কলমে-ফ্রেমে স্বপ্ন আঁকা
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:২৩
বাবা ইচ্ছা ছেলেকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন, কিন্তু ছেলের তো সেদিকে মন নেই। দিনমান গ্রামে ঘুরে বেড়ানো, আর নতুন নতুন ছড়া বানাতে খুব ভালো লাগত ছোট্ট নয়নের। লেখালেখির শুরুটা সেই থেকেই। এরপর লিখেছেন গল্প, সেই গল্পকে প্রাণ দিতে চলচ্চিত্র বানালেন নয়ন ছোটদের নিয়ে। বর্তমানে তরুণ এই নির্মাতা জামিল আশরাফ খান নয়ন লেখালেখির পাশাপাশি ভিন্নধারার চলচ্চিত্রে মন দিয়েছেন। গেল সপ্তাহে ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রদেয় মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০১৩’র সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল—দুই ক্যাটাগরিতেই একসাথে পদক পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। তার সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
স্কুলে শিক্ষকরা যখন ছড়া পড়াতেন, তখন নয়ন তার সাথে মনে মনে উল্টা-পাল্টা কিছু শব্দ বা লাইন আউড়াতেন আর ছড়ার ঢং-ই পরিবর্তন করে ফেলতেন। যেমন শিক্ষক বললেন, ‘আতাগাছের তোতা পাখি’ এরপর নয়ন ‘ডালিম গাছের মৌ’ না বলে মনে মনে বলতেন ‘তেঁতুল গাছে চড়ুই পাখি / মৌমাছি ডাকে ভৌ!’ ছোটবেলা থেকেই এমন দুষ্টুমির মধ্য দিয়ে কেটেছে চট্টগ্রামের ছেলে নয়নের। তিনি শোনালেন তার লেখালেখির শুরুর গল্প, ‘তখনও গল্প লেখাটা শেখা হয়ে উঠেনি। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় প্রথম মৌলিক ছড়া এবং কবিতা লেখা শুরু করি। তখন যেকোনো বিষয় নিয়ে মাথায় ভাবনা এলেই কাগজ-কলম নিয়ে চুপিসারে লিখতে বসে যেতাম। আবার যেন কেউ তা দেখে না ফেলে! ছোটবেলায় অনেক চাপা স্বভাবের ছিলাম তাই কিনা। যার কারণে লিখে তা আমি আব্বু-আম্মু বা বড় ভাইয়া কাউকে দেখাতাম না! এভাবে সে বছরই আমার গোটা বিশেক কবিতা ও ছড়া লেখা হয়ে গেল। আমার লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ গল্পটার নাম যতটুকু মনে পড়ে ‘নোবেল বিজয়ীর ছুটি’। দীপু নামের বাবা হারানো একটি ছেলে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বেড়ে উঠে। তাকে নিয়েই অল্প বয়সে গল্প লিখে ফেলি।’ আর চলচ্চিত্রের সাথে তার জড়িত হওয়া অনেকটা হঠাত্ করেই। ‘১ম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সব ২০০৮-এ রচনা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১০০ জন শিশু প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করা হয়। চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশের আমন্ত্রণে সাত দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে যোগ দেন নয়ন। সেমিনার শেষে করতে না করতেই মনে বাসনা জেগে বসে ভবিষ্যতে তিনি চলচ্চিত্র বানাবেন। ঠিক তখন থেকেই চলচ্চিত্র নিমার্ণের পোকাটি তার মাথায় ঢুকে গেল। একে একে অনেকগুলো চলচ্চিত্র তৈরি করে পরে নিজেরই এক গল্পে দারুণ এক শর্টফিল্ম বানিয়ে ফেলল নয়ন। দীপ্ত আকাশে উড়বে! দীপ্ত নামের সাত-আট বছরের একটি অটিস্টিক শিশুকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পটি। দীপ্ত সারাদিন বাসায় বসে বসে খেলে, খাতায় আপন মনে ছবি আঁকে। অন্যদিকে তার মা সারাদিন টেলিভিশনের পর্দায় হিন্দি সিরিয়াল দেখে ব্যস্ত থাকে। দীপ্তর দিকে খেয়াল দেওয়ার সময়-সুযোগটুকু যেন তার নেই। একদিন দীপ্ত তার মাকে ফাঁকি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় সে পথশিশুর সাথে মিশে, টিয়ে পাখির সাথে খেলে নিজের জগতটাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। খেলার মাঠে সাথিদের কটাক্ষের শিকার হতে হয় সে অটিস্টিক বলে। তাদের বিরূপ আচরণ দীপ্তর জীবনে একটি করুণ পরিণতি ডেকে আনে। গত বছর এটি গল্প হিসেবে মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেলেও এবার সেই গল্পের আলোকে নির্মিত তারই চলচ্চিত্র জিতে নিলে পুরস্কার। এর বাইরে শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিকে ‘কাজের ফাঁকে পাঠদান’ শিরোনামের একটি ফিচারের জন্যও পদক পান জামিল আশরাফ খান নয়ন। এ সময়ের তরুণ এই লেখক নির্মাতা ভবিষ্যতে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান। পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যেতে চান। কোনোটিকে আলাদাভাবে কম গুরুত্ব দেন না তিনি। তার এতটুকু আসার পেছনে সবটুকু কৃতিত্ব তার মা-বাবার। তার বাবা শেরমত খান সরকারি চাকরিজীবী এবং মা জেসমিন আরা খানম গৃহিণী। নয়ন জানালেন তার সব কাজে অনুপ্রেরণা জোগায় তার মা-বাবা, বড় ভাই মানিক, ছোটবোন দিনা ও ছোট ভাই মাহি। নয়ন তার স্বপনের পথ ধরে অনেকদূর এগিয়ে যাবেন, এ দেশের সৃজনশীল ক্ষেত্রগুলোতে অবদান রেখে যাবেন এই শুভকামনা রইল তার জন্য।