[ অ ভি ভা ষ ণ ]

সিরিয়া বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার ভাষণ

১০ই সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিরিয়া বিষয়ে হোয়াইট হাউসে এক ভাষণ দেন। ভাষণটি নিম্নে দেয়া হল— আমার সতীর্থ আমেরিকানগণ, আজ রাতে আমি আপনাদের সাথে সিরিয়া বিষয়ে কথা বলতে চাই - কেন এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা এখান থেকে কোথায় যাচ্ছি। বিগত দুই বছরে বাশার আল-আসাদের নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে যা শুরু হয়েছিল তা রূপ নিয়েছে একটি পাশবিক গৃহযুদ্ধে। এ পর্যন্ত ১০০,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। লাখ লাখ লোক দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। সেই সময়কালে মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য, বিরোধিতা নমনীয় করার জন্য এবং একটি রাজনৈতিক স্থিতাবস্থায় পৌঁছানোর জন্য আমেরিকা মিত্রদের সাথে মিলে কাজ করেছে। তবে আমি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান প্রতিহত করেছি কারণ অন্য কারো গৃহযুদ্ধ আমরা শক্তি দিয়ে সমাধান করতে পারি না, বিশেষ করে ইরাক এবং আফগানিস্তানে যুদ্ধের এক দশক পর। এই পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে বদলে যায় যখন আসাদ সরকার গ্যাস হামলা চালিয়ে হাজারখানেকের বেশি মানুষকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে রয়েছে কয়েকশ’ শিশু। এই হত্যাকাণ্ডের চিত্র সবাইকে অসুস্থ করে দেয়: পুরুষ, নারী, শিশু সবাই সারিবদ্ধ হয়ে শুয়ে আছে, বিষাক্ত গ্যাস হামলায় যারা নিহত হয়েছে। অন্যদের মুখ দিয়ে ফেনা উঠছে, বাঁচার জন্য নিঃশ্বাস নিতে তারা বাতাস খুঁজছে। একজন বাবা তার মৃত শিশুদেরকে আঁঁকড়ে আছেন, তাদেরকে জেগে ওঠার এবং উঠে হাঁটার জন্য আকুলভাবে আকুতি জানাচ্ছেন। ওই ভয়ংকর রাতে বিশ্ব দেখে রাসায়নিক অস্ত্রের ভয়াবহ প্রকৃতির বিভীষিকাময় বিস্তারিত চিত্র এবং কেন অধিকাংশ মানুষ তাদেরকে সীমাবদ্ধ রেখেছে - মানবিকতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধের নীতিমালা ভঙ্গ করার জন্য। ঘটনা সব সময় এরকম ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের ট্রেঞ্চগুলোতে বিষাক্ত গ্যাস হামলায় যতো হাজার হাজার লোক মারা যায় তাদের মধ্যে বহু আমেরিকানও ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাত্সীরা “হলোকস্ট”-এর সময় আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য গ্যাস ব্যবহার করতো। যেহেতু এসব অস্ত্র ব্যাপকহারে হত্যাযজ্ঞ ঘটাতে পারে, সৈন্য এবং শিশুদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না, তাই সভ্য বিশ্ব এগুলো নিষিদ্ধ করে এবং তা করতে সময় ব্যয় হয় প্রায় এক শতাব্দী । আর যুক্তরাষ্ট্র সিনেট ১৯৯৭ সালে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেছে যে চুক্তিতে বর্তমানে ১৮৯টি দেশের সরকার যোগ দিয়েছে এবং যা পুরো বিশ্বের মানব সমাজের শতকরা ৯৮ ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে। ২১শে আগস্ট তারিখে এসব মৌলিক নীতিমালা লংঘিত হয়, একই সাথে লংঘিত হয় আমাদের সাধারণ মানবিকতা বোধ। কেউই এনিয়ে বিতর্ক তুলছে না যে, সিরিয়াতে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহূত হয়েছিল। আমাদের বিশ্ব দেখেছে হাজার হাজার ভিডিও, সেল ফোনের ছবি, হামলার পর সোশ্যাল মিডিয়া রিপোর্ট এবং মানবিক সংগঠনের কর্মীরা জানিয়েছে, হাসপাতাল-ভর্তি আহত মানুষের কথা যারা এসেছিল বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হবার লক্ষণ নিয়ে। উপরন্তু, আমরা জানি যে, আসাদ শাসকগোষ্ঠীই এর জন্য দায়ী ছিল। ২১শে আগস্ট-এর কয়েক দিন আগে থেকেই আমরা জানি আসাদ-এর রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচীর কর্মীরা এমন একটি জায়গার কাছে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল যেখানে তারা সারিন গ্যাস-এর মিশ্রণ ঘটিয়ে থাকে। তারা তাদের নিজেদের বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গ্যাসমাস্ক বিতরণ করে। তারপর তারা শাসকগোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকা থেকে ১১টি এলাকায় রকেট নিক্ষেপ করে যে এলাকাগুলো থেকে তারা বিরোধীদেরকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ওই রকেটগুলো নিক্ষিপ্ত হবার কিছুক্ষণ পরেই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে এবং হাসপাতালগুলো ভরে উঠতে থকে মরণাপন্ন ও আহত মানুষ দিয়ে। আমরা জানি আসাদের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা এসব হামলার ফলাফল