বাড়ছে সুদের বোঝা
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:১০
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সহজীকরণের জন্য সরকারকে ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
কারণ এ খাত থেকে ঋণ করলে একদিকে সরকারের সুদের বোঝাও বাড়ে অন্যদিকে দেশের
বেসরকারি বিনিয়োগের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে
প্রতি বছর দেশের রাজস্ব ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে। বছর বছর এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে। সরকারের ব্যয় পরিচালনায় ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ করায় এ খাতে সুদ বাড়ছে। যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলছে। জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সুদ পরিশোধের জন্য মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। সুদ বাবদ ব্যয় বাড়তে বাড়তে অনুন্নয়ন খাতে সুদ পরিশোধ সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাত হিসেবে পরিণত হয়েছে।
২০১২-১৩ অর্থবছরে ঋণের সুদে বাবদ ব্যয় করা হয় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। ২০০৯-১০ এ সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা, ২০১০-১১ তে ১৫ হাজার ৬২২ কোটি টাকা এবং ২০১১-১২ তে ১৯ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। অর্থাত্ ক্রমেই দেশের জনগণের কষ্টার্জিত আয়ের ক্রমবর্ধমান অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ করার কাজে। এদিকে সুদ বাবদ সরকারের ব্যয়ের ভার বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয়ে খরচ করার সক্ষমতা বাড়ানো যাচ্ছে না। সরকার চাইলেও উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়েই উন্নয়ন ব্যয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দিনে দিনে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের মোট বরাদ্দ বাড়লেও আংশিক হারে কমছে। তথ্যে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে অনুন্নয়ন ব্যয় ১৪.৭ শতাংশ বাড়তি ধরা হলেও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশে। অপরদিকে উন্নয়ন ব্যয় ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪২ শতাংশ ছিল, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো খাতে তুলনামূলক কম বরাদ্দ পেয়েছে। একইভাবে কৃষি এবং গ্রামীণ উন্নয়ন উপখাতগুলোতে গত অর্থবছরের তুলনায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজেট কমেছে ২ দশমিক ৩৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। কৃষি খাতের মত শিল্প খাতেও বরাদ্দ কমেছে। সরকারের ব্যয়ের বরাদ্দ কমায় অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো অর্থনৈতিকভাবে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারছে না।
এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ গত অর্থবছর ও বর্তমান অর্থবছরের অন্যান্য খাতের তুলনায় কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ব্যয় গত অর্থবছরের তুলনায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ১২ এবং শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাত যেমন: মানব সম্পদ, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং জ্বালানি ও যোগাযোগের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় শুধু অবকাঠামো খাতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারের সুদ বাবদ ব্যয় বাড়ার পেছনে মূল যে বিষয়টি দায়ী তা হলো ব্যাংক ঋণ। গত তিন অর্থবছর ধরে সরকার তফসিলী ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে অতিক্রম করছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকার তার বাজেট লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৫,৫০০ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে। আবার ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ২৫ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এসব ঋণে সুদের হার বেশি হওয়ায় বছরশেষে সরকারকে গুণতে হয় উচ্চ পরিমাণে ব্যয়। যা সামাল দিতে উন্নয়ন খাতের ব্যয়ে প্রভাব পড়েছে। তবে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার পেছনে একমাত্র ঋণের সুদই যে দায়ী বিষয়টি এমন নয়। তবে এ ব্যয়কে মোটা দাগে দায়ী করা যায়। যা হোক, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সহজীকরণের জন্য সরকারকে ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। কারণ এ খাত থেকে ঋণ করলে একদিকে সরকারের সুদের বোঝাও বাড়ে অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সরকারকে ব্যয় নির্বাহ করতে গেলে ঋণ করতে হতেই পারে, তাই সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও কম সুদে ঋণের দিকেই বেশি ঝুঁকতে হবে। তাছাড়া দেশের বন্ড মার্কেটও উন্নত করা যেতে পারে। ব্যয়ের অর্থ নির্বাহে সরকারকে আয় বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। বাংলাদেশে এখনও অনেক কোটিপতি মানুষ আয়কর দেন না। এমনকি তাদের মধ্যে এ ধরনের সচেতনতাও নেই। যেহেতু আমাদের মতো দেশে সচেতনতার মাধ্যমে আয়কর আদায় করা সম্ভব হবে না। তাই সরকার ও রাজস্ব প্রশাসনকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী, দক্ষ, সত্ এবং মনযোগী হতে হবে।