হিসাব-নিকাশের অন্যগল্প
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:০০
ডাকনাম :নাজমুল
জন্মতারিখ ও স্থান :১০ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহ
মায়ের নাম :মরহুমা সৈয়দা তাহমিদা বেগম
বাবার নাম :মরহুম মো. সিরাজুল হক খান
প্রথম স্কুল :সিংহশ্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার মা-বাবা
অবসর কাটে যেভাবে :লেখালেখি করে
সাফল্যের সংজ্ঞা :কোনো কাজ করে নিজের আত্মতৃপ্তিই সফলতা।
তার বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, সেই স্কুলেই মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করেন। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সিংহশ্রী ইউনিয়ন হাই স্কুলের সেই মাঠের কথা এখনও ভুলতে পারেন না তিনি। বিকেল হলেই গোল্লাছুট অথবা ঝুম বৃষ্টিতে ফুটবল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার স্মৃতি মাঝে মাঝে তাকে খুব নস্টালজিক করে তোলে। তৌহিদ ছেলেবেলা থেকে বরাবরই স্কুলে প্রথম হতেন। খুব যে পড়তেন তা কিন্তু না, তবে নিজের আগ্রহ আর বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা সবসময়ই ছিল।
প্রজন্মের মেধাবী এই মানুষটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্সে স্নাতক শেষ করেই যোগ দেন অগ্রণী ব্যাংকে। সেখান অল্প সময়েই নিজের প্রতিভার সাক্ষর রাখতে সম্পন্ন হন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রাইম ব্যাংকে কাজের আমন্ত্রণ পান। প্রিন্সিপ্যাল অফিসার হিসেবে সেখানে যোগ দেন তিনি। প্রায় চৌদ্দ বছরের সফল ক্যারিয়ার তার সেখানে। প্রায় আট বছর তিনি ছিলেন সিন্ডিকেশন বিভাগের প্রধান। দেশীয় ব্যাংকগুলোকে তিনি এর সাথে পরিচিত করান। নিজের ক্যারিয়ারের এই দিকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। প্রাইম ব্যাংকে সর্বশেষ তিনি এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেব দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১১’র শেষের দিকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ দেন ব্যাংক এশিয়াতে। হেড অব কর্পোরেট অ্যাসেটস হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গ্রীন ব্যাংকিং টিমের টিম লিডারও তিনি। আর গ্রীন ব্যাংকিং যে শুধুই নামের খাতিরে নয়, সেই প্রমাণ তিনি রেখেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ব্যাংকের কর্পোরেট অফিসে বিদ্যুত্ ব্যয় কমিয়েছেন প্রায় চল্লিশ শতাংশ। এই ধারা দিনকে দিন আরও জনপ্রিয় হবে বলে মনে করেন তৌহিদুল আলম খান। আর শুধু ব্যাংকিংই নয়, সবক্ষেত্রেই সবুজ আর সজীবতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন তিনি। তৌহিদুল আলম খান একজন স্বীকৃত কস্ট এন ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট। এর বাইরে ইসলামিক ব্যাংকিংয়েও যুক্তরাজ্য থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন তিনি। পেপারলেস কর্পোরেট ব্যাংকিং ধারার অন্যতম পথিকৃত্ তৌহিদুল আলম খান।
আমাদের দেশে নতুন অনেক ব্যাংক যাত্রা শুরু করল, এগুলোকে কেমনভাবে দেখছেন অভিজ্ঞ এই ব্যাংকার? উত্তরে তিনি জানান, কর্মসংস্থানের সুযোগ এতে বাড়ছে, এটা যেমন ঠিক। একই সাথে মাথায় রাখতে হবে, এখানে যোগ্য লোক কেমন আছে। এর বাইরেও দেখতে হবে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কত ব্যাংকেরই বা চাহিদা আছে, থাকলেও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের সাথে তা তাল মিলিয়ে চলতে পারবে কি না। যদি না পারে, তাহলে নতুন ব্যাংকগুলোকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। শুধু নতুন কেন, সব ব্যাংকগুলোর কাছেই এ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ভিন্ন ধারার ব্যাংকিংয়ের ভেতরে এসএমই ইদানীং খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে একমত পোষণ করেন তৌহিদুল আলম খান। এ ধরনের কাজে ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসায় মধ্যম সারির