প্রজন্ম আইকন

মনের গল্পকার

বরাবরই প্রজ্ঞার সাথে মানবমনের কষ্ট ও জীবনযন্ত্রণার নানা খণ্ডচিত্র তিনি নিবন্ধ এবং গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেন। মনস্তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করে, দৈনন্দিন সমস্যা মোকাবিলায় পাঠকের জন্য সার্বজনীন দিকনির্দেশনা উপহার দিয়েছেন। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের যৌথ মিলনধারায় জীবনের অনিবার্য পরিণতিগুলো সমাধানের আলোয় আমাদের সামনে মূর্ত করে তোলেন তিনি। এই নিপুণ শব্দ-কারিগর মনের নানান প্রেক্ষাপটের ওপর দিয়ে ছুটে যেন। বিশিষ্ট মনোরোগ ও মাদকাসক্তি চিকিত্সা বিশেষজ্ঞ, সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্ট ডা. মোহিত কামালকে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের বাংলার শিক্ষক আলী আকবর স্যার শ্রেণিকক্ষে তার লেখা পড়ে বলেছিলেন, ‘একদিন লেখক হতে পারবি তুই।’ এরপর চট্টগ্রাম কলেজের প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। তখন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক সিরাজউদ্দৌলা স্যার বলেছিলেন, ‘তোমার লেখার হাত খুব ভালো, আমি বিশ্বাস করি এ পথে এগিয়ে গেলে একদিন লেখক হতে পারবে তুমি।’ দুই শিক্ষকের আশাবাদ বুকের কোণে লুকিয়েছিল তার। যায়যায়দিনের বিশেষ সাহিত্য আয়োজন ‘মৌচাকে ঢিল’-এর প্রথম সংখ্যায় (১১ নভেম্বর, ১৯৯৩) সেরাগল্প হিসেবে প্রকাশিত হয় তার একটি গল্প। যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান গল্পটি নিয়ে সম্পাদকীয়তে প্রশংসা বাক্য লিখেছিলেন। এই তিন ব্যক্তিত্ব সাহিত্য জগতে ঠেলে দিয়েছেন তাকে, অনুপ্রাণিত করেছেন। ১৯৯৫ সালে ভারত থেকে প্রকাশিত সানন্দা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তার বিশেষ ধরনের গল্প ‘চড়’। বিষয়টিও ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে তার লেখকসত্তাকে। একই বছর সময় প্রকাশন থেকে বের হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কাছের তুমি দূরের তুমি’। বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন তখনকার জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত। এভাবেই ঢুকে গেলেন বইপাড়ায়। এখনও চলছেন এই পথ ধরে...। হতে চেয়েছিলেন সার্জন, সার্জারিতে বিশেষ প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু হয়ে গেলেন মনোচিকিত্সক। তার কলেজ বন্ধু তপন কুমার নাথ, বর্তমানে যুগ্ম-সচিবের বিশেষ প্রণোদনায় চলে এলেন মনোচিকিত্সা বিদ্যায়। তিনি মোহিত কামালকে বলেছিলেন, ‘যেহেতু লেখালেখি করছ, মনোচিকিত্সা বিদ্যায়ই ভালো করবে তুমি।’ ঠিক তখনই দরখাস্ত করলেন এই বিদ্যায় প্রশিক্ষণের জন্য। তার পর আর থেমে থাকেননি মোহিত কামাল। এগিয়ে যাচ্ছেন আপন গতিতে। মোহিত কামালের শৈশব ছিল আনন্দ-মধুর, কৈশোরে আছে আনন্দ এবং কষ্ট। খেলাধুলায় ছিলেন সেরা- অলরাউন্ডার, পড়াশোনা ও ক্লাসের সেরা ছাত্র হিসেবে ছিলেন সবার প্রিয়—এটা ছিল আনন্দের অধ্যায়। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই বাবা আচমকা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তখন থেকেই শুরু হয় তার কষ্টের জীবন। শৈশব-কৈশোরে এভাবে রচিত হয়ে আছে তার আনন্দ-বেদনার কাব্য। এ পর্যন্ত প্রকাশিত মোহিত কামালের প্রায় ত্রিশটি বই বাজারে এসেছে। এর মধ্যে উপন্যাসগুলো হচ্ছে—‘মরুঝড়’ (২০১৩), ‘পাথরপরান’ (২০১৩), ‘অহনা’ (২০১২), ‘ঘর’ (২০১১), ‘চেনা বন্ধু অচেনা পথ’ (২০১০), ‘না’ (২০০৯), মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস, ‘মায়াবতী’ (২০০৭), মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। তার গল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ‘পৃথিবীতে কে কাহার’ (২০১২), ‘চাবি’ (২০১১), ‘আগুন কয়লায়, পোড়া জীবন’ (২০১০), ‘সন্দেহপ্রাচীর’ (২০০৯), ‘উড়ালমন’ (২০০৮), ‘চাঁদমুখ’ (২০০৭)। ‘কাছের তুমি দূরের তুমি’ (১৯৯৫)। ‘জোছনা রাতে বাড়িয়েছি হাত’ (২০০১)। শিশুতোষ উপন্যাস ‘বন্ধু আমার বন্ধু’ (২০১৩)। কিশোর উপন্যাস ‘উড়াল বালক’ (২০১২)। ‘বাবার শত্রু কম্পিউটার গেমস ছেলের শত্রু সিগারেট’ (২০১১)। শিশু-কিশোর সাহিত্য ‘হুমায়ূন আহমেদের সমুদ্র যাত্রায় অদ্ভুত এক মাছের কাণ্ড’ (২০০৩)। ‘মানবমন মানবমনের গতি-প্রকৃতি’ (২০০১), গল্পবিজ্ঞান। ‘মানবমনের উদ্বেগ ও বিষণ্নতা’ (২০০৫)। মনোসমস্যা মনোবিশ্লেষণ (২০০৫), ‘শিশুমন শিশুর মনোজগত্, শিশুর সৃজনশীল বেড়ে ওঠা’ (২০০২)। ‘শিশুর বুদ্ধি ও স্মরণশক্তি কীভাবে ধারালো করা যাবে’ (১৯৯৯)। কিশোর-কিশোরীর মনস্তত্ত্ব ‘টিনএজ মন’ (২০১০)। স্বাস্থ্যবিষয়ক ‘ব্রেইন অ্যাটাক, অনিদ্রা ও মাথাব্যথা’ (২০০০), ও গবেষণাধর্মী The Mind of War-Injured Freedom Fighters of Bangladesh (২০০১)। এযাবত কালে মোহিত কামাল কথাসাহিত্যিক হিসেবে পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও পদক, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ময়মনসিংহ সংস্কৃতি পুরস্কার ১৪১৬-কথাশিল্পী (‘চেনা বন্ধু অচেনা পথ ’২০১০) সেরা ঔপন্যাসিক (‘না’০৯) :এ-ওয়ান টেলিমিডিয়া স্বাধীনতা অ্যাওয়ার্ড-২০০৮, বেগম রোকেয়া সম্মাননা পদক-শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ২০০৮ (সুখপাখি আগুনডানা, উড়ালমন), সাপ্তাহিক দি নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস-এর উদ্যোগে, স্বাধীনতা সংসদ নববর্ষ পুরস্কার ১৪১৫-কথাসাহিত্য (সুখপাখি আগুনডানা, উড়ালমন)। নুরুল কাদের ফাউন্ডেশন শিশুসাহিত্য পুরস্কার -২০১৩ (উড়ালবালক, ২০১২, রোদেলা প্রকাশনা) আমাদের দেশে পেশা হিসেবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের গুরুত্বের কথা জানাতে গিয়ে মোহিত কামাল বলেন, ‘কুসংস্কারের উর্ধ্বে উঠে এগিয়ে আসতে হবে এ পেশায়। ঘরে ঘরে চলছে সংকট, ঘটছে মনঃসমস্যা। মাদকের জালে জড়িয়ে গেছে দেশ। এ জাল ছিঁড়ে দেশকে আলোকিত করতে, এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে মেধাবী প্রজন্মকে। নতুনদের সম্পর্কে মূল্যায়ন তিনি বলেন, ‘অসাধারণ মেধাবী প্রজন্ম হাল ধরেছে। যোগ্যতায় এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে নতুনরা। অন্ধকার কেটে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। দলাদলির উর্ধ্বে উঠে একাত্ম হয়ে মানুষের জন্য কাজ করার কথা বলব তাদের।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন লেখালেখির জগতে রেখে যেতে চান সৃষ্টিশীল সাহিত্যকম, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন নিরন্তর। শিক্ষাঙ্গন মাদকমুক্ত হবে, টিনএজ এবং তরুণ প্রজন্ম ভুলেও মাদক নেবে না, মানসিক রোগ বিষয়ে কুসংস্কার দূর হবে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে জনগোষ্ঠী—এটাই তার আশা। মোহিত কামাল ডাক নাম :মোহিত/কামাল জন্মতারিখ ও স্থান :২ জানুয়ারি, ১৯৬০। মায়ের নাম :মাসুদা খাতুন বাবার নাম :আসাদুল হক প্রথম স্কুল :ক্রিসেন্ট জুট মিল উচ্চ বিদ্যালয় (প্রাথমিক শাখা), খালিশপুর, খুলনা। প্রিয় মানুষ :মা প্রিয় উক্তি :নিজের ভুল ধরো, অন্যের গুণের প্রশংসা করো। প্রিয় পোশাক :শার্ট-টাই (বর্তমানে)। অবসর কাটে যেভাবে :লেখালেখি এবং পড়াশোনা করে ঘরেই কাটে সময়। সাফল্যের সংজ্ঞা :সাফল্যের চিন্তা না করে মনোযোগ দিয়ে ভালো কাজ করে যেতে হবে, লেগে থাকতে হবে ধৈর্যের সঙ্গে, সফলতা আসতে বাধ্য তখন।