অর্ধেক আকাশ থাকিবে না অন্ধকার
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৪, ২১:১৮
নারী-পুরুষ একে-অন্যের শুধু পরিপূরকই নহে, উভয়ে মিলিয়াই ভারসাম্য ও জীবসত্তা রক্ষা করিয়া চলিতেছে সৃষ্টির প্রথমাবধি। আজ বিশ্ব নারী দিবস এই কথাই স্মরণ করাইয়া দেয় যে, আমরা সেই পরিপূরকের জায়গাটায় ভারসাম্য রক্ষা করিয়া চলিতেছি না বহু যুগ ধরিয়া। নারী ও পুরুষ মিলিয়া যে পূর্ণ আকাশ, তাহার অর্ধেক ঢাকিয়া পড়িয়া রহিয়াছে পুরুষতান্ত্রিক পেশী জোরে। এই দুর্বুদ্ধি যে সার্বিক সভ্যতা ও মানবতার পক্ষে কাজ করে না—তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। নারী দিবসের তাত্পর্য এইখানেই যে, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও হিংসার বিরুদ্ধে লিঙ্গসমতার ভাবনাটি তাহা আমাদের বিস্মৃত হইতে দেয় না। কেননা, বহু পরিবর্তন ও অগ্রগতি সত্ত্বেও পুঁজিবাদী উন্নত দেশ অথবা অধিকাংশ উন্নয়নকামী দেশগুলিতে বৃহত্ অংশের নারী সমাজ আজও নির্যাতন, বঞ্চনা ও শোষণের তীব্র আঘাতে বিপর্যস্ত। পুরুষপ্রধান সমাজব্যবস্থায় সামাজিক বিধিনিষেধ বা পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ সবই পুরুষদের হাতে। ফলে নারীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভরশীল হইয়া থাকিতে হয় পরিবারের পুরুষ সদস্যের উপর। ইহার ব্যতিক্রম আছে, তবে তাহা সংখ্যাতত্ত্বের দিক হইতে যথেষ্ট অপ্রতুল।
লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে নারী শ্রমিকদের সমমজুরি, স্থায়ীকরণ, নির্ধারিত কাজের ঘণ্টার জন্যই ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ, নিউ ইয়র্কের নারী দর্জি শ্রমিকরা ধর্মঘটের পথে হাঁটিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। সেই ধর্মঘটী শ্রমিক মেয়েদের সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়াই কারা জেটকিন ৮ মার্চ শ্রমজীবী নারী দিবস ঘোষণা করেন। অথচ আইএলও-এর তথ্যমতে, নিম্নমজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় এখনও অধিকাংশ নারী শ্রমিককেই জীবন কাটাইতে হয়। নারী উন্নয়নের চিত্র যে বিশ্বের সর্বত্র একরকম হইবে না, তাহা স্বাভাবিক। এমনকি উন্নত বিশ্বেও এই তারতম্য সুস্পষ্ট। তাহার পরও গত পাঁচ দশকে বিশ্বে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনগুলির একটি হইতেছে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। ইহা বিশ্বের অর্থনৈতিক চেহারা পরিবর্তনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখিতেছে। নারীর সহিত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষও আজ তাহাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে স্বাগত জানাইতেছে। তাহাতে নীরবেই ঘটিয়া যাইতেছে বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তন। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা নারীদের কথিত প্রথাগত কাজ যেমন রান্না ও ঘরোয়া ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক সময় এবং ব্যয়—দুইটিই কমাইয়া দিতেছে। উচ্চশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হইতেছে নারীর জীবনধারা। চাকরির বাজারে তাহাদের ক্রমশ: অনুপ্রবেশ ঘটায় তাহারা পেশাদার নারী হিসাবে অধিকতর স্বীকৃতি পাইতেছেন। শিক্ষিত নারীর চাহিদা কর্মক্ষেত্রে সবসময়ই বেশি। বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রগুলিতে নারীদের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাহাদের কাজের সুযোগদানে আগাইয়া আসিতেছে। উদাহরণস্বরূপ ইন্টেল, গুগল এবং ইয়াহু-র মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান নারী কর্মীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেছে। বিশ্বের এই সকল শীর্ষ প্রতিষ্ঠান মনে করে, নারীরা বেশি মনোযোগী ও কর্মনিষ্ঠ। তাহাছাড়া মেধার প্রতিযোগিতায় নারীরা দুর্বল নহে কোনো অর্থেই। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়াছে, যেই সকল প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা বেশি, সেইখানে সাফল্যের হারও বেশি।
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশে নারীদের বিরুদ্ধে সমস্ত ধরনের শোষণ-বঞ্চনার যে ভয়াবহ চিত্র আমরা নিরন্তর দেখিতে পাই, তাহা পরোক্ষভাবে পিছাইয়া দেয় পুরা সমাজকেই। আমাদের দেশে কন্যাভ্রূণ হত্যা, যৌতুক বা পণজনিত কারণে গৃহবধূ হত্যার তালিকা এখনও দীর্ঘতরই হইতেছে। আইন থাকিলেও বাল্যবিবাহ বহাল তবিয়তে সম্পন্ন হইতেছে হরহামেশা। নারীদের প্রতি হিংসাত্মক আক্রমণের হারও কম নহে। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, দৈহিক, মানসিক নির্যাতন, অপহরণ এখনও দৈনন্দিন ঘটনা।
বুদ্ধিমত্তার নিরীক্ষায় ইহা বহু পূর্বেই প্রমাণিত যে, যাহা পুরুষ পারে বুদ্ধিবৃত্তিতে তাহার কোনো কিছুই নারীর বুদ্ধির অতীত নহে। দায়িত্বভার চলিয়া আসিলে নারী যে তাহা পুরুষের সমান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করিতে পারে, সেই উদাহরণ আজ শত-সহস্র। অর্ধেক অন্ধকার আকাশ আজ খুলিতেছে আস্তে আস্তে। যেই ভারী পর্দা ঢাকিয়া রাখিয়াছে এই আকাশ, তাহা রাতারাতি দূর হইবার নহে। সিমান দ্য বেভেয়ারের কথায়, মেয়েরা নারী হইয়া জন্মায় না, তাহাদের নারী হিসাবে গড়িয়া তোলা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ, ইউরোপসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারীর প্রতি সামাজিক অধিকার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সমাজ সংস্কার আন্দোলন নারীপ্রগতির পথকে অনেকাংশে প্রশস্ত করিয়া তুলিয়াছে। তাহার পরও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান এখনও বহুমাত্রায় প্রান্তিক।