পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করিয়া দীর্ঘ সাত মাস ধরিয়া মহাশূন্যে সাড়ে পাঁচ কোটি কিলোমিটার পথ সাঁতরাইয়া গত সোমবার মঙ্গলে পাড়ি জমাইয়াছে মঙ্গলযান ইনসাইট। আমেরিকা জুড়িয়া যখন থ্যাঙ্কস গিভিং-ডে’র উদ্যাপন চলিতেছে, তখন মঙ্গলে অবতরণের শেষপর্বের কাজ অহর্নিশ তদারকি করিতেছিলেন নাসার বিজ্ঞানীরা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইনসাইটের অবতরণের লাইভ ভিডিও দেখিবারও বন্দোবস্ত করা হয়। কেবল ইনসাইট নহে, মঙ্গলে সফল অভিযান খুব সহজ কাজ নহে। প্রথম মঙ্গল অভিযানের চেষ্টা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬০ সালে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। প্রথম ব্যর্থতার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া ব্যর্থ হয় পর পর ছয়টি মঙ্গল-মিশন। ১৯৬৪ সালের ২৮ নভেম্বর প্রথমবারের মতো সফল হয় মঙ্গলাভিযান। যুক্তরাষ্ট্রের নাসার তত্ত্বাবধানে ম্যারিনার-৪ তাহার মিশন শেষ করে পরের বত্সরেই। মঙ্গলের উদ্দেশে পরিচালিত এখন অবধি ৫৬টি অভিযানের মধ্যে সম্পূর্ণ ও আংশিক সাফল্য আসিয়াছে ২৭ বার। ২০০১ সালের ৭ এপ্রিল প্রথমবারের মতো অপারেশনাল অভিযান চালানো হয় মঙ্গলে, যাহার নাম মার্স ওডিসি। ইহার পর আরো আটটি অপারেশনাল অভিযান চালানো হয় মঙ্গলে।
কথা হইল, মঙ্গল লইয়া এত আগ্রহ কেন মানুষের? বিশেষ করিয়া উন্নত রাষ্ট্রসমূহের? নাসার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ইনসাইট’ কোনো ‘রোভার’ বা ‘অরবিটার’ নহে। অর্থাত্ ইহা মঙ্গলজুড়িয়া ঘুরিবে না কিংবা মঙ্গলের কক্ষপথে বসিয়া নজরদারি করিবে না। ‘ইনসাইট’ একটি ‘জিওফিজিক্যাল স্টেশন’। সেই হিসাবে মঙ্গলযান রোভার কিউরিওসিটি’র মতো মঙ্গলের মাটিতে টহল দিবে না ইনসাইট। বরং এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়াইয়া মঙ্গলের অন্দরের রহস্যভেদ করিবার চেষ্টা চালাইবে। নাসা জানাইতেছে যে, আগামী দুই বত্সর ধরিয়া মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, তাহার অন্দরমহলের কার্যকলাপ, মঙ্গলকম্পন (মার্সকোয়েক), টেকটোনিক প্লেটের সংঘাত—বিবিধ বিষয়াদি পরিমাপ করিবে ইনসাইট। ইহার মাধ্যমে বুঝিবার চেষ্টা করিবে কীভাবে একদা জলের অস্তিত্ব থাকা মঙ্গল এমন শুষ্ক পাথুরে লালগ্রহে পরিণত হইল। ইহা হইতে শুধু মঙ্গল নহে, পৃথিবীরও জন্মরহস্য অনেকটাই নাকি বোঝা যাইতে পারে! কারণ পৃথিবীর আদি অবস্থার সহিত মঙ্গলের আদিপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মিল রহিয়াছে।
আফ্রিকা হইতে সারা পৃথিবীতে মানুষের ছড়াইয়া পড়িবার কারণও নূতন ও অজানার প্রতি তীব্র আকর্ষণ। মানুষ অদম্য কৌতূহলে তরী ভাসাইয়াছে মহাসমুদ্রে, আবিষ্কার করিয়াছে নূতন নূতন ভূখণ্ড, স্থাপন করিয়াছে নূতন উপনিবেশ। বিভিন্ন সময় কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, আমেরিগোসহ অসংখ্য অভিযাত্রী অংশ লইয়াছে এই দুঃসাহসিক অভিযানে। মানুষের এই অদম্য মানসিকতাই তাহাকে আকাশে উড়াইতে পারিয়াছে, সশরীরে লইয়া গিয়াছে রূপকথার চাঁদের দেশে। সেই অদম্য দুঃসাহসেরই অংশ এই মঙ্গল অভিযান। এই অভিযান সফল হইলে তাহা হইবে মানবজাতির প্রথম বহির্গ্রহের উপনিবেশ। সৌরজগতের ভিতরকার কোনো একটি গ্রহে পা রাখিবার এই অভিযান সফল হইলে মানুষ অদূর ভবিষ্যতে পা বাড়াইবে সৌরজগতের বাহিরের কোনো সবুজ গ্রহে, যাহা এখনো অনাবিষ্কৃত। তবে উপনিবেশ সৃষ্টির যেই উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য অতীতে ছিল, মঙ্গলে বড় বড় রাষ্ট্রের বিবিধ অভিযানের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য তাহার বাহিরে নহে।