আইএফএ বার্লিন ২০১৩
আধুনিক প্রযুক্তি পণ্যের সমারোহ
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৫
প্রযুক্তি বিশ্বে যতগুলো প্রদর্শনী বছরজুড়ে হয়ে থাকে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো জার্মানির বার্লিনের আইএফএ। অন্যান্য বছরের মতো এই বছরেও এই আয়োজনে অংশ নিয়েছে প্রযুক্তি বিশ্বের বড় বড় সব জায়ান্ট এবং তারা তাদের সর্বশেষ সব প্রযুক্তি নিয়েই উপস্থিত হয়েছে এই আয়োজনে। আর এসব পণ্য প্রদর্শনের পর থেকেই সাড়া পড়ে গেছে প্রযুক্তি বিশ্বে। এবারের আয়োজনে নতুন যেসব প্রযুক্তি পণ্য প্রদর্শিত হয়েছে, তার মধ্য থেকে আলোচিত কিছু পণ্য ও প্রযুক্তির কথা তুলে ধরা হলো এই লেখায়।
স্মার্ট হাতঘড়ি
আইএফএ’র এবারের আয়োজনে শুরুতেই সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে ফেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্মার্ট হাতঘড়ি। এদিক থেকে শুরুতেই আসবে স্যামসাংয়ের নাম। তাদের স্যামসাং ‘গ্যালাক্সি গিয়ারে’র জন্য দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষা করছে প্রযুক্তি বিশ্ব। এর বাইরে সনি’র স্মার্টওয়াচ২ যথেষ্টই সাড়া ফেলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সামনের সময়গুলোতে এই স্মার্ট হাতঘড়িগুলোই প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় প্রযুক্তি পণ্য হিসেবে রাজত্ব করবে।
স্মার্ট টেলিভিশন এবং এইচডিএমআই ২.০
স্মার্ট এই যুগে সবদিকেই স্মার্ট পণ্যের ছড়াছড়ি। টেলিভিশনেও স্মার্ট প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে কয়েক বছর হলো। ক্রমাগত এই প্রযুক্তি উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে উঠছে। সেই ধারাবাহিকতায় আইএফএ’র এই আয়োজনে সবার থেকে এগিয়ে স্যামসাং বাজারে এনেছে ৯৮ ইঞ্চির বৃহদাকৃতি এস৯ টিভি। আল্ট্রা হাইডেফিনেশন (ইউএইচডি) এই টেলিভিশনকে কেউ সিনেমা হলের বিকল্প হিসেবে ভাবলেও খুব একটা ভুল হবে না। স্যামসাংয়ের সাথে আকারে না পারলেও একদিক থেকে এগিয়ে রয়েছে এলজি। বাঁকানো টেলিভিশনের মধ্যে সবচেয়ে বড় টেলিভিশনটি তারাই প্রদর্শন করেছে আইএফএ বার্লিনের এই প্রদর্শনীতে। তাদের ৭৭ ইঞ্চি আকৃতির বাঁকানো আল্ট্রা হাইডেফিনেশন ওএলইডি টেলিভিশনটিও ৪কে রেজ্যুলেশনের ছবি সমর্থন করে। এর বাইরে এলজি’র গ্যালারি ওএলইডি টিভি আবার একটি ছবির ফ্রেমের মতো আটকে থাকতে পারে দেয়ালে। ফলে ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনে এটি উল্লেখযোগ্য একটি ডিভাইস হিসেবেও কাজ করতে পারে অনায়াসে।
এদিকে স্মার্ট টেলিভিশনগুলোর জন্য এইচডিএমআই প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক পুরোনো। দীর্ঘদিনেও এর কোনো আপডেট আসেনি প্রযুক্তি বিশ্বে। এবারে এইচডিএমআই-এর একটি আপডেট এসেছে। এইচডিএমআই ২.০-এর মাধ্যমে আল্ট্রা হাইডেফিনেশন সব টেলিভিশনগুলো আগের চাইতে অনেক উন্নত মানের ছবি প্রদর্শনের জন্য উচ্চগতিতে তথ্য গ্রহণ করতে পারবে। এর তথ্য স্থানান্তরের গতি আগের চাইতে প্রায় দ্বিগুণ—১৮ জিবিপিএস। এর মাধ্যমে টেলিভিশনগুলো প্রতি সেকেন্ডে ৬০টি ফ্রেম হিসেবে ৩,৮৪০ বাই ২,১৬০ রেজ্যুলেশনের ছবি প্রদর্শন করতে সক্ষম।
লেন্সেই ক্যামেরা
জাপানের জায়ান্ট সনি অনেক আগে থেকেই তাদের ক্যামেরার জন্য বিখ্যাত। স্মার্টফোন আর ট্যাবলেট পিসির এই যুগে এসব পণ্যের দিকেও রয়েছে তাদের সমান মনোযোগ। তবে তাই বলে ক্যামেরাকে ভুলে যায়নি তারা। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন মডেলের ক্যামেরা উপহার দিয়ে যাচ্ছে তারা প্রযুক্তি বিশ্বকে। তবে এই প্রদর্শনীতে গোটা বিশ্বকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের ক্যামেরার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সনি। একে তারা বলছে ‘লেন্স ক্যামেরা’। ‘কিউ এক্স১০’ এবং ‘কিউ এক্স১০০’ মডেলের দুইটি লেন্স ক্যামেরা নিয়ে এসেছে সনি। উচ্চ রেজ্যুলেশনের ক্যামেরাযুক্ত স্মার্টফোনের মাধ্যমেই যখন অনেকে ছবি তুলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে, তখন স্মার্টফোনের জন্যই মূলত এই লেন্স ক্যামেরা তৈরি করেছে সনি। এই লেন্স ক্যামেরাগুলোতে রয়েছে একটি লেন্স, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সেন্সরসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু। আলাদা করে এই লেন্সের মাধ্যমেই ছবি তোলা যাবে, যদিও ডিসপ্লে না থাকায় বুঝতে পারবেন না কী তুলেছেন। তবে স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এই লেন্স ক্যামেরা। অর্থাত্, বলতে গেলে স্মার্টফোনের জন্য বাড়তি লেন্স হিসেবেই কাজ করবে এই লেন্স ক্যামেরাগুলো।
ট্যাবলেট পিসি
প্রযুক্তি প্রদর্শনীগুলোতে এখন বড়সড় জায়গা দখল করে রাখে ট্যাবলেট পিসি। আইএফএও তার ব্যতিক্রম নয়। স্যামসাং, সনি, এবার, প্যানাসনিক থেকে শুরু করে নানা ব্র্যান্ডের ট্যাবলেট পিসিতে ভর্তি ছিল এই প্রদর্শনী। তবে এর মধ্যে সব ট্যাবলেট পিসি অবশ্য সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়নি। দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে যেগুলো, তার মধ্যে শুরুতেই আসবে প্যানাসনিকের টাফপ্যাড ইউটি-এমবি ৫-এর নাম। ২০ ইঞ্চি আকৃতির এই ট্যাবলেট পিসিকে অনেকে অবশ্য অল-ইন-ওয়ানও বলতে পারেন। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফিচার হচ্ছে এর ডিসপ্লে আল্ট্রা হাইডেফিনেশন ৪কে রেজ্যুলেশন সমর্থন করে। ট্যাবলেট পিসিতে প্রথমবারের মতো এত উচ্চ রেজ্যুলেশন যুক্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি একটু ছোট আকারের ট্যাবলেট পিসি হিসেবে ৮ ইঞ্চি আকৃতির উইন্ডোজ ৮.১ অপারেটিং সিস্টেমে চালিত তোশিবা এনকোরও রয়েছে আলোচনায়। এলজি’র ৮.৩ ইঞ্চি আকৃতির জি প্যাড ৮.৩ অ্যান্ড্রয়েডটিও যথেষ্টই শক্তিশালী। এর বাইরে সনির ভায়ো ট্যাপ ১১কে বলা হচ্ছে মাইক্রোসফটের সারফেস ট্যাবলেটের একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প। আর স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি নোট ১০.১ গ্যালাক্সি ট্যাবের আগের সংস্করণগুলোর চাইতে বেশি জনপ্রিয় হবে বলেই ধারণা প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের।
সেরা সব স্মার্টফোন
স্মার্টফোনের এই সময়ে প্রায় সব প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতাই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে স্মার্টফোনের বিকল্প দেখছে না। সেই হিসেবে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন স্মার্টফোন হাজির হচ্ছে প্রযুক্তি বিশ্বে। আইএফএ বার্লিনও নানা মডেলের স্মার্টফোনে সমৃদ্ধ ছিল। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি নোট ৩.০। ৫.৭ ইঞ্চি আকৃতির এই স্মার্টফোনে ব্যবহার করা হয়েছে ২.৩ গিগাহার্জ কোয়াড কোর প্রসেসর। এর ৫.