কৃচ্ছ সাধনে আস্থা নেই পর্তুগালের জনগণের

পর্তুগীজরা সহজে ক্ষেপে যায় না; বিক্ষুব্ধ হয় আগপাছ ভেবে। ইউরো জোনের শত সমস্যা সত্ত্বেও একটা সময়ে পর্তুগাল বিবেচিত হচ্ছিলো রোল মডেল হিসেবে। কিন্তু এসব এখন শুধুই স্মৃতি। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে ক’দিন পরপরই উত্তাল হয়ে উঠছে পর্তুগাল। গ্রীস ও স্পেনকে অনুসরণ করে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠছে তারাও। পরিষেবা কর্তন, কর বৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিতে ব্যাপক ছাঁটাইয়ের ঘোষণার পর তারা আর শান্ত থাকতে পারছে না; নেমে আসছে রাস্তায়। ইউরো জোনের সমস্যা শুরুর পর থেকে পর্তুগালের রাস্তায় সর্ববৃহত্ সমাবেশ ঘটেছিলো গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তাতেও কিস্তু টনক নড়েনি দেশের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো পাসোস কোয়েলহো’র। ব্যাপক কর বৃদ্ধি ও ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বাজেট ঘোষণা করেছিলেন অক্টোবরের শেষ সপ্তায়। সেদিন জনগণ সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের চেষ্টা করেও তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। এর প্রেক্ষিতে কনফেডারেশন অফ পর্তুগীজ ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (সিজিটিপি) কিছুদিন পরপরই সাধারণ ধর্মঘট পালন করে আসছে। কিন্তু এসবকে তোয়াক্কাই করছেন না প্রধানমন্ত্রী। আসন্ন বাজেটেও তিনি কৃচ্ছ্রসাধন নীতি বহাল রাখার পরিকল্পনা এঁটেছেন। তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড়। সিজিটিপি নেতা আর্মেনিও কার্লোস পেড্রো পাসোস কোয়েলহো’কে তুলনা করেছেন পিনোশিও’র সঙ্গে। পিনোশিও’র মতো তিনিও অনবরত ব্যয় সংকোচনের নীতি প্রচার করে যাচ্ছেন। লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক পেড্রো সি. ম্যাগালহায়েস পর্তুগালের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘হতাশা থেকেই অবিশ্বাস কাজ করছে পর্তুগীজদের মনে। সে কারণে সরকারের কোনো প্রতিশ্রুতির ওপরই তারা ভরসা রাখতে পারছে না।’ আসল তথ্য হলো—আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের বাতলে দেয়া ফর্মুলা অনুসরণ করে পর্তুগীজ সরকার ক্রমাগতই যেনো কোমরবন্ধ আঁঁটসাট করার নীতি গ্রহণ করেছে। অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য ৭৮ বিলিয়ন ইউরোতে পুরস্কৃত করার করার পেছনে জুড়ে দয়া হয়েছে নানা শর্ত। যেগুলো না মেনে উপায় নেই কোয়েলহো’র। এ নিয়ে সোশাল ডেমোক্রেটদের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকারেও টানাপড়েন চলছে। কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে যে প্রবলভাবেই সোচ্চার রয়েছে বিরোধী পিপলস পার্টি, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাসোস কোয়েরহো’র কুটচাল বুঝতে পেরে গত সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো নড়েচড়ে বসেছিলো দেশের জনগণ। পাসোস তখন চাকরিজীবিদের সামাজিক নিরাপত্তা কর কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল পুনর্বিন্যাস করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর আসল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের মজুরির পরিমাণ কমিয়ে দেয়া। কিন্তু শ্রমিকরা তা আগেভাগেই টের পেয়ে যাওয়াতে সরকার শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিলো প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে। কিন্তু ততোদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে যায়; সরকারের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায় শ্রমিকদের। দেশে বৃহত্ স্বার্থে আগের মতো কৃচ্ছ্রসাধনে আর রাজি নয় তারা। সেজন্য প্রতিবাদস্বরূপ প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় নেমে আসছে লোকজন। পর্তুগালের বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত ব্যয় সংকোচন নীতিতে অটল। প্রধানমন্ত্রীর হয়ে দেশের উত্তরণ কর্মসূচীর দেখভাল করছেন স্টেইট সেক্রেটারি কার্লোস মোয়েদাস। তিনি কৃচ্ছ্রসাধনের পক্ষে সাফাই গেয়ে যাচ্ছেন জোর গলায়, ‘বর্তমান নীতি আমাদের অভিযানের অংশ। উত্তরণের জন্য যেকোনো সরকারই গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়সাধনের ক্ষমতা রাখে। আসরা ব্যতিক্রমধর্মী কোনো কিছুই করছি না। আসল কথা লোকজন রাস্তায় নেমে আসার মতো একটি কারণও খুঁজে পাচ্ছি না আমরা। যারা আমাদের সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনার কথা বুঝতে পারছে, তাদের কেউই রাস্তায় নেমে আসছে না। ব্যয় সংকোচন নীতির সুফল খুব শীঘ্রই ভোগ করতে শুরু করবে সবাই। অমরা সেই দিনের অপেক্ষাতেই আছি। তখন হয়তো আজকের নিন্দুকেরা সুর পাল্টিয়ে ভিন্ন কথা বলতে শুরু করবে।’ আমজনতার আস্থা অর্জনের জন্য এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, বিষয়টা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় পৌঁছে গেছে। মজুরি কমিয়ে দেয়া হবে এমন পরিকল্পনায় অনেকে অপমানবোধ করছেন। পর্তুগীজ কমার্স এন্ড সার্ভিসেস কনফেডারেশন-এর সভাপতি জোয়াও ভিয়েরা লোপেজের অভিমত, সরকার বিশ্বাসযোগ্যতার দারুণ ক্ষতি করে ফেলেছে। অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা ও জনগণের মন উপলব্ধি না করেই নিত্যনতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। সরকারের ভালো কাজকেও এখন আর তারা সমর্থন দিতে চাইছে না। যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে আগামী নির্বাচনে। এমনকি আগেভাগেও সরকারের পতন নেমে আসতে পারে। ভিয়েরা লোপেজের প্রতিষ্ঠানটি ট্রান্সপোর্ট ও রিটেইল সেক্টরসহ ২ লাখ রিটেইল কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করে। কাজেই তার বক্তব্যকে একবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। অসহায়ভাবে দেশের অর্থনীতির ক্রমাবনতি প্রত্যক্ষ করে অনেক পর্তুগীজই কৃচ্ছ্রসাধন প্যাকেজকে চ্যালেঞ্জ করছেন। ভিয়েরা লোপেজ মনে করেন, মৌলিক সমস্যাটি হলো— পর্তুগালের আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা উত্তরণ সাহায্য কর্মসূচীর অংশ হিসেবে যা যা বলে দিচ্ছে সরকার তাই করছে। কিন্তু এতে হীতে-বিপরীত হবার সম্ভাবনাই বেশি। তিনি সরাসরিই বলেছেন, ‘কৃচ্ছ্রসাধন মডেল জোর করে চাপানো হচ্ছে। পর্তুগাল বড় বড় কোম্পানিতে ভরা কোনো দেশ নয় যে. অভ্যন্তরীণ বাজারে কাটতি কমে যাওয়ার সমন্বয় সাধন করতে পারবে খুব সহজেই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের কোম্পানিগুলোর সামনে এখন এখন একটি পথই খোলা— বন্ধ করে দেয়া। তার নমুনাও ইতোমধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে। চোখ-কান খোলা রাখলেই পাওয়া যাচ্ছে চরম পরিণতির আভাস।’ — ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে