অর্থনৈতিক মন্দায় ইতালি জুড়ে হতাশা

এক প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে ছোট বোনের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন ৭৩ বছর বয়স্ক জিউসেপ্পে সপরাঞ্জি। গিয়ে দেখেন, তার বোন ও বোন জামাই ছাদের সঙ্গে ঝুলছে। এ কষ্ট সইতে পারেননি তিনি। পরের দিন সাঁতার না জানা সত্ত্বেও নিজেকে সাগরে ভাসিয়ে দেন জিউসেপ্পে সপরাঞ্জি। ইতালির পূর্বাঞ্চলের সিভিটনোভা মার্শে শহরে ঘটে এ ঘটনাগুলো। এই তিন আত্মহত্যার খবর মিডিয়ায় আসার পরপরই সেই শহর পরিদর্শনে গিয়েছিলেন ইতালির চেম্বার অব ডেপুটিজ-এর সভাপতি লরা বলদ্রিনি। ফেরার পথে পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাত্কারে তিনি বলে আসেন,‘ ইতালির বর্ধিষ্ণু অর্থনৈতিক সমস্যাই এই তিন মৃত্যুর কারণ। আমি শঙ্কিত, এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে আরো অনেক ঘটবে। চলমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার নিরসন ছাড়া দেশের আত্মহত্যা বৃদ্ধি রোধ করা যাবে না।’ আন্নামারিয়া সপরাঞ্জি (৬২) ও রোমিও ডাওনিনি (৬৮) দম্পতি কঠিন জীবনসংগ্রাম করছিলেন। মাত্র কয়েকশ’ ইউরো পেনশন দিয়ে কিছুতেই চলছিল না তাদের। ধারদেনা করে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। এই তিন আত্মহত্যার সংবাদে ইতালীয়রা দারুণ মর্মাহত হয়েছেন। গ্লোবাল রাইটস ২০১৩-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৪০ শতাংশ বেশি। অর্ধেক মৃত্যুর কারণই অসহনীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। ২৪ শতাংশ ঘটেছে চাকরি হারানোর সুবাদে। রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, সামনের দিনগুলোতে আত্মহত্যার ঘটনা আরো বাড়তে পারে। কারণ দেশটির অর্থনৈতিক উত্তরণের কোন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। উল্টো পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। ইতালির ক্রমাবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে এখন খুব একটা কষ্ট হয় না। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট (আইএসটিএটি) তথ্য দিয়েছে, ২০১২ সালে ২৫ শতাংশ ইতালীয়ই ‘বঞ্চিত পরিবারের’ সদস্য ছিল। ২০১০ সালে এ সংখ্যাটা ছিল ১৬ শতাংশ। ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এ দেশটিতে গত মাসে বেকারত্বের হার সাড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছে যায়, যা কিনা রেকর্ড। রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট আন্দ্রিয়া হাসপাতালের আত্মহত্যা প্রতিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক মাউরুজিও পম্পিল জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক দৈন্যদশা জনগণের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ইদানিং অধিকাংশ আত্মহত্যার কারণ হিসেবে খুঁজে পাচ্ছেন, চাকরি হারানো, বেকারত্ব কিংবা ঋণে জর্জরিত হওয়াকে। আত্মহত্যার চিন্তা-ভাবনা করছেন এমন একজন উদ্যোক্তা তাদের কাছে সমপ্রতি জানিয়েছেন, ৩৬ মিলিয়ন ইউরো ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলাতেই এ কাজটি করার ব্যাপারে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তার আত্মহত্যা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে এখন। বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানির কাছ থেকে ইতালি সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ইউরো। নবনিযুক্ত সরকার বলছে, ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ এমন সকল ঋণ পরিশোধ করা হবে। কিন্তু বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি মোটেই সম্ভব নয়। লিংক ল্যাব-এর পরিচালক নিকোলা ফেরিজনি তথ্য দেন, ২০১৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১৪ জন উদ্যোক্তা নিজের জীবনপ্রদীপ নিজেই নিভিয়ে দেয় আর এ পথ বেছে নেয়া ব্যবসায়ীদের সংখ্যাটা ১৬। আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সহসা অর্থনৈতিক সমস্যা সুরাহার কোনো দেখা যাচ্ছে না। এতে বিশেষত উদ্যোক্তারা হতাশ। তারা আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি আরো জানান, স্বাভাবিকভাবেই প্রথম প্রান্তিকে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যাটাই বেশি; ৩২জনে ৩০ জন। এর কারণ ইতালিতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসা সংশ্লিষ্ট লোকজনের বেশিরভাগই পুরুষ। তবে আত্মহত্যা সংক্রান্ত অনেক তথ্যই মানতে নারাজ ইতালির শ্রমমন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি কার্লো দেলারিঞ্জা। তিনি বলছেন, আত্মহত্যার হার বেড়েছে এটা ঠিক; কিন্তু যতোটা বলা হচ্ছে ততোটা নয়। অর্থনৈতিক সমস্যায় থাকলে আত্মহত্যার খবর মিডিয়ায় একটু বেশিই আসে। তার স্পষ্ট কথা, এ কথাটি ঠিক নয় যে, অর্থনৈতিক সমস্যাই আত্মহত্যা বৃদ্ধির মূল কারণ। আর্থিক দুর্দশার কারণে কর্মীদেরকে ছাঁটাইয়ের পর উদ্যোক্তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। এ কারণেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভেনেটো নামক স্থানে আত্মহত্যা বেশি ঘটছে। সেখানে একজন উদ্যোক্তা যে অল্প সংখ্যক লোককে খাটিয়ে থাকে তাদের বেশিরভাগই মালিকের বন্ধু কিংবা আত্মীয়। সেই কর্মীদের ছাঁটাই করাটা তার পাঁজরে লাগে। কারণ ওইসব পরিবারের আর্থিক অবস্থা তিনি খুব ভাল করেই জানেন। লিংক ট্যাব-এর গবেষণা বলছে, এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মোট আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। সংখ্যাটা দক্ষিণের তুলনায় দ্বিগুণ। এর হেতু একটাই, দেশের ছোটখাটো কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই ওই অঞ্চলে। তবে তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন আইএসটিএটি-এর স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক আলেসান্দ্রো সলিপাসা। তার অভিমত, অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়লেই যে আত্মহত্যা বেড়ে যাবে, এ কথাটি ঠিক নয়। গ্রীসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইতালির চেয়ে অনেক খারাপ। কিন্তু সেখানকার আত্মহত্যার হার অনেক কম। ইতালিতে এর পেছনে অন্য কোনো বিষয় কাজ করছে, সেটিকে খুঁজে বের করতে হবে। —আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে