নৃ-গোষ্ঠী মুখ

পরাগ রিছিল সংগ্রাহক, গারো সংস্কৃতি ডাকনাম :পরাগ জন্মতারিখ :৩ জুলাই মায়ের নাম :জয়ন্তী রিছিল বাবার নাম :কার্নেশ চিসিম প্রথম স্কুল :জয়রামকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :মা প্রিয় উক্তি :নিজেকে জানো প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি অবসর কাটে যেভাবে :পত্রিকা ও বই পড়ে সাফল্যরে সংজ্ঞা :অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছতেপারা। ছোটবেলায় নানীর সাথে ঘুমতেন পরাগ। তিনি খুব সুন্দর করে গল্প বলতে পারতেন। শুনেছি গল্প না শুনে কোনোদিনই নাকি ঘুমোতে চাইতাম না। মাচ্ছাদু-মাচ্ছাবেত্, নসি-দিমসির গল্প। সে এক অদ্ভুত আলাদা জগত্। কিছুটা দূরত্বে একাকী থেকে থেকে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির ওপর ভালোবাসা, মমত্বের টানটা দৃঢ়তর হতে থাকে পরাগ রিছিলের। ক্যাম্পাসে বাঙালি বন্ধুদের পাশাপাশি বন্ধুত্ব হয় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, ওঁরাও আদিবাসীদের সাথে। ‘যৌথপাঠ’ নামে একটি পাঠচক্র গড়ে উঠলে এর সাথে যুক্ত হন পরাগ। জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট আর প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে থাকতে চেষ্টা করেছেন সব সময়। ক্যাম্পাসে থাকতে বন্ধুদের সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন জাতিতাত্ত্বিক ও লোকায়ত জ্ঞানবিষয়ক পত্রিকা ‘মৃত্তিকা’, ২০০৩ সালে সম্পাদনা করেন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘পরাণ শাঁ’, ২০১০ সালে বের হয় কাব্যগ্রন্থ ‘ঊমাচরণ কর্মকার’। বর্তমানে দুইটি পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ চলছে তার। পরাগ রিছিলের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট থানার জয়রামকুড়া গ্রামে যৌথ পরিবারে। তার মা মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি জানালেন, তার পড়াশোনার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকাই প্রধান। মা বারান্দায় পড়ায় বসিয়ে বলতেন, ‘জোরে জোরে পড়, আমি উঠোন ঝাড় দিতে দিতে শুনছি।’ বর্তমানে পরাগ রিছিল বৃহত্তর সমাজের সাথে আদিবাসীদের সংস্কৃতির পারস্পরিক সেতুবন্ধন গড়ার কাজ করছেন। আদিবাসী সমাজের সাথে যে দূরত্ব, নেতিবাচক ধারণাগুলো প্রচলিত রয়েছে সেসব ঘোচাবার চেষ্টা করছেন। তার কাজ সর্ম্পকে জানতে চাইলে পরাগ রিছিল বলেন, ‘গারো সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান রূপকথা, গল্প, গীতিকা, রেরে, আজিয়া, খাত্থা দক্কা, খাবি যেসব প্রায় বিপন্নতার পর্যায়ে চলে গেছে বলা চলে, সেসব সংগ্রহ ও সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। স্বাধীনভাবে গবেষণা কর্ম চালিয়ে যাচ্ছি। মান্দি বা গারোদের সর্ববৃহত্ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান ‘ওয়ান্না’ অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছি অনেক বছর যাবত। ওয়ান্নার ম্যাগাজিন সম্পাদনা করছি চার বছর ধরে। এ ছাড়া সাংসারেক মান্দিদের কোথাও অনুষ্ঠান হচ্ছে শুনলে ছুটে যাই। এসব কাজের সাথে জড়িত বলে সুযোগ ঘটে যায় বাংলা একাডেমি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের প্রকল্পে লেখা দিয়ে যুক্ত থাকবার এবং বিদেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপকের সাথে গবেষণা কাজ করার।’ তার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে পরাগ বলেন, ‘গ্রামে একটি পাঠাগার গড়ে তোলা, বই পড়ে যাতে অনেকের মন প্রসারিত হয় এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা বৃদ্ধি পায়।’ ০০০ জ্যোতি সিনহা সাধারণ সম্পাদক, মণিপুরী থিয়েটার ডাকনাম :জ্যোতি জন্মতারিখ ও স্থান :২৯ নভেম্বর, সিলেট মা :ভাগ্যবতী সিনহা বাবা :মৃত ললিত মোহন সিংহ প্রথম স্কুল :রসময় মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়, সিলেট প্রিয় মানুষ :আমার শিক্ষাগুরু শুভাশিস সিনহা প্রিয় পোশাক :মণিপুরী ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও শাড়ি। অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, বই পড়ে ও সিনেমা দেখে। সাফল্যের সংজ্ঞা :মনকে একমুখী, কর্মকে উত্সবমুখর, চিন্তাকে যৌক্তিক, কল্পনাকে স্বাধীন করলেই সাফল্য আসবে। ছোটবেলায় বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে যেন গায়িকা হয়, কিন্তু মেয়ের আগ্রহ ছিল নাচে। টেলিভিশনে নিয়মিত ‘এসো গান শিখি’ আর ‘এসো নাচ শিখি’ দেখতেন। পরে বাবা মারা যাওয়ার পর গ্রামে এসে নতুন দল মণিপুরী থিয়েটারে যোগ দেন। অভিনয়ের মাঝেই তার নতুন ঠিকানা খুঁজে পান। এটাকেই তার জীবনের ধর্ম-কর্ম বলে মেনে নিলেন। অভিনয়ের জীবনের শুরু থেকেই মঞ্চেই আছেন জ্যোতি সিনহা। বাবা ছিলেন ব্যাংকার, মা গৃহিণী। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাবা স্ট্রোক করে মারা যান। সুখের জীবন থেকে ছিটকে পড়েন তারা। তখন জ্যোতির মাত্র বারো বছর বয়স, শুরু হয় তার জীবন-সংগ্রাম। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, দারিদ্র—সব কিছুর সাথে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। এ সময় তাদের মায়ের ভূমিকা ছিল অনন্য, তিনি শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছিলেন। জ্যোতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃ-বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে মণিপুরী সংস্কৃতির উপর এমফিল ডিগ্রি করছেন। এরই পাশাপাশি দু’বোনই মণিপুরী থিয়েটারের জন্মলগ্ন থেকেই নিবেদিত হয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে জ্যোতি দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত। নিজের কাজ সম্পর্কে জ্যোতি সিনহা বলেন, ‘মূলত মঞ্চে অভিনয় করাই আমার প্রধান কাজ।’ জানালেন, এ পর্যন্ত প্রায় বিশটির মতো নাটকে বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘কানাইলালের সানাই’, ‘ধ্বজো মেস্তরীর মরণ’, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘ইঙাল আধার পালা’, ‘লক্ষী গিথানক’, ‘কহে বীরাঙ্গনা’,‘দেবতার গ্রাস’, ‘বিদেহ’ ইত্যাদি। ২০০১ সালে অনূদিত বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নাটকে রাধা চরিত্র ছিল তার অভিনয় জীবনের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট। মঞ্চের কাজ ছাড়াও বেশ কিছু টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন জ্যোতি। এর বাইরে মণিপুরী সংস্কৃতির বিভিন্ন নাট্যাঙ্গিক সমৃদ্ধ পরিবেশনা নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি নাচও শিখেছেন জ্যোতি। বর্তমানে তিনি মঞ্চনাটকের কোরিওগ্রাফার এবং কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালে প্রাচ্যনাট্যের আয়োজনে তরুণ নাট্যকর্মী সম্মাননা, ভারতের শিলচরে এলএল প্রোডাকশনের আয়োজনে ‘রত্ননন্দিনী’ খেতাবে ভূষিত হওয়া। সাংস্কৃতিক পরিসরে কাজের ফলস্বরূপ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর অধীনে মঞ্চে কাজ করা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সম্মানজনক চাকরি প্রাপ্তি ঘটে তার। জ্যোতি সিনহা বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অধীনে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত নিজের সংস্কৃতি তথা দলকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সাধনা এবং থিয়েটার-প্রফেশনালিজম তৈরি করা।’ ০০০ সালাস মানকিন চিত্রশিল্পী ডাকনাম :সালাস জন্মতারিখ ও স্থান :১২ জুলাই, টাঙ্গাইল মায়ের নাম :বাসন্তী মানকিন বাবার নাম :মৃত নদু নকরেখ প্রথম স্কুল :আমলিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় উক্তি :সততা ও পরিশ্রমেই সফলতা। প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় পোশাক :জিন্স ও টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :ঘুরে বেড়িয়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সততা। সালাস মানকিনের ছবি আঁকার প্রতি দারুণ নেশা। রং-তুলি নিয়ে ছবি আঁকেন অনেকদিন থেকেই। তার দীর্ঘদিনের আঁকাআঁকির মাঝ থেকে কিছু ছবি নিয়ে হয়েছে প্রদর্শনীও। সেগুলো দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা কিনেও নিয়েছেন। টাঙ্গাইলের মধুপুরের ছেলে সালাস তার স্বপ্নের পথ ধরে এক-পা দু-পা করে এগিয়ে এসে প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছে থাকলেই সম্ভব সবকিছু। অনেক প্রতিবন্ধকতা এসেছে তার চলার পথে, সালাস সেগুলো অতিক্রম করেই আজকের অবস্থানে এসেছেন। সালাস মনে করেন, শিল্প-সংস্কৃতির দিকে যাদের আগ্রহ বেশি তাদের জন্য উপযুক্ত বিষয় হচ্ছে চারুকলা সংক্রান্ত বিষয়ে পড়াশোনা। যারা নিজের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগাতে চায়, সাধারণত সেসব শিক্ষার্থীই এ বিষয়ে পড়তে বেশি আগ্রহী। আর সালাসও তাই এ বিষয়টিকেই নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সালাস মানকিন বলেন, ‘অবসর পেলেই আঁকাআঁকির মধ্যে ডুবে থাকি। শুধু অবসর বলছি কেন, ঘুরতে গেলেও আঁকতে বসে যাই। এ এক অন্যরকম নেশা। দুয়েক দিনের কথা নয়, শৈশব থেকেই আমার এই আঁকার নেশা। শখের নেশা কি আর ছেড়ে দিতে পারি? এই নেশাতেই ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। আদিবাসীদের জীবন নিয়েই ছবি আঁকতে পছন্দ করি। তাই আমার আঁকায় রঙের ছটা কম। দোয়াত-কালি ও ওয়াটার কালারই বেশি ব্যবহার করেছি। নিজের আঁকা অনেক ছবি সংগ্রহে রয়েছে। এগুলো যত্নের সঙ্গে রেখে দিয়েছি। নতুন করে আরও অনেককিছু আঁকার পরিকল্পনা রয়েছে। আসছে এপ্রিলে একটা প্রদর্শনীরও প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ সালাস মানকিন তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যাদের স্বপ্নটা একটু অন্যরকম। হতে চান চারুশিল্পী। শিল্প যাদের ধ্যান-জ্ঞান। পড়তে পারেন চারুকলায়। যাদের অংকন ও চিত্রায়ন, গ্রাফিক ডিজাইন, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, প্রাচ্যকলা, মৃিশল্প, কারুশিল্প ইত্যাদি মাধ্যমের প্রতি অদম্য ঝোঁক তাদেরকে বলছি—ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করে দেন। অধ্যবসায়ী উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা সময় নষ্ট না করে চারুকলায় পড়াশোনার জোর প্রস্তুতি চালিয়ে যান। ভবিষ্যতের চারুশিল্পীরা, নিজেকে সঠিকভাবে তৈরি করার সঙ্গে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে এগিয়ে চলুন এমনটাই প্রত্যাশা।’