পর্যালোচনা করে এবং পরবর্তী দিনগুলোতে একই এলাকাসমূহে শাসকগোষ্ঠী তাদের বোমা হামলার মাত্রা বাড়াতে থাকে। ওই সকল এলাকার আক্রান্ত লোকদের রক্ত ও চুলের নমুনা আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি যার ফলাফল ইতিবাচক এসেছে। একনায়করা যখন নৃশংসতা ঘটায় তারা চায় বিশ্ব উল্টোদিকে তাকিয়ে থাকবে যতোক্ষণ না পর্যন্ত ওই সব বিভীষিকাময় ছবি স্মৃতি থেকে মুছে না যায়। কিন্তু এসব ঘটনা ঘটেছে। সত্য অস্বীকার করা যায় না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এ বিষয়ে কি ধরনের পদক্ষেপ নেবার জন্য প্রস্তুত। কারণ ওই সকল মানুষের জীবনে যা ঘটেছে- ওই সব শিশুর জীবনে-তা কেবল আন্তর্জাতিক আইনেরই লংঘন নয়, এটা আমাদের নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক... আমরা কেন এমন একটি পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়বো যা অত্যন্ত জটিল, এবং যেখানে একজন ব্যক্তি আমাকে যেমন লিখেছেন ,“যারা আসাদের পেছনে লাগতে আসে তারা মানবাধিকারের শত্রু হতে পারে?” এটি সত্যি যে, আসাদের কিছু বিরোধী চরমপন্থি। কিন্তু আল -কায়েদা বিশৃংখল সিরিয়ায় শুধু তখনই শক্তি অর্জন করবে যখন জনগণ সেখানে দেখে যে, নিষ্পাপ বেসামরিক লোকজনকে গ্যাস দিয়ে হত্যা করা থেকে রক্ষা করতে বিশ্ব কিছুই করছে না। সিরিয়ার জনগণের অধিকাংশই এবং বিরোধী জনগোষ্ঠী যাদের সাথে আমরা কাজ করি শুধু মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চায়। আর যে কোন সামরিক হামলার পরদিনই রাজনৈতিক সমাধান অর্জনের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেব যা তাদের শক্তিশালী করবে যারা নিপীড়ক এবং চরমপন্থি শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে। বিগত কয়েক দিন যাবত্ আমরা বেশকিছু উত্সাহজনক লক্ষণ প্রত্যক্ষ করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আক্রমণের বিশ্বাসযোগ্য হুমকি এর একটা কারণ, আর সেই সাথে প্রেসিডেন্ট পুটিনের সাথে আমার যে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে তাতে রুশ সরকার প্রেসিডেন্ট আসাদকে তার রাসায়নিক অস্ত্র পরিত্যাগ করার বিষয়ে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সাথে যোগদানে তার ইচ্ছার আভাস দিয়েছে। আসাদ শাসকগোষ্ঠী এখন স্বীকার করেছে যে, তাদের কাছে এ ধরনের অস্ত্র রয়েছে এবং এমনকি এও বলেছে যে, তারা রাসায়নিক অস্ত্র সনদে যোগ দেবে যেখানে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই প্রস্তাব সফল হবে কিনা খুব শীঘ্রই এটা বলা সম্ভব নয়। আর এ সংক্রান্ত যে কোন চুক্তি অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে যে, আসাদ সরকার তার অঙ্গীকার রক্ষা করছে। তবে শক্তি ব্যবহার ছাড়াই রাসায়নিক অস্ত্রের হুমকি দূর করাতে এই উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে; বিশেষত: যেখানে আসাদের শক্তিশালী মিত্রদের অন্যতম হচ্ছে রাশিয়া। আর তাই আমি কংগ্রেসের নেতাদেরকে সামরিক শক্তির ব্যবহার অনুমোদন করার ভোট স্থগিত রাখতে বলেছি এবং এই সময়ে আমরা কূটনৈতিক পথে অগ্রসর হবো। আগামী বৃহস্পতিবার আমি সেক্রেটারি অব স্টেট কেরি-কে পাঠাচ্ছি তার রুশ প্রতিপক্ষের সাথে আলোচনায় বসার জন্য এবং প্রেসিডেন্ট পুটিনের সাথে আমি আমার নিজস্ব আলোচনা চালিয়ে যাবো। আসাদ যাতে তার রাসায়নিক অস্ত্র পরিত্যাগ করেন এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণাধীনে শেষপর্যন্ত সেগুলো ধ্বংস করেন সেজন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন বিষয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতাদের সাথে আমি কথা বলেছি এবং রাশিয়া ও চীনের সাথেও আমরা একত্রে এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবো। ২১শে আগস্ট তারিখে কি ঘটেছিল সে বিষয়ে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দেবার জন্য আমরা জাতিসংঘ তদন্তকারীদের সুযোগ দেব। এবং সিরিয়ায় অভিযানে আমাদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য ইউরোপ থেকে আমেরিকা, এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য— সর্বত্র আমরা আলোচনা চালিয়ে যাবো। এই বিশ্বে অনেক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে এবং সব ভুল ঠিক করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। কিন্তু স্বল্প প্রচেষ্টা ও ঝুঁকি নিয়ে যখন আমরা গ্যাস হামলায় শিশুদের মৃত্যু রোধ করতে পারি এবং তাই করে আমাদের নিজেদের শিশুদের ভবিষ্যত্ নিরাপত্তা দিতে পারি, তাহলে আমি বিশ্বাস করি আমদের এই পদক্ষেপ নেয়াই উচিত। (আমেরিকান সেন্টারের সৌজন্যে)