বিমসটেক আরও কার্যকর ও গতিশীল হউক

নেপালকে বিমসটেকের নতুন চেয়ারম্যান নিযুক্ত করিয়া এবং জোটভুক্ত দেশসমূহের শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা ও সমৃদ্ধি কামনার মাধ্যমে গতকাল মিয়ানমারের রাজধানী নেপাইতোতে সমাপ্ত হইল দুইদিন ব্যাপী তৃতীয় বিমসটেক শীর্ষসম্মেলন। সম্মেলনে শ্রীলঙ্কার সুমিথ নাকানডালাকে এই সংস্থার প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে নিয়োগদানকে স্বাগত এবং ইহার স্থায়ী সচিবালয় ঢাকায় স্থাপনের প্রস্তাবের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানানো হয়। সম্মেলনের শেষ দিনে সদস্য দেশগুলির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তিগুলি হইল- ঢাকায় বিমসটেকের স্থায়ী সচিবালয় নির্মাণ, ভারতে সেন্টার ফর ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট স্থাপন এবং ভুটানে কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ কমিশন ও বিমসটেক কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ অবজারভেটরি গঠন। সম্মেলনে বিমসটেক জোটভুক্ত দেশ ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সহিত সংযুক্ত করিয়াছে। বিকাশমান অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে এতদঞ্চলের গুরুত্ব আজ যে কোন সময়ের চাইতে বৃদ্ধি পাইয়াছে। এই জোটভুক্ত দেশগুলির মোট জনসংখ্যা এক দশমিক তিন বিলিয়ন যাহা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ। একইসঙ্গে সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ দুই দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার। এই জোটের অগ্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালের ৬ জুন ব্যাংককে। তখন ইহার নাম ছিল বিসটেক (BISTEC) বা বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা অ্যান্ড থাইল্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন। একই বত্সর ২২ ডিসেম্বর জোটে মিয়ানমারের অন্তর্ভুক্তির কারণে ইহার নামকরণ করা হয় বিমসটেক(BIMSTEC)। তবে ২০০৪ সালে নেপাল ও ভুটানের যোগদানের পর ইহার নাম আরেক দফা পরিবর্তন করিয়া রাখা হয় বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন বা বিমসটেক (BIMSTEC)। এই জোটের অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলি হইল- ব্যবসা ও বিনিয়োগ, পরিবহন ও যোগাযোগ, জ্বালানি, মত্স্য, পর্যটন, প্রযুক্তি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ ইত্যাদি। বিমসটেক শীর্ষসম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতদঞ্চলের সকল মানুষের মর্যাদা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ যেহেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সন্নিহিত স্থানে অবস্থিত, তাই ঢাকায় বিমসটেকের স্থায়ী সচিবালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দিল্লী সফর করেন, তখন তিনি নয়াদিল্লীকে এমন একটি প্রস্তাবে সমর্থন দেওয়ার অনুরোধ করেন। ঢাকায় বিমসটেকের এই সচিবালয় নির্মাণে নয়াদিল্লী ৩২ ভাগ খরচ বহন করিবে বলিয়া জানা গিয়াছে। সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের দ্বিপাক্ষিক এক বৈঠকে ভারতের সহিত বাংলাদেশের তিস্তা ও স্থল সীমান্ত চুক্তিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলাপ-আলোচনা হয়। আলোচনা হয় ত্রিপুরা হইতে অতিরিক্ত একশত মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানির ব্যাপারেও। সম্মেলনে ভারত বিমসটেক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অবৈধ মাদক পাচার রোধে সহযোগিতামূলক নীতি সংশোধনের পক্ষেও বক্তব্য পেশ করে। যাহা হউক, ড. মনমোহন সিং সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে বলেন যে, বিমসটেক এশিয়া ও সারাবিশ্বে শান্তি, ঐক্য, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিতে পারে। আমরা এ ব্যাপারে একমত। তবে বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ও একটি যুগসন্ধিকালে বিমসটেক নেতাদের শক্তিশালী সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব একান্ত প্রয়োজন। এজন্য বিমসটেককে আরও গতিশীল করিবার কোন বিকল্প নাই। ইহার অংশ হিসাবে বিভিন্ন বিষয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ধারাবাহিকতা বজায় রাখিতে হইবে। বাংলাদেশে ইহার স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হইলে এই জোটে আমাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব বাড়িয়া যাইবে নিঃসন্দেহে। আমরা মনে করি, বিমসটেকভুক্ত দেশগুলির উন্নয়নে কানেকটিভিটিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়। ইতোমধ্যে ভারতের সহিত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বহুমাত্রিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাইয়াছে। তাহার সুফলও তাহারা পাইতেছেন। মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের স্বপ্ন বাংলাদেশের নূতন নহে। স্বাধীনতার পরই এই স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত হয়। এখন তাহা বাস্তবে রূপ নিতেছে ও এই জোট আরও কার্যকর হইতেছে যাহাতে আমরা খুবই আশাবাদী।