ক্রিকেটে কষ্ট, ক্রিকেটেই আনন্দ, ক্রিকেট আমার ভালবাসা

আমি নিজে কখনোই ক্রিকেট খেলিনি, তবে ক্রিকেট খেলা দেখার একজন অকৃতিম দর্শক হিসাবে মনটাকে এখনো তাজা রেখেছি। বিশেষ করে খেলাটি যখন বাংলাদেশ বনাম অন্য যে কোনো দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই! সেই খেলা দেখা আমার চাই-ই চাই। টেলিভিশনের চ্যানেল বা কম্পিউটারে ক্রিকেট ওয়েবসাইটগুলো ওপেন রেখে নিঝুম রাতে তাই খেলা দেখাটা একটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সময় দিনে খেলা শুরু হলে আমেরিকাতে হয় তখন রাত। ডে-নাইট ম্যাচ হলে রাত আরো গভীর হয় এখানে। যেমন এশিয়া কাপের কথাই ধরুন। বাংলাদেশে খেলা শুরু হয় বিকাল ঠিক দু’টায়, আমেরিকার ইস্টকোস্টের স্টেটগুলোতে রাত হয় তখন গভীর অর্থাত্ রাত তিনটা। কিন্তু তাতে কি? বড় আশা নিয়ে খেলা দেখি। আশাতেই যে প্রকৃত সুখ ও শান্তি নিহিত রয়েছে, গুরুজনে বলেছেন। শুধু এশিয়া কাপই নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব খেলাই তীব্র আশা বুকে ধারণ করে উপভোগ করি। যে কোনো টুর্নামেন্টে টাইগাররা ম্যাচ জিতবে জিতবে করে যদি একটি ম্যাচ জিতেই যায়, তাহলে আমার উত্তেজনা আর দেখে কে! আমার মন তখন কমপক্ষে সামনের একটি বছরের জন্য কয়েকগুণ বেশি তরতাজা হয়ে যায়। সেই তাজা মন নিয়ে আবার অনেকগুলো ম্যাচ দেখে ফেলি, সেগুলোতে টাইগাররা জেতার কাছাকাছি গিয়ে আবার হেরেও যায়, আবার হঠাত্ করে দু’-একটিতে জয়ও পায় তারা, তখন মনটা আমার আবার তরতাজা হয়ে উঠে, আনন্দে উদ্বেলিত হয়। এভাবেই দীর্ঘদিন যাবত্ বাংলাদেশের ক্রিকেট আমার মনে ও প্রাণে আবিষ্ট হয়েছে। আমি জানি যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি এরূপ অকৃতিম ভালবাসা শুধু আমার একার নয়, আরো হাজার হাজার বা কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমি ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে জগত্ জুড়ে। থাক সে সব কথা। এশিয়া কাপ টুর্নামেন্টের বিষয়ে ফিরে আসি। এবারের এশিয়া কাপ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আমার মতো অনেক ক্রিকেটভক্তের মনে বড় বড় আশার কুঁড়ি জন্ম নিয়েছিল। বিশেষ করে টাইগাররা এবার হয়তো এশিয়া কাপটি ঘরে নিয়েই ছাড়বে। সেই আশা করাটা কি অমূলক ছিল? এশিয়া কাপ শুরুর পূর্বে মাত্র কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সদ্যসমাপ্ত দুটি টি-২০ ম্যাচের কথাই ধরুন। দুটি ম্যাচেই শেষ বলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। তীরে গিয়ে তরী ডুবে গিয়েছিল। দুটি ম্যাচেই বাংলাদেশ হেরেছিল। শ্রীলঙ্কা জিতেছিল। যারা সেই খেলা দুটি দেখেছেন, তারা হয়তো শেষ বলের সেই উত্তেজনার কথা বহুদিন যাবত্ মনে রাখতে পারবেন। তাছাড়া গত এশিয়া কাপের সুখস্মৃতির কথাই ধরুন। সেই টুর্নামেন্টটিও আমাদের অনেকের মনেই দাগ কেটে আছে। গত এশিয়া কাপে শুধু পাকিস্তানকে ছাড়া সবাইকে হারাতে পেড়েছিল টাইগাররা। ভারত, শ্রীলঙ্কাকে একেবারে কুপোকাত করে ফেলেছিল টাইগাররা। তামিম লাগাতারভাবে চার ম্যাচে চারটি হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেছিল। তারপর তার ব্যাটটি উঁচিয়ে আঙ্গুলগুলো এক, দুই, তিন, চার করে গুনিয়ে গুনিয়ে জানান দিয়েছিল সে বিশ্ববাসীকে যে, সে কি না পাড়ে। আহ! কি যে সেই সুখস্মৃতি! ফাইনালে এসে পাকিস্তানের কাছে মাত্র দুই রানের সেই হারটুকু ছাড়া সবই অর্জন করেছিল টাইগাররা গত এশিয়া কাপে। তাই খেলাশেষে মাঠে টিভির ক্যামেরায় ভেসে উঠা সাকিব, তামিম ও মুশফিকদের চোখের কোণে জমে থাকা ছলছল জল ও কান্নার দৃশ্য সেদিন টিভিতে যারা খেলা দেখেছেন, তা ভুলবার নয়। আমার মতো অন্ধ ক্রিকেটভক্তের আবেগ তাই সেদিন সংবরিত হয়নি, নয়ন দুটি জলে সিক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের কোটি কোটি ক্রিকেটভক্ত তাদের অশ্রু সেদিন আটকাতে পারেননি। কিন্তু এবারের এশিয়া কাপ টুর্নামেন্টে আমার মতো ক্রিকেটপ্রেমি মানুষের আশায় বড় একটা ধাক্কা লাগলো। গুঁড়েবালিও বলা যেতে পারে বিভিন্ন কারণে। যেমন, দলে তামিম নেই ঘাড়ে চোটের কারণে, দেশসেরা পেসার মাশরাফিও দলে যাওয়া-আসার মধ্যেই রয়েছে, আমাদের আরেক দেশ ও বিশ্বসেরা রত্ন সাকিবের কথা আর কি বলবো! সেও এক অনভিপ্রেত অঙ্গভঙ্গির কারণে (খুব কষ্ট পেয়েছি তার সেই আচরণে, তবে তাকে ভীষণ ভালবাসি) তিন ম্যাচের জন্য সাসপেন্ড। তার মতো বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের ব্যাটিং এবং বোলিং দুই ডিপার্টমেন্টেই যে কতো বড় একটা ধাক্কা তা কি আমরা পরপর দু’ম্যাচে ভারত এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে হেরে গিয়ে টের পেলাম না? ইনফর্ম ব্যাটসম্যান ও উইকেটকিপার মুশফিক টুর্নামেন্ট চলাকালেও কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত, পুরোপুরি ফিট না, উইকেট কিপিং করতে পারছেন না। রিয়াদ, নাসির, শুভ, নাইমরাও সেভাবে এবার নিজেদেরকে মেলে ধরতে পারছেন না। তদুপরি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টি-২০ ম্যাচে মাশরাফিকে ক্যাপ্টেনসি করা নিয়েও ছোট-খাটো একটা বিতর্ক হয়ে গেল। তারও বেশ আগে আমার আরেক প্রিয় খেলোয়াড়- বাংলাদেশের আরেক ক্রিকেট নক্ষত্র- অনেক বিজয়ের নায়ক- আশরাফুলের বিচ্যুতি তো রয়েছেই। সবকিছু মিলে দলটি কেন জানি এলোমেলো দেখাচ্ছে এবার এশিয়া কাপে। তদুপরি বাংলাদেশের বর্তমান দলের ছেলেদের বয়স ৩০-এর নিচে। এদের পাশে ৩০ ঊর্ধ্ব কোনো অভিজ্ঞ ভাল প্লেয়ারই নেই। একটি মজবুত দলে জুনিয়র এবং সিনিয়র প্লেয়ারের কম্বিনেশন থাকাটা খুবই জরুরি বলে আমার মতো মূর্খ মানবের ধারণা। যেমন আছে শ্রীলঙ্কা দলে একঝাঁক তরুণের সঙ্গে বিভিন্ন ভার্সনের ক্রিকেটে ৩০ ঊর্ধ্ব ইনফর্ম প্লেয়ার দিলশান, সাঙ্গাকারা, জয়াবর্ধনে, হিরাথ ও মালিঙ্গা। আবার পাকিস্তান দলের দিকে তাকালেও আমরা বিভিন্ন ভার্সনের ক্রিকেটে ৩০ ঊর্ধ্ব প্লেয়ারকে দেখতে পাই। যেমন শহীদ আফ্রিদি, মোঃ হাফিজ, ইউনুস খান। বিশ্বের অন্য ক্রিকেট দলের দিকে তাকালেও এই একই চিত্র আমরা দেখতে পাব অর্থাত্ জুনিয়র-সিনিয়রদের কম্বিনেশনে একটি শক্তিশালী লড়াকু দলকেই দেখা যাবে। যা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে বহুদিন যাবত্-ই অনুপস্থিত। আমি মনে করি একজন ভাল খেলোয়াড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচিউরিটির যথেষ্ট দরকার আছে। আর প্রবাহমান সময়ই কেবল মানুষকে ম্যাচিউরড করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাই জুনিয়র-সিনিয়রদের কম্বিনেশন মিলে একটি শক্তিশালী জাতীয় দল গঠনে সহায়ক বৈ কি! আমাদের ক্রিকেট ২০ বছর আগের অবস্থানে আর নেই। এখন আমাদের ক্রিকেটাররা দেশের এক একটি রত্ন, এক একটি আইকন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্টের মাঝে মনের ভিতরে উদ্বেলিত আনন্দ ও ভালবাসা সৃষ্টির সঞ্চালক তারা। তাই তাদের একটু বিচ্যুতি আমাদের মনকে বড় পীড়া দেয়। আমাদের ক্রিকেট টাইগাররা লড়াই করে জেতার ধারায় ফিরে আসুক- সেই কামনা সর্বদা করি। তারপর সেইদিন হয়তো আর বেশিদূর নয় যেদিন টাইগাররা বিশ্বকাপের ট্রফি জয় করে বাংলাদেশকে এক অনাবিল আনন্দের সাগরে ভাসিয়ে দিবে, আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন আরো বাড়িয়ে দিবে। লেখক: ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত। alamrowshon¦gmail.com