গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন :বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

দীর্ঘমেয়াদি গণতন্ত্রের চর্চা স্থিতিশীল উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখে। জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র ছাড়া বিকল্প নেই। দারিদ্র্যতা ও রাজনৈতিক ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের চর্চা ভারতকে উন্নয়নের যাত্রা থেকে পিছিয়ে দেয়নি। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিয়ে এই বিতর্কটি করা হয়তো প্রয়োজন হতো না, যদি ৫ জানুয়ারী ২০১৪-এর নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন হওয়ার যৌক্তিকতাকে প্রমাণ করতে গিয়ে কেউ যদি এই প্রসংগটি আবার না টানতেন। তাদের যুক্তি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের হরতাল, সহিংসতা বিশেষ করে জামায়াতের সহিংতা, যুদ্ধোপরাধের বিচারের বিরোধিতা এ সব কিছুই এ দেশে গণতন্ত্রের চাহিদাকে ভুল প্রমাণিত করে। কেননা তাদের নৈরাজ্য- সহিংসতার ফলে দেশের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই যুদ্ধোপরাধের বিচার এবং দেশের উন্নয়নকে অব্যাহত রাখার জন্য আওয়ামী লীগকে যে কোন উপায়ে আরও এক টার্ম ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচিত সরকার কর্তৃত্ববাদী হলে দোষের কিছু নেই। কর্তৃত্ববাদী জনস্বার্থমুখী সরকার গণতন্ত্রের চেয়েও ভাল হতে পারে। এ প্রসংগে তারা উদাহরণ হিসেবে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিংগাপুর-এর কথা উল্লেখ করেন। বির্তকের অবকাশ নেই যে , এই দেশগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসনের মাধ্যমে উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এ সকল দেশগুলো একটি বিশেষ ঐতিহাসিক সময়ে তাদের যাত্রা শুরু করে। দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের উন্নয়নে আমেরিকার সাহায্য ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। সর্বোপরি, কনফুসিয়ান সংস্কৃতির প্রভাবের ফলে জনগণের মধ্যে নেতার নির্দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্যবোধ পূর্ব এশিয়ার একটি রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যকে Lee Kean Yew-এর Asian Values হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যা তার ভাষায় পাশ্চাত্য থেকে আলাদা এবং উন্নয়নের পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কর্তৃত্ববাদী পূর্ব এশিয়ার উন্নয়ন সম্পর্কে অমর্ত্য সেন বলেন, কর্তৃত্ববাদের অধীনে দক্ষিণ কোরিয়া, সিংগাপুর এবং সংস্কার পরবর্তী চীনে উন্নয়ন হলেও এ ধরনের সীমিত প্রমাণ দ্বারা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে, কর্তৃত্ববাদের অধীনেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়। বরঞ্চ আফ্রিকার বতসোয়ানায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়ও উন্নয়ন হয়েছে। এ পর্যায়ে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সাথে আন্তঃসম্পর্কের চলমান তাত্ত্বিক বিতর্ক আমাদেরকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে কি কি কারণ এবং উপাদান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এ সম্পর্কে রাষ্টবিজ্ঞানে কিছু তাত্ত্বিক বক্তব্য রয়েছে। আধুনিকীকরণ তাত্ত্বিকদের ভাষায়, গণতন্ত্র হচ্ছে পুঁজিবাদের সৃষ্টি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিপসেটের মতে, পুঁজিবাদ গণতন্ত্রের প্রাণ। পুঁজিবাদের ফলে সম্পদ সৃষ্টি হয় যা জনগণের মধ্যে উচ্চমাত্রায় ভোগবাদী প্রবণতা সৃষ্টি করে। এর ফলে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্মলাভ করে যাদের মধ্যে গণতন্ত্রের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে এবং সংকীর্ণ মানসিকতার অবসান ঘটায়। বর্তমান আধুনিকীকরণ তাত্ত্বিকগণ অবশ্য গণতন্ত্রায়নের পেছনে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সুশীল সমাজের ভূমিকার উপর গুরুত্ব দেন। ঐতিহাসিক সমাজতাত্ত্বিক মতানুসারে রাষ্ট্র এবং এর অভ্যন্তরস্থ শ্রেণীসমূহের পরিবর্তিত সম্পর্কই রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্র নির্ধারণ করে। গণতন্ত্রের উত্পত্তিও একই ধারায় হয়েছে। মূলত এটি গণতন্ত্রায়নের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা। ১৯৬৬ সালে বেরিংটন মুরের রাজনৈতিক পরিবর্তন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সমাজতাত্ত্বিক স্টাডি গণতন্ত্রায়নের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি আট বৃহত্ দেশ (বৃটেন, ইতালি, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান, চীন এবং ভারত)-এর উপর তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন এই দেশগুলোতে কেন গণতন্ত্র, ফ্যাসিজম এবং কমিউনিজমত্-এর উত্থান হয়। এক্ষেত্রে তিনি তিনটি শ্রেণীর পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপর গণতন্ত্রের উত্তরণ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি শ্রেণী হচ্ছে কৃষক্, ভূ-স্বামী এবং বুর্জোয়া শ্রেণী (শহুরে বসবাসকারী শ্রেণী)। আর গণতন্ত্রের উত্তরণ ঘটে তখনই যখন কৃষি অর্থনীতির ধারাবাহিক উচ্ছেদের মাধ্যমে কৃষিজীবী শ্রেণী শহুরে শ্রমজীবী শ্রেণীতে পরিণত হয়। শিল্পক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিবর্তন সাধিত হয়। উদীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে ভূ-স্বামী শ্রেণীর মধ্যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে দ্বন্দ্ব্বের সৃষ্টি হয় এবং এই দ্বন্দ্ব্বে ভূ-স্বামী শ্রেণী পরাজিত হয়। এই ধারায় গণতন্ত্র এসেছে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তাই মুরের মতে, শ্রেণী দ্বন্দ্ব গণতন্ত্রের সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে অবশ্য এই তত্ত্বের বিকাশ ধারায় গণতন্ত্রায়নে শ্রেণীদ্বন্দ্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং বহুজাতিক ক্ষমতা কাঠামোর প্রভাবের বিষয়কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাষ্ট্রের ভূমিকার কারণে খোদ বৃটেনে পুঁজিবাদের বিকাশ শ্রেণীসংঘাত দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়নি। সংসদীয় গণতন্ত্রও দেশটিতে স্থায়ীত্ব লাভ করে। ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্বের আলোকে গণতন্ত্রায়নে সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফল হিসেবে গণতন্ত্রের উত্থান হয়। বাংলাদেশে ঠিক এভাবে গণতন্ত্র না আসলেও শ্রেণীসংঘাত যে পুঁজিবাদের রক্ষক রাষ্ট্রকে আংশিকভাবে হলেও বাধ্য করেছে শ্রমিক- মালিক সম্পর্কের গণতন্ত্রায়নে। গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রাসংগিক। গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ বাংলাদেশের কৃষিজীবীদেরকে কৃষি থেকে উল্লেখযোগ্যহারে বিচ্ছিন্ন করেছে। যা হোক, ঐতিহাসিক সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা হচ্ছে, এটি ধরে নেয় গণতন্ত্র হচ্ছে উন্নয়নের অটোমেটিক ফল। এ ক্ষেত্রে তারা নেতৃত্বের ভূমিকার উপর গুরুত্ব দেয় না। ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্বের আর একটি ত্রুটি হচ্ছে, একটি বিশেষ ঐতিহাসিক সময়ে কয়েকটি দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশটিকে আদর্শ হিসেবে ধরে নেয়। এই দেশগুলো হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং বৃটেন। কিন্তু যে সকল দেশ এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন বা ফ্রান্সের উন্নয়ন স্তরে পৌঁছেনি, সে দেশগুলো কী উন্নয়নের ঐ স্তরে পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষা করবে? কত কাল ধরে অপেক্ষা করবে? এই জিজ্ঞাসার প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের উত্তরণবাদী ধারণার উদ্ভব হয়। আশির দশকে শেষ দিক থেকে এই তত্ত্ব বিকশিত হতে থাকে। এই তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে- দীর্ঘ সময় ধরে বসে না থেকে গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এলিটদের সচেতন প্রচেষ্টার দ্বারা গণতন্ত্রকে তৈরি করা সম্ভব। অর্থাত্ কাঠামোগত পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীনভাবে এলিটদের ইচ্ছা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গণতন্ত্র নির্মাণ করা যায়। আলোচনা, চুক্তির মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করে। এই মতানুসারে গণতন্ত্র নির্মাণ হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। ১৯৯০ সালের ৩-জোটের রূপরেখা এবং সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বাংলাদেশে গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটলেও এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে এলিটদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিসম্পন্ন হওয়া দরকার। উত্তরণ তত্ত্বের একটি প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে এটি গণতন্ত্রায়নে নিম্নবর্গের মানুষের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেয় না। ভারতে উত্তর প্রদেশ কেন্দ্রিক আঞ্চলিক দলগুলো সে দেশের গণতন্ত্রায়নে নিম্নবর্গের মানুষের ভূমিকাকে তুলে ধরে। এই তত্ত্বের আরও দুর্বলতা হচ্ছে এটি সংস্কৃতি, উন্নয়ন, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবকে গণতন্ত্রায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয় না। উপরের আলোচনা থেকে দু’টি বিষয় পরিষ্কার। প্রথমত: উন্নয়নের ফল হচ্ছে গণতন্ত্র অর্থাত্ প্রথমে উন্নয়ন হবে, তারপর গণতন্ত্র আসবে। দ্বিতীয়ত: গণতন্ত্রের উত্থান উন্নয়নের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। গণতন্ত্রকে স্বাধীনভাবে তৈরি করা যায়। অনুন্নয়ন একটি দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করে না। এই বক্তব্যের আলোকে এখন আমরা বিচার করবো বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সম্পর্কে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের (অর্থাত্ ওয়েস্টমিস্টার গণতন্ত্র) ধারাবাহিক বিকাশ শুরু হয় ঔপনিবেশিক শাসনামলেই। