রাজনৈতিক দলগুলো দায় এড়াতে পারে না
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৫৫
আবারও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় জর্জরিত হলাম। ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে কটূক্তির গুজবকে কেন্দ্র করে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় হিন্দু সমপ্রদায়ের ওপর হামলার যে ঘটনা ঘটেছে তা খুবই দুঃখজনক। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে বৌদ্ধপল্লিতে হামলা করে ১২টি বৌদ্ধবিহার এবং ৩৪টি বসতবাড়ি পুুুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরদিন পাশের উখিয়া ও টেকনাফেও সাতটি বৌদ্ধবিহার ও ১১টি বসতিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় যে, সাঁথিয়ার বনগ্রামে এ সময় হিন্দু সমপ্রদায়ের ২০-২৫ টি বাড়ি এবং দুটি মন্দিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। এর চেয়ে হতাশা ও লজ্জার ঘটনা একটা জাতির জন্য আর কী হতে পারে? পৃথিবীর কোনো ধর্মই তো সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয় না, তবুও একটা গোষ্ঠী বার বার সহিংস কর্মকাণ্ডের দ্বারা আমাদের মনে করিয়ে দিতে চায় যে এই দেশে সংখ্যালঘুরা হচ্ছে অনাহুত।
যতবারই আমরা সংখ্যালঘুরা অতীতের দুঃসহ বেদনার্ত মুহূর্তগুলো পিছনে ফেলে ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়কে লালন করে কোনো রকম বেঁচে থাকার চেষ্টা করি ততবারই লাঞ্ছিত হই, ব্যথিত হই। আসলে আমরা কোনোভাবেই নিরাপদ নই। ভাবতে অবাক লাগে স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও এই রাষ্ট্রযন্ত্র এখনও সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। তাই তো এই রকম বর্বর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করে রাজনৈতিকভাবে তাদের পুনর্বাসন করা হয়। আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, গত দশ বছরে এই দেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমেছে ৮০ লাখ যা খুবই উদ্বেগজনক। এক শ্রেণির অর্বাচীন ও সুযোগসন্ধানী মানুষের বেপরোয়া আচরণ দেখলে মনে হয়—এই দেশে হিন্দুরা হচ্ছে সকল সমস্যার কারণ; একমাত্র হিন্দু না থাকলেই দেশে শান্তি আসবে !
সাঁথিয়ার এই ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না। অন্যান্য স্থানে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার বিচার হয়নি বলেই কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর বার বার হামলা চালানোর সাহস পাচ্ছে। বিচার না করা আক্ষরিক অর্থে অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেওয়ারই নামান্তর। সব ধর্মই প্রকৃত পক্ষে শান্তির বার্তাবাহক এবং সহনশীলতার প্রতীক। ধর্মীয় আদর্শ মেনে চললে সহিংসতাকে এবং বর্বরতাকে প্রশ্রয় দেবার কোনো সুযোগ নেই। এই দেশে প্রতিটি নাগরিকের সমানাধিকার সংবিধানের পাতায় শুধু লিখিতভাবেই স্বীকৃত—বাস্তবে এর কোনো ভিত্তিও নেই, প্রয়োগও নেই। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে আমরা যে অহিংস বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে যদি আমরা এই উগ্র মৌলবাদের উত্থান শক্ত হাতে দমন করতে না পারি । এই সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের অসামপ্রদায়িক ঐতিহ্যেও আঘাত হানছে। রাজনৈতিক দলগুলো কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না ।
সিলেট