ইতিহাসে টাইটানিক

বিখ্যাত সিনেমা ‘টাইটানিক’-এর কথা সবারই জানা। জ্যাক ও রোজের এই সিনেমাটি বিশ্বের বুকে জায়গা করে নিয়েছে। সিনেমাটি জনপ্রিয়তা পাওয়ার আরও একটি কারণ হলো এটি বাস্তব ঘটনা থেকে নেওয়া হয়েছে। বাস্তবের টাইটানিক (আরএমএস-রয়াল মেইল শিপ) ব্রিটিশ শিপিং কোম্পানির তৈরি রাজকীয় জাহাজ ছিল। একটি দুর্ঘটনার কারণে সেটার জায়গা হয়েছে স্মৃতির জাদুঘরে। জানাচ্ছেন প্রাঞ্জল সেলিম ব্রিটিশ শিপিং কোম্পানি হোয়াইট স্টার লাইনের মালিকানাধীন টাইটানিকের পূর্ণনাম আরএমএস টাইটানিক। তখনকার সবচেয়ে বিশাল এবং বিলাসবহুল এ জাহাজটি ইউনাইটেড কিংডমের বেলফাস্টের হারল্যান্ড ওলফ্ শিপইয়ার্ডে তৈরি করা হয়। জন পিয়ারপন্ট মরগান নামক একজন মার্কিন ধনকুবের এবং ইন্টারন্যাশনাল মার্কেন্টাইল মেরিন কোং-এর অর্থায়নে ১৯০৯ সালের ৩১ মার্চ সর্বপ্রথম টাইটানিকের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং তখনকার প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ৩১ মার্চ ১৯১২ সালে। টাইটানিকের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৮৮২ ফিট দুই ইঞ্চি এবং প্রস্থ ছিল প্রায় ৯২ ফিট। এ জাহাজটি ওজন ছিল প্রায় ৪৬৩২৮ লং টন। পানি থেকে জাহাজটির ডেকের উচ্চতা ছিল ৫৯ ফিট (১৮মিটার)। এতে চার সিলিন্ডারের দুটি রিসিপ্রোকল ইঞ্জিন (এক ধরনের পিস্টন ইঞ্জিন), ট্রিপল এক্সপ্যানশান স্টিম ইঞ্জিন এবং তিনটি প্রোপেলারকে চালানের জন্য একটি লো প্রেসার টারবাইন ছিল। এর ২৯টি বয়লার সক্রিয় রাখার জন্য ছিল ১৫৯টি কয়লা পোড়ানো চুলো, যা সর্বোচ্চ ২৩ নট (৪৩কি.মি./ঘণ্টা) গতিতে জাহাজটিকে চালাতে পারত। টাইটানিকের অভ্যন্তরে ছিল সুদৃশ্য সুইমিং পুল, জিমনেসিয়াম, স্কোয়াস খেলার কোর্ট, ব্যয়বহুল তুর্কিস বাথ, বিশাল এবং ব্যয়বহুল ক্যাফে এবং ফার্স্ট ক্লাস ও সেকেন্ড ক্লাস উভয় যাত্রীদের জন্য আলাদা বিশাল লাইব্রেরি। তখনকার সকল আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটেছিল এ জাহাজটিতে। এ জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের জন্য তিনটি এবং সেকেন্ড ক্লাসের জন্য একটিসহ মোট চারটি লিফটের ব্যবস্থা ছিল। আর এ বিলাসবহুল জাহাজটিতে চড়তে ফার্স্ট ক্লাস যাত্রীদেরকে প্রচুর টাকা গুনতে হয়েছিল। টাইটানিকের যাত্রা পথ ১৪ এপ্রিল ১৯১২ তারিখ রাত্রে নিস্তব্ধ সমুদ্রের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রিরও কাছাকাছি নেমে যায়। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও চাঁদ দেখা যাচ্ছিল না। সামনে আইসবার্গ (বিশাল ভাসমান বরফখণ্ড) আছে এ সংকেত পেয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেন জাহাজের গতি সামান্য দক্ষিণ দিকে ফিরিয়ে দেন। সেদিনই দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে একটি জাহাজ রেডিওর মাধ্যমে যোগাযোগ করে টাইটানিকের সামনে বড় একটি আইসবার্গ আছে বলে সর্তক করে দেয় কিন্তু টাইটানিকের রেডিও যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা জ্যাক পিলিপস্ এবং হ্যারল্ড ব্রিজ এ তথ্যটিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে টাইটানিকের মূল্য নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে এ তথ্য প্রেরণ করেনি। একই দিনেই পরবর্তীতে আরেকটি জাহাজ টাইটানিকের পথে অবস্থিত ওই বিশাল আইসবার্গটির ব্যাপারে আবারও সতর্ক করে দেয় কিন্তু দুর্ভাগ্য তথ্যটি এবারও রেডিও অপারেটরদের কারণে টাইটানিকের মূল যোগাযোগ কেন্দ্রে পৌঁছায়নি। সেদিনই রাত ১১টা ৪০ মিনিটে টাইটানিকের পথ পর্যবেক্ষণকারীরা সরাসরি টাইটানিকের সামনে সেই আইসবার্গটি দেখতে পায় কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। টাইটানিকের ফার্স্ট অফিসার মুর্ডক আকস্মিকভাবে বামে মোড় নেওয়ার অর্ডার দেন এবং জাহাজটিকে সম্পূর্ণ উল্টাদিকে চালনা করতে বা বন্ধ করে দিতে বলেন। টাইটানিককে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এর ডানদিক আইসবার্গের সাথে প্রচণ্ড ঘর্ষণ খেয়ে চলতে থাকে। ফলে টাইটানিকের প্রায় ৯০ মিটার অংশজুড়ে চিড় দেখা দেয়। জাহাজটি সর্বোচ্চ চারটি পানিপূর্ণ কম্পার্টমেন্ট নিয়ে ভেসে থাকতে পারত কিন্তু পানিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল ৫টি কম্পার্টমেন্ট। এ আকস্মিকতায় ক্যাপ্টেন স্মিথ মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে আসেন এবং জাহাজটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেন। ১৫ তারিখ মধ্যরাতের দিকে লাইফবোটগুলো নামানো শুরু হয়। টাইটানিক বিভিন্ন দিকে জরুরি বিপদ সংকেত পাঠিয়েছিল। যেসব জাহাজ সাড়া দিয়েছিল তার অন্যতম হলো মাউন্ট ট্যাম্পল, ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং টাইটানিকের সহোদর অলিম্পিক। সবচেয়ে নিকটে অবস্থিত কার্পাথিয়া জাহাজটি টাইটানিকের প্রায় ৯৩ কি.মি. দূরে ছিল। সেখান থেকে টাইটানিক পর্যন্ত পৌঁছাতে জাহাজটির সময় লাগত প্রায় ৪ ঘণ্টা। কেইপ রেইসের, নিউফাউন্ডল্যান্ডের ওয়ার্লেস স্টেশনটিই একমাত্র ভূমিভিত্তিক ওয়ার্লেস স্টেশন যেটি টাইটানিকের বিপদ সংকেত পেয়েছিল। কিন্তু কোনো দিক থেকেই সাহায্য পায়নি দুর্ভাগা টাইটানিক। টাইটানিকের এই ঘটনা নিয়ে পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয় ‘টাইটানিক’ সিনেমাটি। এই সিনেমার পরিচালক, লেখক ও সহ-প্রযোজক হলেন বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব জেমস ক্যামেরন। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিওনার্ডো ডিক্যাপ্রিও (জ্যাক ডসন) ও কেট উইন্সলেট (রোজ ডিউইট বিউকেটার)। উচ্চবিত্ত সমাজের মেয়ে রোজের সাথে টাইটানিক জাহাজে নিম্নবিত্ত সমাজের প্রতিভূ জ্যাকের প্রেম হয়। ১৯১২ সালে টাইটানিকের পরিণতির পটভূমিতে তাদের এই ট্র্যাজেডিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটিতে। প্রেমের গল্প আর প্রধান চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও অনেকগুলো পার্শ্ব চরিত্র ঐতিহাসিক সত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। গ্লোরিয়া স্টুয়ার্ট বৃদ্ধা রোজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বৃদ্ধা রোজ তার টাইটানিক জীবনের কাহিনী বর্ণনা করেছেন।