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মধ্য দিয়ে এর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ পূর্ণাঙ্গ পরিণতি লাভ করে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসনের আলোকেই ভারত তার সংবিধানে সংসদীয় গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করে। এই আইনের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রথম দিকে ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নের পূর্ব পর্যন্ত শাসিত হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় সংসদীয় গণতন্ত্র ছিলো। ১৯৬৬ সালের ৬-দফা, ১৯৬৮ সালের ছাত্রদের ১১-দফা এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি প্রধানতম দিক ছিলো সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসনামলে বৈষম্য/শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে গণতন্ত্রের জন্যই লড়াই করেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ সীমিত হওয়া সত্ত্বেও সে সময় ঐ মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে নেতৃত্ব পূর্ববাংলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের লক্ষ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাই ঐতিহাসিকভাবে গণতন্ত্র পূর্ববাংলার মানুষের ঐতিহ্যেরই অংশ। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সংসদীয় গণতন্ত্রকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করলেও এর বিকাশ পরবর্তীকালে ব্যাহত হয়। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে। অত:পর দীর্ঘ সময় (১৯৭৫-১৯৯০) বাংলাদেশে সিভিল মিলিটারী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে অর্থনীতিতে বাজারমুখী সংস্কারের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের চেয়ে বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও রাজনৈতিক উন্নয়নে দেশ পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারা প্রবর্তন সামরিক শাসকের ইচ্ছার ক্রীড়নকে পরিণত হয়। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে সামরিক শাসক এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হয়। ১৯৯১ সালে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং এই সংসদেই সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী গৃহীত হয়। ১৯৯১ থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনামলের সাথে পূর্ববর্তী শাসনামলের মধ্যে CPD কর্তৃক একটি তুলনামূলক গবেষণায় দেখা যায় ১৯৯১ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন পূর্বের তুলনায় বেশি হয়েছে। যদিও এই গবেষণার উন্নয়নে গণতান্ত্রিক সরকারের ভূমিকার চেয়ে বেসরকারি খাতের ভূমিকার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে গণতন্ত্র স্থিতিশীল হলে উন্নয়ন যে স্থিতিশীল হবে এ বিষয়ে গবেষণাটি আমাদেরকে নিশ্চিত করে। সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি তা সর্বজনস্বীকৃত। এই উন্নয়নকে আরও এগিয়ে নিতে হলে, স্থিতিশীল করতে হলে, গণতন্ত্র ছাড়া বিকল্প নেই। বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের উপর গড়ে উঠেছে। এই আবহে যারা Benevolent dictatorship এর কথা বলছেন তারা আসলে অবাস্তব স্বপ্নই দেখছেন। অমর্ত্য সেন যথার্থ বলেছেন উন্নয়ন হচ্ছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা না থাকলে ব্যক্তির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা কি করে এটা আশা করি যে, হিন্দু সমপ্রদায়ের জমি জোর করে দখল করার সামপ্রতিক প্রবণতা আবারও গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে ব্যক্তি যদি তার পুঁজিকে স্বাধীনভাবে কাজে লাগাতে না পারে কিভাবে সে তার ভাগ্যের উন্নয়ন করবে? অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবিধা যদি সমাজের বৈষম্য সৃষ্টি করে তাহলে তা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বাধ্য। ১৯৯৮ সালে জেনারেল সুহার্তো শাসনের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত ফুঁসে ওঠে। কারণ দেশের অধিকাংশ সম্পদ মাত্র ৫ শতাংশের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। ৯৮ পরবর্তী ইন্দোনেশিয়ার গণতান্ত্রিক সরকার সম্পদের বন্টনের বিষটিকে গুরুত্ব দেয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের চাইতে কয়েকগুণ বড় ইন্দোনেশিয়া। জনসংখ্যায়ও বাংলাদেশের চেয়ে অধিক। এমনকি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পরে অর্থাত্ ১৯৯৮ সাল থেকে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেও দেশটিতে গণতন্ত্র বাংলাদেশের চেয়ে স্থিতিশীল। বাংলাদেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন, গণমাধ্যমের ভূমিকা ও তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনাকে আগের যেকোন সময়ের চাইতে বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় জীবনে গণতন্ত্রায়নে আমরা বার বারই পিছিয়ে যাচ্ছি। রাষ্ট্রীয় জীবনে আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের বিশ্লেষণে সামরিক শাসনামলে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই চর্চা করছেন। যা তাদের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার ধারাকেই অব্যাহত রেখেছে। তাই গণতন্ত্রের বিকাশ না হলে সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন কখনই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করতে পারে না। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়