আবিষ্কারের নেশায়
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৪, ২০:১২
নিজস্ব মেধা ও কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রজন্ম বিজ্ঞানবিশ্বে এদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আর্থিক, পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক নানা বাধাকে অতিক্রম করে তিনি আবিষ্কার করেছেন ৩৩টি নতুন যন্ত্র। যেগুলো শুধু এদেশে নয়, সারা পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় অনেক সাশ্রয়ে ব্যবহার করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা গ্রহণ না করেও নানা আবিষ্কার দ্বারা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এই বিজ্ঞানী। প্রজন্মের এই সফল প্রতিনিধির নাম এইচ এম ওয়াহিদুজ্জামান বাচ্চু। এই বিজ্ঞানী প্রজন্মকে শোনালেন তার এগিয়ে চলার গল্প। গল্পটি নিয়ে লিখেছেন আহসান রনি
এইচ এম ওয়াহিদুজ্জামান বাচ্চুর ছেলেবেলা কেটেছে ঝালকাঠিতে। চার ভাইবোনের মাঝে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার জন্মের ১ বছর পরই বাবা শহীদ হন মহান মুক্তিযুদ্ধে। মায়ের আদর-শাসনের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি প্রচুর আগ্রহ ছিল। আমার কোনো কাজে মা কখনই বাঁধ সাধেননি। তবে তিনি শাসন করেছেন প্রয়োজন মতো।’ স্কুল ফাঁকি দিলেও সেই সময়টুকু কাটিয়েছেন নতুন কিছু তৈরির কাজে। অবসর সময়টুকু কাটাতেন পুরাতন বা ভাঙারি জিনিসপত্রের দোকানগুলোতে। সেখানেই বসে বসে দেখতেন কীভাবে নতুন কিছু তৈরি করা যায়। নিজেই শিখেছেন গতানুগতিক কাজ থেকে ভিন্ন কিছু ভাবার শিক্ষা। যেকোনো কিছু তৈরিতে আগ্রহ ছিল এইচ এম ওয়াহিদুজ্জামান বাচ্চুর। সবসময় নতুন কিছু করতে চেয়েছেন নিজের মেধা ও চিন্তাশক্তি দিয়ে। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ না থাকলেও তিনি সবসময় যে কাজ করেছেন ভালোভাবে করার চেষ্টা করেছেন। এইচ এম ওয়াহিদুজ্জামান বাচ্চু তখন ঝালকাঠি সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ছাত্র। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ গেলেন তাদের এলাকা পরিদর্শনে। তাকে স্বাগতম জানাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওয়াহিদ। হেলিকপ্টার দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে এই যন্ত্রটি কীভাবে ওড়ে। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন হেলিকপ্টারের একদম কাছাকাছি। কিন্তু কিছু দেখা শুরু করার আগেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। এই কাজের জন্য তাকে বেতের বাড়িও খেতে হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকের ধমক, বেতের বাড়ি বা নানা বাধা দমাতে পারেনি তাকে। তার ৩৩টি আবিষ্কারের মধ্যে ৪টি বাজারজাত করা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। রোড হারমোনি পাওয়ার টেকনোলজি, যেকোনো প্রকার গরম পানি থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রযুক্তি, জোয়ার-ভাটাসহ চলমান যেকোনো পানি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রকল্প, সৌর বিদ্যুত্ ব্যবহারকারীদের জন্য সিলিংফ্যান, অটো পিলারকক, সৌর বিদ্যুতের স্ট্রিট লাইট, পুকুর পদ্ধতিতে বিদ্যুত্ উত্পাদন, বেবি ইউরিন অ্যালার্মসহ নানা প্রয়োজনীয় যন্ত্রের আবিষ্কারক তিনি। তার কাজের প্রধান সেক্টর হচ্ছে সৌর বিদ্যুত্। ঝালকাঠি সরকারি বালক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় একটি পাঁচ চাকার গাড়ি বানিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন এইচ এম ওয়াহিদুজ্জামান বাচ্চু। সকলেই তখন তাকে বিজ্ঞানী বলে ডাকা শুরু করে। কিন্তু তারা হয়তো ভাবতে পারেনি বাচ্চু নামের সেই ছোট্ট ছেলেটি তার আবিষ্কার দ্বারা সারা দেশের মানুষকে তাক লাগাবে। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নানা ধরনের চাকরি করলেও এর পাশাপাশি নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় কাজ করে গিয়েছেন। ১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালে তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান জাদুঘর থেকে সরকারি ফেলোশিপ অর্জন করেন। ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। তবে তিনি এসবকে কোনো অর্জন মনে করেন না। তার কাজ দ্বারা যদি দেশের মানুষ কোনোভাবে উপকৃত হয় তবে সেটিই তার সেরা অর্জন বলে জানালেন এই বিজ্ঞানী। তিনি বললেন, ‘আমি যখন আমার আবিষ্কৃত স্ট্রিট লাইট রাস্তায় দেখতে পাই এবং তা জনগণের কাজে লাগে তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে।’ তিনি জানালেন প্রজন্ম খুব বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক কাজে যুক্ত হচ্ছে না। কারণ দেশে গবেষণার কাজ করার খুব বেশি সুযোগ নেই। তবে যারা গবেষণার কাজ করতে চায় তাদের জন্য ঢাকাতে বিজ্ঞান জাদুঘর, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার সুযোগ আছে। তবে যেহেতু এসব জায়গায় যে কেউ কাজ করতে পারেন না, তাই নতুন নতুন বিজ্ঞানী এদেশে গড়ে উঠছে না। দেশের কেউ বিজ্ঞান বিষয়ক যেকোনো গবেষণা করতে চাইলে তার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই; যা করে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের বলে তিনি মনে করেন। তার বাবা ছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্ত্রী, তিন মেয়ে ও একটি ছেলেকে নিয়ে মিরপুরে থাকেন এই বিজ্ঞানী। তার স্বপ্ন, এদেশের তরুণ প্রজন্ম নানা আবিষ্কারে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করবে। তিনি তার আবিষ্কারের কাজে আরও বেশি সফলতা পাবেন এবং তার আবিষ্কারের ফল দেশের প্রতিটি মানুষ পাবে—এই শুভকামনা তার জন্য।
এইচ এম ওয়াহিদুজ্জামান বাচ্চু
জন্ম তারিখ ও স্থান :২৮ জানুয়ারি, ঝালকাঠি
মায়ের নাম :সৈয়দা লিলি হাতেম
বাবার নাম :শহীদ এইচ এম ওবায়দুল হক হাতেম
প্রথম স্কুল :কৃষ্ণকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :মা
প্রিয় উক্তি :সময়মতো কাজ করা।
প্রিয় পোশাক :শার্ট-প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :গবেষণায়
সাফল্যের সংজ্ঞা :তিরষ্কারকে হজম করতে পারা, পরিশ্রম করা ও আশাবাদী থাকা।