মৃদুমন্দা চলছে থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:১৩
অপ্রত্যাশিতভাবেই মৃদুমন্দার মুখোমুখি থাইল্যান্ডের অর্থনীতি। রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগ— সব কিছুতেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়ে চলছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এ দেশটি। কিন্তু সেই রমরমা ভাব আপাতত নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটার পর এবারই প্রথম টানা দুই প্রান্তিকে জিডিপি কমেছে থাইল্যান্ডে (তৃতীয় প্রান্তিকের রিপোর্ট এ লেখার আগ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি)। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এনেছে থাই সরকার। অন্যদিকে দেশটির ভোক্তা ও পরিবার পিছু ঋণ বাড়তে থাকায় প্রবৃদ্ধি উত্সাহিত করতে কোনো পদক্ষেপ নেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংককের ন্যাশনাল ইকোনমিক এন্ড সোশ্যাল বোর্ড জানায়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কিছুটা অবাক করে দিয়েই দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে জিডিপি। প্রথম প্রান্তিকের পুনর্বিন্যস্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সে সময় জিডিপির সংকোচন হয়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ।
এদিকে পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় জিডিপির মোট আকার বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ। যার কৃতিত্ব মূলত ২০১২ সালের শেষ দুই প্রান্তিকে উত্পাদন বৃদ্ধির। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকারের বিশেষ ব্যয় পরিকল্পনা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে আগেই। এ পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন নীতি-নির্ধারকরা। অনেকে এরই মধ্যে সোত্সাহে নেতিবাচক কথাবার্তা বলা শুরু করে দিয়েছেন। এর পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রপ্তানি পরিস্থিতিতেও কিছুটা অবনতি দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক অব সহকারী গভর্নর পাইবুন কীত্তিশ্রীকাঙ্গওয়ান জানিয়েছিলেন, থাইল্যান্ডের ভোক্তাশ্রেণী ও পরিবারগুলোর ঋণ মোট জিডিপির ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থায় থাইল্যান্ডে সুদের হার কমানোর রাস্তাটি প্রায় বন্ধ। আগপাছ চিন্তা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশেই স্থির রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, নইলে যে পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
সুমিতুমি মিতসুই কোম্পানির হয়ে ব্যাংককে মুদ্রা লেনদেন করেন তজো হাসেগাওয়া। তিনি বলেন, ‘রপ্তানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদাও কমে এসেছে। এদিকে আবার বিস্ময়করভাবে অবকাঠামো খাতে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনাটিও পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও সুদের হার এখানেই স্থির রাখতে হবে। সামনের দিনগুলো আগের চেয়ে যে আরো অনেক কঠিন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’ থাই সরকার চলতি বছরে তাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে স্থির করেছে। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ২ শতাংশের বদলে ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল থাই বাথ। সেখান থেকে এখন পর্যন্ত ৫ শতাংশেরও বেশি দর হারিয়েছে মুদ্রাটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পূর্বাভাসে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এদিকে বছরের প্রথমার্ধে রপ্তানি বেড়েছে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম, মাত্র দশমিক ৯৫ শতাংশ। রপ্তানিতে দুর্বল প্রবৃদ্ধিই জিডিপি কমে যাওয়ার জন্য দায়ী হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ বছরের মে মাসে সুদের হার দশমিক ২৫ পয়েন্ট কমিয়ে আনে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের মতো সিঙ্গাপুরও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এনেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপর পাওয়ারহাউস খ্যাত ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধিও ২০১০-এর পর প্রথমবারের মতো বার্ষিক হিসেবে ৬ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
জুলাইয়ে থাইল্যান্ডের ভোক্তাদের আস্থাসূচকটি গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক আশঙ্কা এ দুটোই এতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বিরোধী প্রতিবাদকারীদের বন্দি করার জন্য বিশেষ আইন পাস করেছে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকার। কিন্তু আইনসভার ভেতরে-বাইরে অনেক মানুষ রাজবন্দিদের জন্য সাধারণ ক্ষমার দাবি করলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।
থাই সরকার প্রায় ২ ট্রিলিয়ন বাথের অবকাঠামো প্রকল্প এবং ৩০০ বিলিয়ন বাথের জল-ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টয়োটা মোটর্সেও এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অতিসম্প্রতি জানিয়েছেন, এ বছর থাইল্যান্ডে তাদের বিক্রি প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে ভোগে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ করে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে বেসরকারি ভোগ বাড়ে মাত্র ২ দশমিক ৪ ও সরকারি ভোগ বাড়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড
ট্রিবিউন অনুসরণে