ভিডিও এডিটর

নাটক, সিনেমা, টেলিফিল্ম, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান কিংবা কোনো অনুষ্ঠানের ধারণ করা ভিডিও অথবা মিউজিক ভিডিও, যা-ই দেখি না কেন, সবই ধারণ করা হয় অনেক বড় আকারে। কিন্তু দেখানো হয় শুধু প্রয়োজনীয় অংশটুকু। অপ্রয়োজনীয় অথবা তুলনামূলক কম ভালো অংশ ফেলে দিয়েই তৈরি হয় একটি ভালো ভিডিও ফুটেজ। ভিডিও ধারণের পর পরিপাটি করে সাজিয়ে একটি দৃশ্যের পর আরেকটি দৃশ্য সাজিয়ে তবেই দর্শকের দেখার উপযোগী করে তোলা হয়। যেটাকে বলা হয় ভিডিও এডিটিং। আর এ কাজটি যারা করেন তারাই ভিডিও এডিটর। এবারের আয়োজনে থাকছে তেমনই কয়েকজন মেধাবী ভিডিও এডিটরদের আগামী দিনের স্বপ্ন ও তাদের প্রত্যাশার কথা। ‘ভিডিও এডিটরের পেশাটা টেকনিক্যাল কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়’ খুরশীদ আনাম সিনিয়র ভিডিও এডিটর চ্যানেল একাত্তর ২০০০ সালে ভারতের চেন্নাইতে মাল্টিমিডিয়া প্রোডাকশনের উপর ডিপ্লোমা করার জন্য যান। ফিরে এসে গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েভ পেজ ডিজাইন, অ্যানিমেশন সবকিছুই করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পাদনাতেই স্থির হয়েছেন। গড়ে তুলেছেন সফল ক্যারিয়ার। বলছিলাম খুরশীদ আনামের কথা, তিনি কাজ করছেন চ্যানেল একাত্তরে। আনাম বহু কাজ করলেও গত প্রায় ৭-৮ বছর ধরে শুধু প্রামাণ্যচিত্রই সম্পাদনা করছেন। ভিডিও এডিটিং নিয়ে তার প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ভিডিও এডিটরের পেশাটা টেকনিক্যাল কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। মনে করা হয় কম্পিউটারে একটি এডিটিং সফটওয়্যার চালাতে পারলেই চলবে। টিভিতে যে ভিডিও এডিটং করা হয় তা অদূর ভবিষ্যতে প্রোডিউসার বা রিপোর্টাররা করবে। আর এখন তো ভিডিও এডিটরদের ফিল্ম করতে হবে, প্রামাণ্যচিত্র করতে হবে, মিউজিক ভিডিও করতে হবে। সবকিছু তো এখন ভিডিওতে হয়। ভিডিও এডিটরের পরিবর্তে হয়তো ভিজুয়াল এডিটর বলা হবে এদেরকে ভবিষ্যতে। কাজের ক্ষেত্র বাড়বে, কমবে না। নতুনদের খুব কম কাজ হচ্ছে যা চোখে পড়ে। টিভিতে একেবারে হচ্ছে না। যা কিছু ভালো কাজ তা প্রোডাকশন হাউসগুলোতে হচ্ছে। সেখানে আসলে চ্যালেঞ্জ বেশি, সুযোগ বেশি। তিনি আরও বলেন, ‘অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দরকার আছে। এই যে আমাদের দেশে সম্পাদনার একটা গতানুগতিক ধারা চলছে তা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে। নিয়ম না জানলে সেটা ভাঙবেন কেমন করে? মিডিয়া এখন একটা ধারার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তার সাথে আপনাকে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।’ ০০০০০ ‘নতুন নতুন টিভি চ্যানেল বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পেশায় জনবলের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে’ সামির আহমেদ ফিল্ম এডিটর গাঁও প্রোডাকশন্স ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন নিজের কাজের ক্ষেত্রটি হবে সিনেমা নিয়ে। বলছিলাম প্রজন্মের মেধাবী ফিল্ম এডিটর সামির আহমেদ সম্পর্কে। ছোটবেলায় তার সেই কমিটমেন্ট দেখে মাও ছেলেকে অনুপ্রেরণা দিলেন। তাই ইউনিভার্সিটি শেষ করার পর খোঁজ নিলেন সিনেমার উপর পড়াশোনা কোথায় করা যায় সে ব্যাপারে। শেষ পর্যন্ত খোঁজ পেলেন ভারতের পুনাতে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার। তারপর সেখানেই ভর্তি হন। ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকেই সামির এডিটিং পাস করেন। বর্তমানে তিনি এডিটিং ও নির্দেশনার কাজ করছেন। নিজের প্রোডাকশন হাউজ গাঁও প্রোডাকশন শুরু করেন ২০০৪-এ। এ পেশা নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নতুন নতুন টিভি চ্যানেল বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পেশায় জনবলের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশে ভিডিও এডিটরদের ভবিষ্যত্ অনেক ভালো। নতুন যারা এই কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছে তারা একটি কোর্স করেই ভালোভাবে কাজ না শিখেই এই পেশায় যোগ দিচ্ছে। মেধাবী ও সৃজনশীল ভিডিও এডিটরের সংখ্যা কম নয়। তারা যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে। ভিডিও এডিটরদের প্রডিউসারদের সেন্স বুঝে কাজ করতে পারাটা দরকার। ভিডিও এডিটর এবং প্রডিউসার যখন সম্মিলিতভাবে গুছিয়ে কাজ করবেন তখনই ভালো অনুষ্ঠান তৈরি হবে। ভালোভাবে কাজ শিখে এই পেশায় এলে খুবই ভালো করা যায়।’ ০০০০ ‘ভিডিও সম্পাদনা একরকম উপস্থাপনা’ মাহমুদ হাসান কায়েশ চিফ ভিডিও এডিটর এটিএন নিউজ লি. স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া ডিপার্টমেন্ট থেকে ফিল্মে মাস্টার্স করেন। মাস্টার্সে পড়ার সময়ই তিনি গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে ভিডিও ক্যামেরায় আর ইটিভিতে ভিডিও এডিটিংয়ের কোর্স করেন। মূলত ২০০৪ সাল থেকে পুরোপুরি ভিজ্যুয়াল নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এখন সেই মাহমুদ হাসান কায়েশ কাজ করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদভিত্তিক চ্যানেলে। বিভিন্ন প্রোডাকশন হাউজে বসে বসেও অনেকের কাজ দেখতেন। এরপর চ্যানেল ওয়ান আসে। সেখানেই মূলত ২০০৫ সালে ভিডিও এডিটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর যোগ দেন এটিএন নিউজে। কায়েশ মনে করেন সম্পাদনা একরকম উপস্থাপনা। সেই উপস্থাপনায় গল্প থাকতেও পারে আবার নাও পারে। তবে উপস্থাপনাটা হতে হবে যুক্তিসঙ্গত ও অর্থবোধক। তাই একজন সম্পাদকের নানা বিষয়ে জ্ঞান রাখা দরকার। প্রজন্মের এই ভিডিও এডিটরের ধারণা, পেশা হিসেবে এখনও এ দেশে ততটা সম্মানজনক হয়ে ওঠেনি ভিডিও এডিটিং। তবে সময় লাগলেও এ পেশা একদিন নিজের যথাযথ সম্মান আদায় করে নেবে। কেননা কেউ কখনও ভাবতেই পারে না বা মেনে নেয় না যে একটা নাটক, সিনেমা বা কোনো টিভি রিপোর্টের পিছনে পরিচালক বা রিপোর্টারের যেমন অবদান, তেমনি একজন সম্পাদকেরও তাতে সমান অবদান থাকে। অথচ একজন সম্পাদকই পারে পুরো কাজটাকে সর্বোচ্চ সফলতায় নিতে। সৃষ্টির শেষ বলে কিছু নেই। আর একটা বিষয় নিজেকে সব সময় টেকনোলজির সাথে আপডেট রাখতে হবে। অন্যথায় নিজেকে সনাতন হয়েই থাকতে হবে। সময়টাকেই কাজে লাগিয়ে নিজের মেধার সঠিক প্রয়োগেই সাফল্য নিশ্চিত করতে চান প্রজন্মের এই মেধাবী ভিডিও এডিটর।