশল পাল্টেছে।

সিএন্ডএফ এজেন্সির নামেও ইয়াবার ব্যবসা জমজমাট। পোশাক-আশাক একেবারে ভদ্রলোক, দেখে বোঝার উপায় নেই, ইয়াবার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অথচ তা নিয়েই কারবার করছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তাদের কখনো গ্রেফতার হতে দেখা যায়নি। সরাসরি টেকনাফ থেকে তারা ইয়াবার চালান এনে রাজধানীতে নানা কৌশলে পৌঁছে দিত খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফাঁদে আটকা পড়েছে এ চক্র।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হচ্ছে- ১. মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। ২. মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। ৩. মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ৪. বেকারদের কর্মসংস্থান করা। ৫. স্কুল-কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান এবং সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলা কার্যক্রমকে বাধ্যতামূলক করা। ৬. মাদকাসক্তদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি।

n লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস (মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা)