দারিদ্র্য বিমোচন ও জনকল্যাণে সিএসআর

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন কর্পোরেট ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আর এ ব্যবস্থায় সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাও গড়ে উঠেছে বেশ ভাল ভাবেই। এখন ব্যবসা ক্ষেত্রে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি এর বড় অংশ কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতায় (সিএসআর) ব্যয় করা হচ্ছে। আর এ দায়বদ্ধতায় উপকৃত হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। যদিও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি নতুন ধারণা নয়। তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেবায় মানবিক ধারণা প্রবর্তনে ব্যাংকগুলোতে সিএসআর কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে দাঁড়াতে পেরেছে। আর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও তাদের সাধ্যমত নিজের প্রাতিষ্ঠানিক নীতির আলোকে এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সিএসআর বাংলাদেশে সিএসআর কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। তবে এ বিষয়ে কোন নিয়ম নীতিই ছিল না। ফলে ব্যাংকগুলো নিজস্ব উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করত। আর তখন ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অনুদান আর শিক্ষাবৃত্তির মধ্যেই এ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে ২০০৮ সালে সিএসআরকে একটি নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুবিধা বঞ্চিতদের স্বল্পমূল্যে ব্যাংকিং সেবা দিয়ে তাদেরকে ব্যাংকের সঙ্গে তথা আর্থিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাই ছিল এর লক্ষ্য। সিএসআরের উপকারভোগী গত চার বছরে ব্যাংকগুলোর সিএসআর কার্যক্রম ব্যাপকহারে বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, খেলাধুলা, অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের বৃত্তি, অবহেলিত ও অনগ্রসর এলাকার জনগণ ও নারী উন্নয়ন ইত্যাদি খাতে যে সিএসআর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা দেশের দারিদ্র্য নিরসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। সিএসআর কর্মকাণ্ডের মধ্যে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সবুজ ব্যাংকিং পুরস্কারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০০৮ সালে ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে যেখানে ব্যয় করেছে ৪১ কোটি টাকা, সেখানে ২০১২ সালে ব্যয় করেছে ৩০৫ কোটি টাকা। অর্থাত্ গত পাঁচ বছরে সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে সাত গুণ। ২০১২ সালে ব্যাংকগুলো শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় সর্বাধিক সহায়তা করেছে, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ৩২ শতাংশ। যে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো সিএসআর করে অনেকে মনে করে থাকেন অর্জিত মুনাফা থেকে দরিদ্র্য মানুষের কল্যাণে কিছু ব্যয় করার মানে সিএসআর। তবে বিশ্বব্যাপী এ ধারণার মূল হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সাথে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করাই সিএসআর। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসার উন্নতির পাশাপাশি যে সমাজে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা পরিচালনা করে তার উন্নয়ন করাও অন্যতম দায়িত্ব এসে পড়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানের উপর। এছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের ইমেজ তার সিএসআর কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে। এর ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এছাড়া যেসব কারণে একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এ কার্যক্রম করে তার মূল ব্যবসায়িক চালিকাশক্তি হচ্ছে, সুদৃঢ় ব্র্যান্ড ও সুনাম, বাজারে ওই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, তাদের প্রতি আস্থা ও শেয়ারহোল্ডাদের মূল্যবোধের উন্নয়ন প্রভৃতি। সিএসআর যখন বিতর্কিত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর সিএসআর কার্যক্রমের আওতা কতদূর। এর সংজ্ঞা কি সে বিষয়ে একটি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সিএসআর কার্যক্রমকে ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়ার এক ধরনে হীন প্রচেষ্টা প্রায়ই দেখা যায়। ফলে সঠিকভাবে সিএসআর কার্যক্রম হচ্ছে না। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় দায়সারাভাবে এ কাজ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সমাজের জন্য খুব বেশি উপকার হচ্ছে না। আবার একই গ্রুপের বা একই মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কোন কাজ করে দিলে যেমন, শিক্ষা উপকরণ কিনে দেয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন তৈরি করা, এজন্য গাড়ির কিনে দেয়া প্রভৃতিকে সিএসআর হিসেবে দেখানো হয়। সিএসআরের আওতায় এখনও ব্যক্তি পর্যায়ে নগদ সহায়তা করছে বেশিরভাগ ব্যাংক। এই সহায়তার আড়ালে অনেকেই অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নিচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে। সমপ্রতি এসব অভিযোগ আরো জোরালো হয়েছে। গত শীত মৌসুমে ব্যাংকগুলো যে শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ করেছিল। কিছু ব্যাংক এসব বস্ত্রের দাম বেশি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত্ করেছে বলে অভিযোগ আছে। আর এ বেশি দেখানো অংশ ব্যাংক পর্ষদের একটি অংশ আত্মসাত্ করেছে। আবার অনেক বড় কোম্পানি রয়েছে যারা আয়কর ও অন্যান্য সরকারি পাওনা দেয়া থেকে রেহাই পেতে এ সিএসআর কার্যক্রম করে থাকেন। অন্যদিকে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে সিএসআর বিষয়ে একটি নীতিমালা থাকার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে তা নেই আর থাকলেও তা দায়সারা গোছের। আর নীতিমালা থাকলেও কোথায় সিএসআরের টাকা ব্যয় করা হবে কিভাবে ব্যয় করা হবে সে বিষয়টি নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) মর্জির উপর। যার ফলে সিএসআর নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো সিএসআর ব্যয়কে সঠিকভাবে দেখাচ্ছে না এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, সিএসআর খাতে ব্যয়ের পুরোটাই সঠিক নিয়মে ব্যয় করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া কোনিট সিএসআর ব্যয় হিসেবে দেখানো যাবে আর কোনিট যাবে না, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে তখন সিএসআর বিষয়টি নিয়ে আর কোন ঝামেলা হবে না।