প্রজন্ম মুখ

আলোকিত তারুণ্যের গল্প

প্রতিটি মানুষেরই একটি গোপন স্বপ্ন থাকে। স্বপ্নের সাথে সাধনা যোগ হলে রচিত হয় সাফল্যের গল্প। আজকের এই শিক্ষকতা পেশার নিবেদিত প্রাণ মো. জোবায়ের আলম সেই স্বপ্ন ও সাধনার সেতু বেয়ে এখানে এসেছেন। ভাগ্য বরাবরই তার পক্ষে পাল তুলেছে। যেখানে যখন যে পরিবেশে ছিলেন— তিনি কম বেশি প্রশংসায় সিক্ত হয়েছেন। সেই সাথে যোগ হয়েছে সহযোগিতার উদারী হাত। পরিবার থেকে প্রতিবেশি, শিক্ষক থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার অগ্রযাত্রাকে অগ্রগন্য করে তুলেছে। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে উত্তরের জেলা শহর নীলফামারীতে। স্কুলের প্রথম পাঠ থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবরই থেকেছেন প্রথম সারিতে। এই সাফল্যের জন্য তিনি মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ বলে জানালেন। পেশাগত জীবনে তার মা’ও একজন শিক্ষক। তার কাছে শৈশব-কৈশোর ও শিক্ষাজীবনের গল্প জানতে চাইলে তিনি ভাবনার আকাশে পাড়ি দিয়ে কিছুটা সময় হারিয়ে গেলেন। সেখান থেকে ফিরে মৃদু হেসে মেলে ধরলেন তার অধ্যবসায়ী দিনের গল্পের ঝাঁপি। তার ভাষ্যে, ‘আমার বেড়ে ওঠা নীলফামারীতে। স্কুলের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হই রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল ও কলেজে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সব সময় আমার লক্ষ্য উপরের দিকেই ছিল। স্বপ্ন ছিল ঢাবি থেকে মাস্টার্স করে কানাডায় যাবো পড়তে। রেজাল্টের দু’মাসের মধ্যে কানাডায় চলে যাই পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের জন্য। সেখান থেকে ফিরে ঢাবিতে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। এরপর বিয়ে হলো। কিছুদিন পর আবারও আমেরিকা যাই। সেখানে আমার সহধর্মিনী পড়তো নিউইয়র্কে ইউনিভাসিটিতে। আমি যেহেতু বসে থাকায় লোক নোই, তাই সেখানে এমবিএ ভর্তি হলাম। ২০১২ সালে পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফিরি। এবং ঢাবিতে পুনরায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেই। বর্তমানে ঢাবি’র সমুদ্র বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। পাশাপাশি দি বাংলাদেশ টুডে নামক একটি ইংরেজি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং প্রকাশক। ছোট থেকে সব স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। বিপুল অর্থের প্রতি আকর্ষন কখনোই আমার ছিল না। তবে আমি সম্মান পছন্দ করি। আমি এমন একটা মানুষ আমার নিজের জন্য চিন্তা করি না। আয়েশ কি সেটাও বুঝি না। জীবনে কখনো কোনো খারাপ কিছুর ব্যাপারে আকর্ষন বোধ করিনি। একান্ত নিজের জন্য এক হাজার টাকাও খরচ করিনি। কিন্তু মানুষের উপকার করতে সমাজ সেবামূলক কাজ করি। ঢাবিতে গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ফান্ড কালেকশন করেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি স্টুডেন্ট থেকেই বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর ঢাবি শাখার মিলিটারি সায়েন্স সিনিয়র ক্যাডেট হিসেবে কাজ করেছি, মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেছি, ঢাবির ফজলুল হক হলের সৃষ্টি সংগঠনের ব্যস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেছি, বন্ধুদের সাথে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলেছি। নিউইয়র্কে পড়ার সময় ‘ফেটফুলি ইয়োরস’ নামে একটি ইনডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম বানিয়েছিলাম। সেটি সেখানকার বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়েছিল। ওই ফিল্মে আমি ও আমার বন্ধুরা অভিনয় করেছি।’ আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে রহস্য কি? এমন প্রশ্নের জবাবে জোবায়ের আলমের সাবলীল উত্তর—‘কোনোদিন ফালতু কাজে সময় নষ্ট করিনি। কখনো বসে থাকেনি। সারাদিন কাজের মধ্যে থাকি। সময় অপচয় করতে আমার ভালো লাগে না। ছোট থেকেই ‘আমার লক্ষ্য ছিল জীবনে অনেক বড় হতে হবে। তবে অবশ্যই সেটা যেন সন্মানের হয়। এছাড়া নিজের প্রতি আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। বুঝতে পারি যে চেষ্টা করলে আমি পারবোই। সেজন্যই আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। তাই তো ঢাবি’র এমফিল সমমানের সার্টিফিকেট, সেই সাথে আমার দুইটি মাস্টার্স ডিগ্রি আছে। জীবনে একটা স্বপ্ন ছিল হার্ভার্ড ইউনিভার্সটিতে এক দিনের জন্য হলেও পড়বো। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। গত বছর তিনমাসের গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জ বিষয়ে আমি প্রোগামে অংশ নিয়েছি। আমি প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা পরিশ্রম করি। সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হই এবং রাত ১২টায় বাসায় যাই। এরপর ফ্রেশ হয়ে ভার্সিটির পরের দিনের লেকচার তৈরি করি। সকালে গাড়িতে বসেই স্লাইড সাজিয়ে ক্লাসে ঢুকি। ক্লাস শেষে বিকেলে চলে আসি দি বাংলাদেশ টুডে অফিসে। বলতে গেলে আমি আমার স্বপ্নগুলো সবসময় মনের মধ্যে ধারণ করি এবং তা সময় হলে পূরণ হয়ে যায়। এটা আমার কোনো ক্রেডিট নয়। পুরোটাই মহান আল্লাহ তায়ালার আর্শিবাদ বলতে পারেন। ভবিষ্যত্ ভাবনার কথা জানতে চাইলে জোবায়ের আলম বলেন, ‘আগামীতে আমি রাজনীতির সাথে জড়িত হতে চাই। এর উদ্দেশ্য হলো— আমার জন্ম স্থানের মানুষের জন্য বৃহত্ কিছু করতে। আমার এলাকাকে দেশের একটি মডেল হিসেবে সবাইকে দেখাতে চাই। ইচ্ছা ছিল আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিবো। কিন্তু সেটা করলে হয়তো পিএইচডি করা হবে না। তাই পরের বার অর্থাত্ ২০১৯ সালে নির্বাচনে অংশ নিবো ইনশাআল্লাহ। আগে আমাকে পিএইচডি করতে হবে। আমার স্বপ্ন নামের আগে ড. শব্দটি থাকবে। আমি ঢাবি ও অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথভাবে পিএইচডি করবো কোস্টাল এরিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেক ডেডিকেটেড। তাদের দেশের প্রতি আলাদা ভালোবাসা আছে। তাই আমি মনে করি শিক্ষিত তরুণরা বেশি করে রাজনীতিতে আসুক। সেইসাথে নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক কল্যাণের পথে।’ শিক্ষকতা পেশার প্রতি নতুন প্রজন্মের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে বলে তিনি জানালেন। আর এই আগ্রহ দেশে আলোকিত মানুষ গড়তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ‘সর্বাপেক্ষা মেধাবীরা বর্তমানে শিক্ষকতায় আগ্রহী হচ্ছে, যা আমি ইতিবাচক বলে মনে করি।’