উদ্যোক্তারা লাভবান হচ্ছে, তাদের ব্যবসায়িক পরিসর বাড়ছে। এতে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকেরও লাভ হচ্ছে। এর পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে ব্যাংক অনেক কাজ করতে পারছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত অংকের বাইরেও এগিয়ে আসছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংক এশিয়াও যেমন দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছেছে তাদের সেবা নিয়ে। তৌহিদুল আলম খান দীর্ঘদিন দেশের ব্যাংকিং ধারার সাথে জড়িত আছেন। তরুণ প্রজন্মের সাথে কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কতটা উপভোগ করেন তিনি প্রজন্মের এই মেলবন্ধন। তিনি মনে করেন তরুণদের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, তারা প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করেছে। অনেক নতুন নতুন বিষয়ে তাদের উচ্চশিক্ষা আছে, যেটা এই সময়ে অনেক দরকার আন্তর্জাতিক মানের সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য। এর বাইরে তৌহিদুল আলম খানের কাছে মনে হয়, তরুণরা একটু অল্প সময়েই অনেক কিছু পেতে চায়, এটা খারাপ নয়, তবে যোগ্যতার আলোকেই নিজেকে এগিয়ে নিতে হবে। সর্বোপরি তিনি জোর দেন দুই প্রজন্মের মেলবন্ধনের দিকে। নতুনদের ইচ্ছা, আগ্রহ, শিক্ষা আর পুরোনোদের প্রজ্ঞার আলোকেই এগিয়ে নিতে হয় সময়টাকে।
নতুনদের জন্য পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টিম নিয়ে কাজ করাটা অনেক বেশি জরুরি। একজনে যে কাজ করা যায় না, অনেকে মিলে সেই কাজটা অনেক সহজে করে ফেলা যায়। আর শেখার আগ্রহ থাকতে হবে, সেটা ছোট-বড় যে কারও কাছ থেকেই হতে পারে। এখন প্রযুক্তির আলোকে সব কিছু তো অনেক সহজেই জানতে ও শিখতে পারা যায়, এই দিকটা কাজে লাগাতে হবে। পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলার ক্ষমতা থাকতে হবে, নিঃস্বার্থভাবে কোনো কাজ করলে সেটার ফলাফল কখনও খারাপ হয় না, এই উপলব্ধিটা থাকতে হবে।’ তবে জীবনের প্রতিটা সময়েই বাবা-মায়ের আর গুরুজনদের কথা শোনার উপর জোর দিলেন তিনি। তারা যতই জানুক বুঝুক, গুরুজনদের অবজ্ঞা করে কখনও উপরে ওঠা যায় না। আজ তার বাবা-মা বেঁচে নেই, কিন্তু তাদের অবদান ঘুণাক্ষরেও ভুলতে পারেন না তিনি। মায়ের কারণেই ঢাকায় আসা, তা না হলে হয়তো পড়াশোনাটা এতদূর চালাতে পারতেন না। মায়ের মৃত্যুর পর বাবাই তাদের সে অভাব পূরণ করেন। অনেক কষ্টে হলেও কখনও হার মানেননি। ছোট চার বোন নিয়ে তৌহিদের পরিবার, তারাও তাদের মতো আগলে রেখেছেন একে অন্যকে। তৌহিদ তাদের কথাও স্মরণ করেন কৃতজ্ঞতার সাথে। টিউশনি করেই নিজের হাত খরচটা চালাতেন। আর সেই টাকা জমিয়ে বোনের বিয়ের গয়নাও দিয়েছিলেন তিনি। এতো সীমাবদ্ধতার মাঝেও তাদের যে আত্মিক বন্ধন সেটা ছিল অটুট। আর এই বিষয়গুলো এখনও তার হূদয়ে দাগ কেটে আছে। প্রজন্মের এই আইকন ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। একটা সময় দৈনিক ইত্তেফাকের তরুণকণ্ঠের নিয়মিত লেখক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি জার্নালে এখন নিয়মিত তার লেখা ছাপা হয়। আন্তর্জাতিক মহলে সেগুলো সুনাম কুড়াচ্ছে, একই সাথে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে তাদের মাঝেও ভালো ধারণা তৈরি হচ্ছে।
ব্যক্তিজীবনে সত্ ও সুখী এই মানুষটা এখন মিরপুরের পল্লবীতে থাকেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে। সহধর্মিণী রিপা তার সব কাজের সঙ্গী, সবকিছু আগলে রাখেনও তিনি। কন্যা তরী আর পুত্র সামিন পড়ছে স্কলাস্টিকায় যথাক্রমে ষষ্ঠ ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে। তারাও তাদের পিতামহ আর বাবা-মায়ের আদর্শে লালিত হবেন, এমনটাই স্বপ্ন এই দম্পতির তাদের। আর তৌহিদও তার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার দিয়ে ভালো এক অবস্থানে পৌঁছাবেন, বিশ্বমানের কাজ হবে আমাদের দেশে, সেই যাত্রায় তার পথচলা সুগম হোক।