রাজনীতি

রাজনীতি আর দুর্নীতি একাকার হতে পারে না

কিছুদিন আগে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। ঐ আন্দোলনে ঢাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যা, পুলিশ হত্যা করা হলেও আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা ছিল না। আরো একটা লক্ষণীয় ব্যাপার ছিল বিএনপি শুধু সপ্তাহের পর সপ্তাহব্যাপী অবরোধ ডেকে আন্তঃজেলায় যানবাহন বাস-ট্রাক চলাচল বন্ধ করতে পেরেছিল। পেট্রোল বোমা মেরে ২ মাসে প্রায় ১৪০ জন লোককে হত্যা করেছে কিন্তু রাস্তায় আন্দোলনের পক্ষে জনগণ নামেনি। সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় ব্যাপার ছিল যে বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দকে রাস্তায় দেখা যায়নি। তারা ছিল গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে। তাদের এই আত্মগোপনে থাকার কারণে তৃণমূল থেকে জনগণ রাস্তায় নামতে উত্সাহ পায়নি। জানা গেছে যে এই ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ আত্মগোপনে ছিল এই কারণে যে তারা রাজনীতি করে দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। এখন আন্দোলনে নামলে সরকার তাদের বন্দী করবে আর ঐ দুর্নীতিলব্ধ শত কোটি টাকার সম্পদ তাদের দখলমুক্ত করে সরকারি সম্পদে পরিণত করবে। শতকোটি টাকার দুর্নীতিলব্ধ এই সম্পত্তি হারানোর ভয়ে আর সম্পদের লোভে তারা আন্দোলনে নামেনি। দুর্নীতি আর রাজনীতি সহ-অবস্থান করতে পারে না। তবে সব রাজনীতিবিদই যে দুর্নীতিগ্রস্ত তা নয়। অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যে তাদের সঙ্গে দুর্নীতির কোন সম্পর্ক নেই। তাদের দুর্নীতিলব্ধ কোন সম্পদ নেই। শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সকল প্রকার দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। তাদের আর্থিক দুর্নীতি ছিল না, রাজনৈতিক দুর্নীতিও ছিল না। শেরে বাংলা বলেছেন: ব্যক্তির কল্যাণ নয়, জাতির কল্যাণই ব্যক্তির কল্যাণ। শেরে বাংলা সারাজীবন জনগণের জন্য রাজনীতি করেছেন। পাকিস্তানীদের রক্তচক্ষু দেখেও বাঙালির মঙ্গল করেছেন। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত করে কোটি কোটি প্রজাকে স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা দিয়েছেন। শেরে বাংলার কোন দুর্নীতিলব্ধ সম্পদ ছিল না, শেরে বাংলার কোন রাজনৈতিক দুর্নীতিও ছিল না। সারাজীবন জনগণের জন্য সেবা করেছেন। নিজে ব্যক্তিগত কিছুই করেননি। বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ থাকাকালীন শেরে বাংলার এক ভক্ত তাকে দেখতে আসেন । নিয়ে আসেন কমলা। তিনি নিজ হাতে শেরে বাংলাকে কমলাগুলো খাওয়ালেন আর বললেন- আপনি আপেল-কমলা বেশি করে খাবেন। শেরে বাংলা উত্তরে বললেন- পাবো কোথায়? কিনবো কি দিয়ে? অর্থাত্ শেরে বাংলার ফল কিনে খাবারও টাকা ছিল না। হায়রে বাংলার বাঘ! আপনি কত মহত্। আপনি সারাজীবন জনগণের জন্য রাজনীতি করেছেন। আপনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আর ব্যক্তিগত জীবনে আপনার বৃদ্ধবয়সে আপনার ফল কিনে খাবার টাকা নেই। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর কি আছে? কিছুই নেই। সারাজীবন মজলুম জনতার ভাত-কাপড়ের জন্য রাজনীতি করে গেছেন। নিজের জন্য কিছুই করেননি। শূন্য হাতে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তার স্ত্রী আলেমা ভাসানীর জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি। আর রাজনৈতিক দুর্নীতি বলতে তার ভিতরে কিছুই ছিল না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সারাজীবন জনগণের জন্য রাজনীতি করে গেছেন। আইন ব্যবসা করে তিনি যা কিছু আয় করতেন তার সবটাই আওয়ামী লীগের জন্য খরচ করতেন। নিজের জন্য কিছুই করে যাননি। তিনি ছিলেন একজন পলিটিক্যাল মটিভেটর। হিন্দু-মুসলমান মিলনের জন্য তিনি সর্বত্র বক্তব্য রাখতেন। তিনি বলতেন সংখ্যাগুরু যদি সংখ্যালঘুর জান-মাল, ইজ্জতের রক্ষাকারী না হতে পারে তবে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যাগুরু না থেকে ‘সংখ্যা গরু’ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুগামী ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে খুবই ভালোবাসতেন এবং বলতেন যে, শেখ মুজিবের হাতেই এই বাঙালি একদিন মুক্ত হবে, স্বাধীন হবে। বঙ্গবন্ধু সারা বাংলাদেশের এ প্রান্ত হতে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত জনসংযোগ করতেন শুধু মুড়ি খেয়ে। এখন আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। আর অবৈধ সম্পদ নয়। রাজনীতি হবে বৈধ ও জনগণের কল্যাণের জন্য। যারা ইতিমধ্যে পচে গেছেন তারা তো পচেই গেলেন। যারা পচেননি, তারা সাবধানে থাকুন। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর পথ ধরুন আর বৈধ রাজনীতি করে জনগণের কল্যাণ করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। লেখক:সাবেক ছাত্রনেতা ও ব্যাংকার