স্মরণ

শান্তি আন্দোলনের নেতা আলী আকসাদ

আজ আমার বাবা ও শান্তি আন্দোলনের নেতা আলী আকসাদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। বাবার কথা লিখতে গিয়ে আজ দুচোখ জলে ভরে ওঠে। মৃত্যুর মত অমোঘ সত্যি তাকে টেনে নিয়েছে পরকালে। মৃত্যু অমোঘ সত্য তবুও এ বিচ্ছেদ যেন সহ্য হয় না। আলী আকসাদ, দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য সঙ্গীত সব অঙ্গনেই ছিলো তার ব্যাপক পদচারণা। তাই তার মৃত্যুতে তার সুহূদ ও অনুসারীরা হারায় এক প্রিয় আকসাদ ভাইকে। আমার দাদার আদি বাড়ি গদি গ্রাম, বাগনান পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায়। ১৯৪৭-এ রীতিমত রিফিউজি হয়ে আমার দাদা শেখ আলী আমজাদের হাত ধরে আমার বাবা ও কাকারা পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। দাদা আলী আমজাদ ছিলেন মনীষী কুদরত-ই এ খুদার বাল্যবন্ধু। আমার দাদা মতিঝিল বয়েজ হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। আমার বাবা আলী আকসাদের জীবন ছিলো অবিশ্বাস্য বর্ণময়। জীবনের আট বছর তার জেলেই কাটে। কিশোর বয়স থেকে বহু রাজনৈতিক নেতার সান্নিধ্য তাকে রাজনীতিতে পরিপক্ব করে তোলে। তার জন্ম ১লা মে ১৯৩২ এ গদি গ্রামে। গাঁয়ের পাঠশালাতে হাতেখড়ি। এরপর ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় সরাসরি কলকাতার আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি। এখানেই সান্নিধ্যে আসেন তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণায় ভারত ছড়ো আন্দোলন তাকে অনুপ্রাণিত করে। মুকুল ফৌজের সদস্য হন ১৯৪৫-এ। ১৯৪৬ সালে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু ও অন্যরা দিল্লী বেড ফোর্ডে বন্দী হন। এছাড়া হিটলার মুসোলিনি তোজো গ্রুপের ফ্যাসিবাদ আর যুদ্ধবাদী রাজনীতি প্রবল বিপক্ষে ছিলেন তিনি। এইবাদ ফ্যাসিবাদ আর মন্দা গণরোষে রূপ নেয়। ১৯৪৮-১৯৪৯ সালে বাবা ছিলেন চৌকস, ছাত্র। হয়ে যান বিতর্ক দলের সেক্রেটারী আর যুক্ত ছিলেন নাটক দল আর স্কুল ম্যাগাজিনের সাথে। মুকুল ফৌজ দেখা করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর-সঙ্গে ১৯৪৬-এ। যোধপুরে মহাত্মা গান্ধীর জনসভা তাকে উজ্জীবিত করে তোলে সোসালিজম শান্তি আর গণতান্ত্রিক চেতনায়। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে ও বাবা প্রথম সারিতে ছিলেন। বেঁচে যান পুলিশের গুলির হাত থেকে। ১৯৪৮ থেকে যুক্ত হন বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের সাথে। এই শান্তি আন্দোলনই তাকে খ্যাতি এনে দেয়। নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী জুলিও কুরী, বিজ্ঞানী, মারী কুরী অন্যান্যরা শান্তি আন্দোলনের সূচনা করেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তথা পরমাণু অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে এই আন্দোলন তখন সোচ্চার ছিল। যেই অস্ত্র মানবজাতিকে ধ্বংস করে অবলীলাক্রমে তার বিরুদ্ধেই এই শান্তিকামী মানুষগুলো ছিলো সোচ্চার। ১২ই অক্টোবর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরী মেডেল দেয় বিশ্ব শান্তি পরিষদ। আলী আকসাদ তার শান্তি আন্দোলনের প্রধান কার্যালয় বিশ্ব শান্তি পরিষদকে এই পদক দিতে অনুরোধ করেন। প্রিয় নেতাকে নিজ সংগঠনের মাধ্যমে সম্মান জানিয়ে তাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। এই সম্মান, নতুন জন্ম নেয়া বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেন। শান্তি আন্দোলনে আলী আকসাদের ভূমিকা ছিলো অগ্রগণ্য। কমিউনিজমের দীক্ষা তাকে আরো রাজনীতিতে সফল করে তোলে। তার মৃত্যুতে আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রিয় বাবাকে। তার মৃত্যু আমাদেরকে নিঃস্ব করে দিয়েছে তবে তার আদর্শ আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। আজ তার মৃত্যু দিনে তার প্রতি রইল আমার অসীম শ্রদ্ধা। লেখক :সাংবাদিক, আলী আকসাদের কন্যা ও এক্সিকিউটিভ কমিটি সদস্য বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ। jshanta@gmail.com