স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি নির্দলীয়ই থাকুক

উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপটি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রায় অর্ধেক উপজেলার নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেল ইতিমধ্যে। উপজেলা নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি বিতর্ক বেশ জোরেসোরেই আলোচিত হয়েছে। বর্তমান উপজেলাসহ সকল স্থানীয় নির্বাচনই অরাজনৈতিকভাবে সম্পন্ন হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনটি রাজনৈতিক পরিচয়ে করা যায় কি-না এ নিয়েই এমন বিতর্ক। বাস্তবে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীরা অরাজনৈতিক মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীদের তাদের সমর্থিত বলে চিহ্নিত করে বসে। ফলে নির্বাচনে কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি সমর্থিত তা যেমন প্রার্থীরা বুঝেন, তেমনি ভোটারগণও বুঝে ফেলেন। নির্বাচনের পর তাই গণমাধ্যমগুলো প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করে কোন দলের সমর্থিত কতজন তা বের করে ফেলে। সদ্য সমাপ্ত উপজেলা নির্বাচনে আমরা তাই জানতে পেরেছি আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। সংসদ সদস্যগণ দলীয় রাজনীতির পরিচয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। যাদের দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় নেই, তাদেরকে স্বতন্ত্র বলে অংশগ্রহণ করতে হয়। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদ দলীয় রাজনীতির পরিচয়ে নির্বাচিত হচ্ছে না। উপজেলা নির্বাচনও দলীয় রাজনীতির পরিচয়ে হতে পারে এমনটা অনেকেই ভাবেন। কিছুদিন আগেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আশরাফ আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীসভায় দাবি করেন, উপজেলা চেয়ারম্যান দলীয় রাজনীতির পরিচয়ে নির্বাচিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার এই দাবি প্রকাশের ঠিক পরের দিনই তিনি আবার সংসদে বলেন যে, উপজেলা চেয়ারম্যানদের দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনের জন্য বর্তমান সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই এই মুহূর্তে। স্থানীয় সরকার নির্দলীয় চরিত্রের হওয়ার সুবিধা অনেক। স্থানীয় সরকারের কাছে বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে তার অঞ্চলের সকল মানুষের স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আসাটাই স্বাভাবিক। আর সেই সমস্যাগুলোর অধিকাংশই অরাজনৈতিক চরিত্রের। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় পদ্ধতিতে হলে শুধু উপজেলা চেয়ারম্যানই নন, বরং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও দলীয় পরিচয়ে নির্বাচিত হবেন। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে কিংবা স্থানীয় উন্নয়নে রাজনীতিকে অযথাই টেনে আনা হবে। তখন সকল স্থানীয় কর্মকাণ্ডে এবং উন্নয়নে রাজনীতির বিষয়টি মুখ্য হয়ে ধরা দেবে। কেননা নির্বাচিত দলীয় চেয়ারম্যান স্থানীয় জনগণের নিকট জবাবদিহিতা না করে বরং তার দলীয় রাজনীতির কাছে বন্দি হয়ে পড়বে। দলীয় নীতি এবং কর্মপদ্ধতি হয়ে উঠবে নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধির মূল উদ্দেশ্য। নির্দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে তখন দলীয় নির্বাচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়বে। স্থানীয় উন্নয়নে সরকারের অনুদান যেহেতু সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য একটি মাধ্যম, কাজেই দলীয়ভাবে নির্বাচিত হলে সরকারের বিরোধী শিবিরের স্থানীয় প্রতিনিধিগণ সরকারের আনুকূল্যতা লাভে প্রতিকূলতার শিকার হবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। বর্তমান ব্যবস্থায় নির্দলীয় পরিচয়ে নির্বাচিত হওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ সরকারের উন্নয়ন ও সাহায্য লাভে কোন অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে না। নির্দলীয় স্থানীয় সরকারকে দলীয় চরিত্র প্রদানের মাধ্যমে সরকার, রাষ্ট্র কিংবা দেশের মানুষের বিশেষ কোনো উপকার হওয়ার সুযোগ দেখি না। বরং এটি ঘটলে সবকিছুই রাজনীতির করাল গ্রাসের মধ্যে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকবে। স্থানীয় সরকারের নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে তাই এর নির্বাচন নির্দলীয় অবস্থায়ই হওয়া উচিত বলে মনে করছি। ছাত্র রাজনীতিতে জাতীয় রাজনীতির ভূত পৌঁছে গিয়ে ছাত্র রাজনীতির চরিত্র বদলে দেয়া হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নকেও ঠিক একইভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারটি এখনও জাতীয় রাজনীতির ছোবল থেকে দূরে আছে। আর তাকেও ধ্বংস করার চিন্তা-ভাবনা কেউ কেউ করছেন। এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি অধিক হারে শক্তিশালী না হয়ে বরং অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্ট সকলকে মনে রাখতে হবে যে, স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় চরিত্রটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। তাই ইতিহাসকে পরিবর্তন করতে হলে বর্তমান ব্যবস্থার ভুলগুলো নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণার দাবি রাখে। মনে হল, আর হুট করে এর পরিবর্তন করে দিলাম এমন যেন না ঘটে। ঠিক এমনই ঘটেছিল ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দু’ভাগ করা নিয়ে। মনে হয়েছিল, আর কোনো গবেষণা না করেই ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে। ফলশ্রুতিতে ভাল না হয়ে খারাপটাই হয়েছে বেশি। গত কয়েকটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে এটুকু বলা যায় যে, স্থানীয় নির্বাচনে বিশেষ করে উপজেলা চেয়ারম্যানগণ অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক চরিত্রের বর্ণনা দিয়ে জনগণের ভোট আদায় করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারপরও পাস করার পর একজন উপজেলা চেয়ারম্যানের পদটি অফিসিয়ালী নির্দলীয় থাকছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো দলের লোক হলেও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে তার পদটি নির্দলীয় থাকছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এখনও রাজনৈতিক চরিত্রের ঊর্ধ্বে আছে এটুকুই আমাদের সান্ত্বনা। লেখক :সাবেক সেনাকর্মকর্তা