চির অমলিন ৭ই মার্চ

আজ অবিস্মরণীয় ৭ই মার্চ। আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে এই দিনটির গুরুত্ব সমধিক আর ইহার আবেদন আবাহন নিয়ত। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনায় ৭ই মার্চ বার বার ফিরিয়া আসে শুধু উহার ঐতিহাসিক দাবি লইয়াই নহে, আসে বারংবার জাতিকে সেই মহেন্দ্রক্ষণটি স্মরণ করাইয়া দিতে, যে ক্ষণে এই দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর এক অনন্য ও অনবদ্য বক্তৃতায় এমন উদ্দীপ্ত উজ্জীবিত হইয়াছিল— যাহা আজ ভাবিতেও আশ্চর্য হইতে হয়; শরীরে শিহরণ জাগে! এতদঞ্চলের মানুষের উপর সুদীর্ঘ তেইশ বত্সর ধরিয়া পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী যে নির্মম শোষণ-বঞ্চনা চালাইয়া আসিয়াছিল উহার অবসান ঘটানোর ব্যাপারে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত সেই ঐতিহাসিক ভাষণ বিস্ময়কর এক গৌরচন্দ্রিকার ভূমিকা পালন করে। সেদিনকার ঐ ভাষণের গুরুত্ব শুধু উহার অনন্য শব্দচয়ন, অনুপম বাকশৈলী, ঋজু উপস্থাপনা আর লাগসই শব্দসম্ভারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ইহা ছিল অধিকার-বঞ্চিত, হতভাগ্য ও মুক্তিকামী একটি জাতির জন্য অনন্য দিক-নির্দেশনা বিশেষ। এই ভাষণ সেদিনের প্রেক্ষাপটে এমনই অনন্যসাধারণ যে উহাকে অনায়াসেই আব্রাহাম লিংকনের সেই ‘গেটিসবার্গ ভাষণ’ বা মার্টিন লুথার কিং-এর ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণের সহিত তুলনা করা যায়। লিংকন কিংবা লুথার কিং-এর ভাষণও সেইদিন ছিল জাতিকে পথ-নির্দেশনা প্রদানের এক ঐতিহাসিক দলিল-স্বরূপ। উহার মধ্যে ছিল পথের দিশা আরও ছিল দার্শনিক অভিব্যক্তি। তবে এই কথাও অস্বীকার করা যাইবে না যে, ১৯৭১ এর মার্চে বাংলাদেশের মানুষ সার্বিক মুক্তির আশায় যেইভাবে অগ্নিগর্ভ হইয়া উঠিয়াছিল এবং ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলিয়া উঠিয়াছিল উহারই মূল প্রেরণাদায়ী মন্ত্ররূপে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের অগ্নিক্ষরা রূপটি সারা বাংলাদেশে দাবানলের মতো ছড়াইয়া পড়ায় ইহা লিংকন বা লুথার কিং-এর ভাষণের ব্যাপ্তি ও গভীরতাকেও ছাপাইয়া গিয়াছিল। ১৯৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় গোটা পাকিস্তানে নূতন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করিলেও শাসক সামরিক জান্তা ও তাহাদের অনুগ্রহভোগীরা বাঙালির স্বাধিকার চেতনায় প্রচণ্ড আঘাত হানিয়া সে নির্বাচনী রায়কে ভন্ডুল করিবার চক্রান্তে মাতিয়া ওঠে একাত্তরের মার্চে। বঙ্গবন্ধু গোটা জাতিকে ঐ কুচক্রী মহলের গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একাট্টা থাকিতে এবং শন্তিপূর্ণ প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে যে নির্দেশনা প্রদান করেন উহা সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হইয়া রহিয়াছে। শাসকদের যাবতীয় শাঠ্য-ষড়যন্ত্র আর অবিমৃশ্যকারীতার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড নাদে ফাটিয়া পড়িয়াছিলেন বঙ্গবন্ধু এই ৭ই মার্চে। জাতির অবমাননা কিছুতেই সহ্য করিবেন না তিনি আর এমনই এক প্রেক্ষাপটে ৭ই মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেন ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ হিসাবে আবির্ভূত হন তিনি। শব্দ-ছন্দ-ব্যাঞ্জনার এক অনবদ্য কাব্য সৃষ্টি করিলেন তিনি ৭ই মার্চে। বাঙলার সকল গৌরব-মহিমা-সাহস-তেজ যেন পুরিয়া দিলেন ঐ ভাষণে, সঙ্গে সঙ্গে ছন্দে-তালে-লয়ে-সুরে তাহা বাঙলার আকাশ-বাতাস, অরণ্য-পাহাড়, নদী-খাল-বিল মায় মানুষের হূদয়তন্ত্রীতে মহাজাগরণের দৃপ্ত শপথ হইয়া দেখা দিল সেই ভাষণ। সুদীর্ঘ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়া গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজয় যখন আমাদের হাতের মুঠোয় ঠিক তখনই পোড়ামাটি নীতি অবলম্বনপূর্বক পাক হানাদারেরা ইতিহাসের এক জঘন্যতম গণহত্যা ও পাপাচারে লিপ্ত হইবার আয়োজন শুরু করিলে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের উত্তাল বাংলায় নিরস্ত্র ও শান্তিকামী মানুষকে যুদ্ধের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতির দিশা বাত্লাইয়া দিলেন এই ভাষণটির মাধ্যমে। আজ এতগুলি বত্সরেও ঐ ভাষণটির গভীরতা, ঐতিহাসিক বাস্তবতা আর তাত্পর্য এতটুকুও ম্লান হয় নাই এই দেশবাসীর নিকট। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এই ভাষণ বিশ্বগ্রাসী অগ্নিস্রাব যেন; ইহাতে রহিয়াছে এই দেশের ‘হলাহল-শিখ্ ভুজগ শিশুর দলের’ জন্য অনন্ত প্রেরণা, গণমানুষের সম্বিত্ ফিরাইবার অগ্নিমন্ত্র আর আছে প্রমেথিউসের অজেয় প্রাণশক্তি। তাই একাত্তরের ঘটনাবহুল মার্চের সবচাইতে উজ্জ্বল দিন এই ৭ই মার্চ। কেননা, বাংলার মানুষ সেইদিন বঙ্গবন্ধুর ঐ ভাষণের উপর ভর করিয়া তাহাদের মর্ত্যসীমা ছাড়াইয়া গিয়াছিল। বীর প্রসবিনী বাংলায় স্বাধীনতার প্রভাত সূর্যের রক্তিম উদয়ের পথ উন্মোচন করিয়া দিয়াছিল ৭ই মার্চ আর সে কারণেই ৭ই মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাতঃস্মরণীয় হইয়া রহিবে।