ভবিষ্যতের বাতিঘর
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৭
বাংলাদেশের মেয়ে নাশিত জামান বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করিয়াছেন। এইবারের অস্কারের সেরা অ্যানিমেটেড ছবি ‘ফ্রোজেন’-এর নির্মাণের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি এই স্বীকৃতি পাইয়াছেন। গত ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড অ্যান্ড হাইল্যান্ড সেন্টারের ডলবিথিয়েটারে অনুষ্ঠিত অস্কারের ৮৬তম আসরে ছবিটির ডিজিটাল ও লাইটিং ইফেক্টস টিমের দলনেতা হিসাবে তাহার হাতে এই পুরস্কার তুলিয়া দেওয়া হয়। স্মর্তব্য যে, ইতঃপূর্বে আরেক বাংলাদেশি তরুণ নাফিস বিন জাফর অ্যানিমেটর হিসাবে অস্কার জয় করিয়া বিশ্ববাসীর নজর কাড়িয়াছিলেন। তবে নাশিত তাহাতে নূতন মাত্রা যোগ করিয়াছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়ে হিসাবে প্রথমবারের মতো এই বিরল স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজেকেই সম্মানিত করেন নাই, একই সাথে ডিজনির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘঅতৃপ্তিরও অবসান ঘটাইয়াছেন। উল্লেখ্য যে, প্রায় একযুগ আগে অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড ছবির বিভাগ যুক্ত হইলেও পুরস্কারটি এইবারই প্রথম তাহাদের করায়ত্ত হইল।
পৈতৃকনিবাস কক্সবাজার হইলেও গত সাড়ে তিন দশক যাবত্ পরিবারটির বসবাস যুক্তরাষ্ট্রে। নাশিত জামান থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে। কম্পিউটার গ্রাফিক্সে লেখাপড়া করিয়াছেন নিউইয়র্কের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। ওয়াল্ট ডিজনি অ্যানিমেশনে যোগ দেওয়ার আগে কাজ করিয়াছেন সনি পিকচার্সে। যুক্ত ছিলেন ‘লাইফ অব পাই’-এর মতো বেশকিছু সাড়া জাগানো ছবির নির্মাণ কাজের সহিত। নাশিত তাহার প্রকৌশলী পিতার নিকট বাংলাদেশের গল্প শুনিয়াই বাড়িয়া উঠিয়াছেন। স্বচক্ষে স্বদেশকে দেখিবার সুযোগ না হইলেও বাংলাদেশি হিসাবে তিনি গর্ববোধ করেন। বলাবাহুল্য, এই গর্ব নাশিতের একার নহে। বাংলাদেশের সীমানার বাহিরে গত কয়েক দশক যাবত্ যেই প্রবাসী প্রজন্ম বাড়িয়া উঠিতেছে—জ্ঞান-বিজ্ঞান ও রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে তাহাদের বিস্ময়কর অর্জন ও সাফল্যের তালিকাও কম দীর্ঘ নহে। জাতি হিসাবে আমাদের জন্য গর্বের বিষয় হইল, প্রবাসে বাড়িয়া উঠিলেও তাহাদের হূদয়ে জুড়িয়া আছে বাংলাদেশ।
আমরা প্রায়শ বলিয়া থাকি যে, নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশ আগাইয়া চলিয়াছে। কথাটির মধ্যে এতোটুকু অতিরঞ্জন নাই। অভাব নাই তাহার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও। নাশিত জামানের মতো প্রবাসী প্রজন্ম তাহাতে নিত্যনূতন মাত্রা যোগ করিয়া চলিয়াছেন। তাহাদের মেধা ও প্রতিভার সম্পদে সমৃদ্ধ হইতেছে বিশ্ব জ্ঞানভাণ্ডার। এখন প্রয়োজন দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র জনগণের অভাবনীয় অর্জনের সহিত তাহাদের জ্ঞান ও মেধার মেলবন্ধন। আমরা আশা করিব যে, তাহারা তাহাদের প্রতিভার দ্যুতিতে দেশকেও আলোকিত করিবেন। শোধ করিবেন শিকড়ের ঋণ। তাহাদের দেখিয়া নিজের ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নিরন্তর সংগ্রামরত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অনুপ্রাণিত বোধ করিবে। কারণ এই তরুণেরা হইলেন আমাদের ভবিষ্যতের বাতিঘর। তাহাদের আমরা অকুণ্ঠ অভিনন্দন জানাই।