৫ ইঞ্চি আকৃতির ডিসপ্লেটি ১,৯২০ বাই ১.০৮০ পিক্সেল রেজ্যুলেশন সমর্থন করে। আর নোট ২.০-এর চাইতে এর ক্যামেরাটিও বেশি রেজ্যুলেশনের। এর ক্যামেরা ১৩ মেগাপিক্সেল। তবে সনির এক্সপেরিয়া জেড১ও পিছিয়ে নেই খুব একটা। বিশেষ করে এর ২০.৭ মেগাপিক্সেল সেন্সর, এফ২.০ অ্যাপারেচার আর ২৭ মিলিমিটার ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ক্যামেরাকে অনেকেই স্মার্টফোনের অন্যতম সেরা ক্যামেরা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। জি লেন্সের ক্যামেরার এই স্মার্টফোনের ৫ ইঞ্চি ফুল এইচডি ডিসপ্লে আর স্ন্যাপড্রাগন ৮০০ প্রসেসর একে এগিয়ে রাখবে অনেক স্মার্টফোনের চেয়েই। এর বাইরে ৬ ইঞ্চির এসার লিকুইড এস২, অ্যালকাটেলের ওয়ান টাচ হিরো স্মার্টফোনগুলোও ছিল আলোচনায়।
ল্যাপটপ ও হাইব্রিড ডিভাইস
স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট পিসির মতো ল্যাপটপ এখন আর প্রযুক্তি পণ্যের প্রদর্শনীতে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে না। তবে তাই বলে ল্যাপটপের উপস্থিতি যে থাকে না, তা নয়। অবশ্য ল্যাপটপের পাশাপাশি এখন ট্যাবলেট পিসি এবং ল্যাপটপ বা নোটবুকের হাইব্রিড ডিভাইসই থাকে বেশি। এরকম বেশ কয়েকটি ডিভাইস হাজির ছিল আইএফএ’র এই আয়োজনেও। এর মধ্যে শুরুতেই আসবে লেনোভো’র ১১ ইঞ্চি আকৃতির থিংকপ্যাড ইয়োগা এবং ১৩ ইঞ্চি আকৃতির লেনোভো ইয়োগা ২-এর নাম। উভয় মডেলের ডিসপ্লেকেই ৩৬০ ডিগ্রি কোণে ঘুরানো যায়। আর একই সাথে এদের ল্যাপটপ বা নোটবুক এবং ট্যাবলেট পিসি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। হাইব্রিড ডিভাইসের মধ্যে আরও ছিল সনির ভায়ো ফ্লিপ। ১৩ থেকে ১৫ ইঞ্চি আকৃতির মধ্যে কয়েকটি মডেল থাকবে এই ফ্লিপের। আর পূর্ণাঙ্গ ল্যাপটপ হিসেবে প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিল আসুসের জেনবুক ইউএক্স৩০১। গরিলা গ্লাস ৩ ডিসপ্লেসমৃদ্ধ এই ল্যাপটপে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে রয়েছে উইন্ডোজ ৮। মাত্র ৬ ইঞ্চি পুরুত্বের এই আল্ট্রাবুকে রয়েছে ইন্টেলের সর্বশেষ প্রযুক্তির হাসওয়েল কোরআই৭ প্রসেসর, ৮ গিগাবাইট র্যাম এবং ৫১২ সলিড স্টেট স্টোরেজ। অ্যালুমিনিয়ামের বডিতে জেনবুক সকলের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলেই ধারণা প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের।
মজার সব গ্যাজেটস
প্রচলিত সব প্রযুক্তি পণ্যের বাইরেও বেশকিছু গ্যাজেটস নজর কেড়েছে বার্লিনের এই আয়োজনে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বলা যায় ‘রিকো থেটা’ ক্যামেরার কথা। রিকোর এই ক্যামেরাটি ৩৬০ ডিগ্রি কোণের প্যানারমিক ছবি তুলতে সক্ষম। ফিলিপসের এম১এক্স-ডিজে আবার আইপ্যাডের সাথে যুক্ত হয়ে ডিজে হিসেবে কাজ করতে পারে। হোম অ্যাপ্লায়েন্স নির্মাতা মিয়েলের নতুন ডিশওয়াশার আবার সহজে বহনযোগ্য। আর এটি হাতের টোকাতেই কাজ করে। ব্যতিক্রমধর্মী আরেকটি গ্যাজেট হচ্ছে ৩ডুডলার। এটি মূলত একটি ত্রিমাত্রিক একটি প্রিন্টার যার মাধ্যমে ছোট ছোট বিভিন্ন ত্রিমাত্রিক শেপ এবং মডেল তৈরি করা যায়। এর প্লাস্টিক ইংকের মাধ্যমেই প্রিন্ট বা তৈরি হয়ে আসবে ত্রিমাত্রিক সব বস্তু। কিকস্টার্টার ক্রাউডফান্ডিংয়ে তৈরি এই প্রিন্টারটি দামেও খুব বেশি নয়—মাত্র ৯৯ ডলার।
এরকম নানা প্রযুক্তি পণ্যের সমারোহে এবারের আইএফএ ছিল জমজমাট।