প্রজন্ম প্রত্যাশা

ভাস্কর

আকৃতি থেকে প্রকৃতি প্রতিটি অংশে থাকে শৈল্পিক ছোঁয়া, প্রতিটি গাঁথুনিতে থাকে মেধাবী চিন্তার জোগান। এমনটাই হচ্ছে ভাস্কর্য। নিজের মনের ভাবনা ও শিল্পবোধের সমন্বয়ে একজন ভাস্কর নির্মাণ করেন একেকটি নান্দনিক শিল্পকর্ম, যা দেখে আমরা সবাই বিস্মিত হই। তবে এসব শিল্পকর্ম শুধু আনন্দ বা বিস্মিত হওয়ার জন্য নয়, এর পেছনে থাকে একটি গল্প বা মেসেজ। যা সমাজের নানা প্রেক্ষাপট থেকেই সৃষ্টি। একজন ভাস্কর সমাজের হাসি-কান্না, দুঃখ-উচ্ছ্বাস সবকিছুই মেলে ধরেন তার কাজে। তাই এই প্রজন্মের কয়েকজন মেধাবী ভাস্করদের কাছে জানব এই পেশা নিয়ে তাদের ভবিষ্যত্ প্রত্যাশার কথা তেজস হালদার জস ‘এই বিষয়ে পড়াশোনার পর অন্য কর্মক্ষেত্রে চলে যাওয়া মানে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করা’ বাড়ির ছোট ছেলে, সবার অতি আদরের সেই ছেলেকে একদিন ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো আবাসিক স্কুলে। সমুদ্রবন্দর মংলায় সেই স্কুলটা। পড়ার সময়ে সবাই যখন বাড়ির কাজ করতে ব্যস্ত, গোপনে সে খাটের নিচে বসে করত মাটি দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি। শিল্পের বিচারে সেদিন সেগুলোকে ভাস্কর্য বলা না গেলেও তেজস হালদার জসের ভাস্কর জন্ম সেদিন সেভাবেই খাটের নিচে বসে। শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতক করে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি। এই বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে অনেকেই ভিন্ন কর্মক্ষেত্রে বেছে নেন। জস মনে করেন, এতে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ করা হয়। অন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে শিল্পচর্চা বা যেকোনো সৃজনশীল কাজ সম্ভব নয়। আমাদের দেশে অনেক মেধাবী নতুনরা এগিয়ে আসছে এ শিল্পে, যা ইতিবাচক। তবে জস মনে করেন, এ শিল্পে অনেকের মাঝে অনুকরণ প্রবনতা কাজ করে। তবে ইন্টারনেট থেকে অনুকরণ করার চেয়ে সেগুলো নিয়ে ভেবেচিন্তে কাজ করলেই বরং স্বকীয়তার প্রকাশ ঘটে। এই বিষয়ে তরুণরা আরও সচেতন হবে বলে আশা করেন তেজস হালদার। তিনি মনে করেন, যদি কেউ এটাকেই পেশা আর নেশা হিসেবে নিয়ে আঁঁকড়ে থাকতে চায় তাহলে তার স্টুডিও দরকার। তিনি আরও জানান, যদি আমাদের দেশে ভাস্কর্যের বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে স্থাপনায় পরিণত করা যায়, তাহলে আরও কাজের ক্ষেত্র বাড়বে। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একটা স্টুডিও করবেন। যেখানে অনেকেই আসবে, কাজ করবে আর ভাবনার বিনিময় হবে। নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে নবপ্রজন্মের হাত ধরেই তো আমাদের দেশ এগিয়ে যাব সমৃদ্ধির পথে এমনটাই আশা করেন তিনি। ০০০ লিটন পাল রনি ‘চিত্রকর্মের মতো ভাস্কর্যকে প্রচলিত শিল্পমাধ্যম হিসেবে সবশ্রেণীর মানুষ এখনও গ্রহণ করতে পারেনি’ জন্মের পর থেকেই দেখে আসছেন পারিবারিক পেশা হিসেবে মূর্তি বানানোর কলাকৌশল। কৌশলগুলোকে পেশাগত না করে পরম ভালোবাসায় নিজের মজ্জাগত করে নেন সেই ছোটবেলা থেকেই। কখনও খেলার ছলে, কখনও সময় কাটাতে হাতে তুলে নিয়েছেন কাঠ বা মাটি। পেশাগতভাবে তাদের বাড়িতে বানানো হতো ঐতিহ্যবাহী সব মূর্তি ও পুতুল। কখনও বাঁশি হাতে কৃষ্ণ অথবা গরুর পিঠে বসা দুর্গা। কিন্তু এসব ঐতিহ্যগত মূর্তিগুলো তাকে খুব বেশি টানত না। তাই ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক পেশাকে গ্রহণ না করে আধুনিক ভাস্কর্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার উদ্দেশ্যে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। বলছিলাম লিটন পাল রনির কথা। ভাস্কর্য নির্মাণের মাধ্যম হিসেবে ধাতুই তার প্রথম পছন্দ। যদিও উচ্চমূল্যের কারণে মাধ্যম হিসেবে ধাতু আমাদের দেশে খুব বেশি প্রচলিত না। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে মাধ্যম হিসেবে ধাতুর ব্যবহার আরও বেশি হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের রুচির পরিবর্তনই তাকে আশা জোগাচ্ছে বলে তিনি জানান। এই শিল্পের অগ্রগতির প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে তিনি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকেই দায়ী করেন। তা ছাড়াও চিত্রকর্মের মতো ভাস্কর্যকে প্রচলিত শিল্পমাধ্যম হিসেবে সবশ্রেণীর মানুষ এখনও যে গ্রহণ করতে পারেনি এই বিষয়কেও দায়ী মনে করেন তিনি। শুধুমাত্র ফিগার এক্সপ্রেশনকে ভাস্কর্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আধুনিক ভাস্কর্যের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলছেন তিনি। ০০০০০ রূপম রায় ‘মূলত আমাদের বেড়ে ওঠা নানাবিধ শিল্প-কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সঠিকভাবে আমরা দেখি কম’ তার স্কুল-কলেজ দুটোই কেটেছে গ্রামে। স্কুলজীবনে চারুকলা বিষয়ে বরাবরই ভালো করতেন এবং বন্ধুদেরও সাহায্য করতেন। তখন জানতেন না এ বিষয়ে পড়াশোনা করা যায়। বাবাই প্রথম চারুকলার কথা বলে তাকে এবং উত্সাহ দেয় চারুকলায় পড়ার জন্য। এসএসসি’র পর প্রথমে এক একাডেমীতে ভর্তি হন। সেখানকার স্যাররা তার কাজ দেখে প্রশংসা করে এবং বলে এটা নিয়েই পড়াশোনা করতে। এইচএসসি পরীক্ষার পর বড় ভাইয়ের সাথে ঢাকায় আসেন এবং চারুকলায় পরীক্ষা দিয়ে চান্স পান। এভাবেই সুপ্ত ভালোলাগার স্থানে তার আসা, বলছিলাম এই প্রজন্মের মেধাবী ভাস্কর রূপম রায় সম্পর্কে। তার করা প্রতিটি কাজের কনসেপ্টের পেছনে কোন বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পায় এবং এ ক্ষেত্রে তার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বর্তমান সময়ের মানুষ। বর্তমান সময়ের নানাবিধ অভিজ্ঞতাকে আমি আমার কাজে প্রয়োগ করি। আসলে যা বর্তমান সময়ে নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত। আর প্রত্যেকটি বিষয়ই আমি নিজে অনুভব করে কাজ করি এবং অন্যের অনুভূতিগুলোর মাধ্যমে আমার অভিজ্ঞতার ব্যাপকতা আনি।’ এই প্রজন্মের কাছে পেশা হিসেবে ভাস্করের চাহিদা এবং এর ভবিষ্যত্ প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মূলত আমাদের বেড়ে ওঠা নানাবিধ শিল্প-কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সঠিকভাবে আমরা দেখি কম। আমি মনে করি বর্তমান সময়ে তরুণ সমাজে পরিবর্তন এসেছে। আমাদের মৌলিক চাহিদার বাইরেও একটা চাহিদা আছে। আর সে চাহিদা মেটায় শিল্প। বর্তমান তরুণরা যান্ত্রিকতার বাইরে এসে শিল্পকে গ্রহণ করছে।’ রূপম রায়ের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন ভাস্কর্য তথা এই শিল্পের সাথেই থাকা এবং সাধারণ মানুষকেও শিল্পের সাথে যুক্ত করা।