যোগে স্বাস্থ্য যোগ
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:২৫
মূল ফিচার
শরীর ও মনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইয়োগা বা যোগাসনের কোনো বিকল্প নেই। যোগাসন দিয়ে নানা অসুখ তো বটেই, মানসিক সমস্যাও দূর করা সম্ভব। সুতরাং আজ থেকেই শুরু করুন। আর আবিষ্কার করুন নিজের শরীর ও মনের সুস্থতার নতুন মন্ত্র। সুস্থতার এই মন্ত্র নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
আপনি কি জানেন, ঠিক এ মুহূর্তে আপনি কেমন আছেন? কিংবা কেমন দেখাচ্ছে আপনাকে? আসুন না, নিজস্ব আয়নাটার সামনে খুব একান্তে দাঁড়াই একটু! এবার নিজেকে উন্মোচিত করুন। কেমন দেখাচ্ছে আপনাকে? ওই আয়নায় যেটা দেখছেন, সেটা আপনার দৈহিক অবয়ব। এই দেহই আমাদের ধারক, বাহক এবং চালক। এই দেহকে ঘিরে, দেহের মাধ্যমে এবং দেহের জন্যই আমাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড। মন বলে যে বিমূর্ত ধারণাপিণ্ড কল্পনা করি আমরা, তাও এই দেহনির্ভর। দেহ ছাড়া মন বিকৃত, অসম্পূর্ণ, অচল। দেহের বিনাশ ঘটলে মনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই, থাকে না। এজন্যই প্রাচীন যোগশাস্ত্রেও উক্ত হয়—‘শরীরমাদ্যং খলু ধর্ম সাধনম’। আপনি যা কিছুই সাধন করতে চান না কেন, এই দেহ ছাড়া গতি নেই, উপায়ও নেই। দৃশ্যমান এই দেহের অস্তিত্ব মানেই বাস্তবে আপনার অস্তিত্ব। দেহ নেই, আপনি নেই। দেহ ছাড়া কেউ থাকে না। দেহত্যাগের পরেও আপনার যে নামটা থেকে যাবে কিছুকাল আপেক্ষিক সময়জুড়ে, তাও এই দেহেরই অবদান। এই দেহ ধারণ করে দেহের মাধ্যমে করে যাওয়া কৃতকর্মই তার আপেক্ষিক স্থায়িত্বের মাধ্যমে আপনার অবর্তমানে আপনার নামটাকে বাঁচিয়ে সম্ভাব্য আপেক্ষিক স্থায়িত্ব দিতে পারে। অতএব, ভালো করে দেখুন যে দেহটা এ মুহূর্তে ধারণ করে আছেন আপনি।
হতে পারেন আপনি নারী বা পুরুষ, এবার বলুন তো, আয়নায় আপনার যে মানবদেহের অবয়ব দেখছেন, তা কি যেমনটা হওয়ার বা থাকার কথা তেমনই আছে? চোখ, মুখ, নাক, কান, মুখমণ্ডল, গলা, কাঁধ, বাহু, হাত, বুক, পেট, পিঠ, কোমর, উরু, পা, আঙুল, নিতম্ব, জঙ্ঘা, জননেন্দ্রিয় তথা গোটা দেহকাঠামো সম্পূর্ণ, সুঠাম, সুস্থ, সবল, নিরোগ, অবিকৃত, নিখুঁত, স্বাভাবিক সুন্দর, সক্রিয় ও সাবলীল? এবার অন্তর্চক্ষু উন্মিলিত করুন। কল্পনা করুন আপনার দেহের ভেতরে অবস্থিত আভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-তন্ত্রীগুলোর কথা। মস্তিষ্ক, স্নায়ুরজ্জু, বিবিধ হরমোন গ্রন্থি, হূিপণ্ড, ফুসফুস, ধমনী, শিরা-উপশিরা, পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র, মাংস-পেশি-অস্থি-মজ্জা-মেরুদণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, রক্তসংবহনতন্ত্র, প্রজননতন্ত্র, বিপাকক্রিয়াদিসহ ইত্যাদি সমূহ সিস্টেম বা প্রক্রিয়া কি সুস্থ, স্বাভাবিক, সক্রিয় ও সাবলীল আছে? আরও আছে আপনার স্বপ্ন-কল্পনা-ভাবনার বিস্ময়কর বিমূর্ত সেই জগত্, যেখানে গ্রন্থিত হয় সৃজনের অবিরল স্রোত। সেও কি শারীরিক ও মানসিক বাধামুক্ত সতেজ উদ্যমে গতিমান? এসবের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, শুধু আমি নই, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সবাই আপনাকে স্যালুট বা অভিবাদন জানাবে। উত্তর যদি হয় ‘না’, তাহলে দেরি নয়, এখনই ভাবুন, এক অসম্পূর্ণ অপভ্রংশ দৈহিক ও মানসিক অস্তিত্ব নিয়ে কতদূর যেতে পারেন আপনি? আর আপনার এ চলার পথই বা কতটা নিরাপদ, উদ্বেগহীন, ইচ্ছা-স্বাধীন?
কথায় বলে, সুস্থ দেহ সুন্দর মন। কথাটা সর্বাংশেই সত্য। দৈহিক সুস্থতার কোনো বিকল্প নেই। একটা নিরোগ সুস্থ-সুঠাম সতেজ কর্মঠ দেহের সাথে মানসিক ভ্রান্তিহীন চাপ নিরপেক্ষ সুডোল মনের রাখীবন্ধন ঘটলেই কেবল কাঙ্ক্ষিত সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবনের নিশ্চয়তা মেলে। কিন্তু আমাদের জীবন-বাস্তবতায় তা কতটা অর্জন সম্ভব?
দৈহিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম। কিন্তু পরিশ্রম পরিকল্পিত না হলে দৈহিক সৌন্দর্য ও সুস্থতা নিশ্চিত হয় না। দেহের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিমিত সঞ্চালন ও সক্রিয়তা না হলে দেহবিন্যাস সুষম ও সুগঠিত হতে পারে না। এজন্যই দেহের জন্য দরকার হয়ে পড়ে পরিকল্পিত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের। আমাদের এ নাগরিক সভ্যতায় মাঠ-ঘাট-খোলা জায়গা এখন যেভাবে ধীরে ধীরে কল্পজগতের বস্তু হয়ে উঠছে তাতে করে শরীরচর্চার পরিসর ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। কিন্তু দেহের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি ও রক্তসংবহনতন্ত্রের পরিমিত সঞ্চালন ও সক্রিয়তা রক্ষার অনন্য মাধ্যম হিসেবে ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম এখানে তুলনাহীন। যোগ-ব্যায়ামের বিভিন্ন আসনগুলো চর্চার জন্য আপনার ঘরের স্বল্পপরিসর মেঝে বা আপনার বিছানাটাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।
যোগাসনের উপকারিতা
শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সময় সাধারণত ফুসফুস মাত্র দু’তিন ভাগ প্রসারিত হয়। কিন্তু নিয়মিত যোগাসন করলে ফুসফুস প্রায় ১০০ ভাগ প্রসারিত হয়। এতে শরীরে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন প্রবেশ করতে পারে।
যোগাসনের ফলে নার্ভাস সিস্টেম ও সাকুলেটরি সিস্টেমের কর্মক্ষমতাও অনেকখানি বেড়ে যায়। ফলে ফুসফুস ও হূদযন্ত্রের কার্যকর ক্ষমতাও বাড়ে।
স্ট্রেস কাটাতে যোগাসনের বিকল্প নেই। স্ট্রেস থেকে নিস্তার পেতে জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখতে হবে। যোগাসন এমনই একক মন্ত্র যা জীবনকে নতুনভাবে চিনতে শেখায়।
যোগাসন এনার্জি লেভেল বাড়াতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। যাদের এক জায়গায় বসে কাজ করতে হয় তারা খুব অল্পেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। তাই অফিসে আসার আগে যোগাসন করলে মুড ভালো থাকবে। অথবা মুড খারাপ থাকলে বাড়ি ফিরে যোগাসন করুন। দেখবেন মুড ভালো হয়ে গেছে।
ডিপ্রেসন ভুগলে যোগাসন করুন। যোগাসনের ইতিবাচক মনোভাব আপনাকে নতুন উদ্যমে জোগাবে।
যেভাবে শুরু করবেন
যোগাসন শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। পাঁচ বছর বয়স থেকেই যোগাসন শুরু করা যায়। টিভিতে, বইয়ে নানা রকম যোগাসন দেখে ভয় পাবেন না। অনেক সময় নানা ধরনের যোগাসন দেখলে মনে হয়, কোনটা করা ঠিক হবে আর কোনটা নয়। কনফিউশন হলে প্রথমে কোনো এক্সপার্টের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে পারেন। যোগাসন শুরু করার সময় প্রথমেই খুব বেশি শক্ত বা কঠিন আসন ট্রাই করার দরকার নেই। কিছু বেসিক আসন দিয়ে শুরু করুন।
পেলভিক টিল্টস
যখন হাতে সময় খুব কম, এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টা যোগাসন করার সময় নেই, তখন পেলভিক টিল্টস খুব কাজে আসতে পারে। এতে সময় লাগে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট। প্রথমে সোজা হয়ে শুরু পড়ুন। আস্তে আস্তে হাঁটু থেকে পা ভাঁজ করুন। দু’হাত দু’পাশে রাখুন। এবার আস্তে আস্তে শ্বাস টেনে ধরুন। এতে পেটের মাসলের ওপর চাপ পড়বে। এই অবস্থায় কিছুক্ষণ থেকে আবার নিঃশ্বাস বাইরে ছাড়ুন। এই স্ট্রেচের ফলে পিঠ ও কোমরে ব্যথা থাকলে, তা দূর হয়। ১০ থেকে ১২ বার এই আসনটি রিপিট করুন।
কার্পস পোজ
সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন। দু’পায়ের মধ্যে ফাঁক রাখবেন। হাতে শরীরের দু’পাশে রাখুন। চোখ বন্ধ করুন। আস্তে আস্তে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে মাথা ঘোরান। এমনভাবে মাথা ঘোরাবেন যাতে কানের লতি মাটি ছুঁয়ে যায়। এইভাবে কয়েকবার মাথা এক পাশ থেকে আরেক পাশ দিয়ে যাওয়ার পর স্থির হয়ে শুয়ে থাকুন। ব্রিদিংয়ের ওপর মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করুন।
পবর্তাসন
প্রথমে পদ্মাসনে বসুন। শ্বাস নিতে নিতে দু’হাত কানের পাশ দিয়ে মাথার উপর তুলুন। মেরুদণ্ড যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখুন। যোগাসনের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম নির্বাচন ও দৈনন্দিন তালিকাভুক্তির সুবিধার্থে বয়স, দেহের বিভিন্ন অংশ ও রোগ-নিরাময় বিবেচনায় প্রয়োজনীয় যৌগিক ব্যায়ামের তালিকা জেনে রাখা সবার জন্যই সুবিধাজনক।