এক বিদেশি বন্ধুর চোখে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৪, ২০:৪৩
আমার এক ফিলিপিনো বন্ধু বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছিল। ফিরে আসার পর জানতে চাইলাম, কেমন লাগলো বাংলাদেশ? খুব ভালো, মানুষগুলো বেশ অতিথিপরায়ন, তবে তোমাদের ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা... বলে কথা থামিয়ে একটু পরে বললো, জানো তোমাদের চালকদের মধ্যে বেশ সম্প্রীতি আছে। সেটা কেমন? বলতেই মুচকি হেসে বললো, দেখো ওরা তো সারাদিন ব্যস্ত থাকে, নিজেদের মধ্যে আলাপ করার তেমন সুযোগ পায় না। তাই রাস্তায় শুভেচ্ছা বিনিময়ের কাজটি সেরে নেয়। কীভাবে? এই যেমন দেখলাম রাস্তায় এক চালক তার গাড়ি দিয়ে অন্য চালকের গাড়ির পেছনে ধাক্কা দেয়। সামনের চালক তার সামনের গাড়িকে অনুরূপ ধাক্কা দেয়। তারপর গাড়ির কাচ খুলে সামনে পেছনে তাকিয়ে চেঁচিয়ে কিছু বলে। বিষয়টা যেন হাই, হ্যালো কেমন আছিস, এরকম। এ নিয়ে ট্রাফিক পুলিশও কিছু বলছে না এবং এটাই যেন রীতি এবং সবাই সবার সঙ্গে এভাবেই শুভেচ্ছা বিনিময়ে অভ্যস্ত। অধিকাংশ গাড়ির রঙ আর কোচকানো চেহারা দেখলেই সেটা বোঝা যায়। বলেই এক গাল হেসে দিলো। আমি কষ্টের সঙ্গে দাঁত বের করলেও হাসতে পারলাম না। তার কৌতুকপূর্ণ কথা আমার দেশপ্রেমকে আঘাত করেছে।
কিন্তু আমার এই বিদেশি বন্ধুর বর্ণনা তো সত্য। আমাদের শহরের রাস্তার এটা খুব পরিচিত দৃশ্য। রাস্তায় নেমেই শুরু করে কার আগে কে যাবে সেই প্রতিযোগিতা। সামনের গাড়িটার গতি একটু কমলেই পাশ কাটানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে পেছনেরটা। শুরু হয় এক গাড়ির সঙ্গে অন্য গাড়ির ধাক্কাধাক্কি আর বিনা কারণেই উচ্চ শব্দে হর্নের মহড়া। কোনোভাবে নিজের গাড়িটাকে সামনে নেবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টায় পাশ কাটাতে গিয়ে বেঁধে যায় অন্য গাড়ির সঙ্গে। দুই গাড়ির চালক নেমে এসে শুরু করে তর্ক, গালাগালি, কখনও কখনও সেটা হাতাহাতি লাঠালাঠি পর্যায়ে গড়ায়। পুরো রাস্তা জুড়ে জ্যাম বেঁধে যায়। তাড়াহুড়ো করে একটি মিনিট বাঁচানোর চেষ্টায় চালককে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
কষ্ট চেপে জানতে চাইলাম, আর কী দেখলে? আবারও স্বভাবসুলভ হেসে বললো, তোমাদের সময়নিষ্ঠা দেখেও খুব ভালো লেগেছে। এবার হেসে বললাম, হ্যাঁ আমরা আসলেই সময়ের মূল্য দিতে চেষ্টা করি। তো তুমি কী করে এটা বুঝলে? দেখলাম অনেকে দৌড়ে প্রতিযোগিতা করে বাসে ওঠার চেষ্টা করছে। দাঁড়িয়ে, ঝুলে, ছাদে চেপেও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর কী প্রাণান্তকর চেষ্টা অনেকের। সিগন্যাল বাতি লাল টকটকে আগুনের মতো জ্বলে থাকলেও সেটাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করছে। আবার এই হুড়োহুড়ি ঠেলাঠেলি, অধিক বোঝাই, সিগন্যালের নিয়ম না মানায় সৃষ্ট জ্যাম, আর পদে পদে থামার জন্য বাসটি সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না।
ট্যাক্সির অবস্থা তো দর্শনীয়। এসি তো দূরের কথা অধিকাংশ ট্যাক্সিতে জানালার কাচও নেই। চালক তার পছন্দের গন্তব্য আর কাঙ্ক্ষিত ভাড়া না পেলে যেতে চায় না। মিটার থাকলেও তার কোনো ব্যবহার নেই। অনেক কষ্টে চালককে রাজি করিয়ে ভেতরে চড়ে বসতেই এক দম বন্ধ করা দুর্গন্ধ আর ধুলোবালিতে মাখামাখি।
সিএনজি নামের যে যানবাহন দেখলাম সেটি বেশ পরিবেশবান্ধব। কিন্তু চালক আর গাড়ির অবস্থা অনেকটা ট্যাক্সির মতোই। তবে বাড়তি সুবিধা ছিনতাই থেকে রক্ষা পেতে দরজায় লোহার খাঁচা লাগানো আছে। কিন্তু ভেতরে বসলে নিজেকে চিড়িয়াখানার জন্তু মনে হয়। আর খাঁচা লাগানো গাড়িটা যেন এক ভ্রাম্যমাণ চিড়িয়াখানা।
ভালো লেগেছে রিকশায় চড়ে। কোনো শব্দ নেই। বাতাস খেতে খেতে চারদিকে দেখতে দেখতে গন্তব্যে যাওয়া যায়। কিন্তু ঘর্মক্লান্ত রিকশাচালককে দেখে বেশ মায়া লাগছিল। তার ওপর নিরক্ষর রিকশাচালক সাইনবোর্ড না পড়ে ভুল পথে প্রবেশ করায় তার পিঠে ট্রাফিক পুলিশের লাঠির আঘাতে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।
তার কথা শুনতে শুনতে আমার চোখও আর্দ্র হয়েছিল। সেই রিকশাওয়ালার জন্য, আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার দুর্গতির জন্য। আমার এই বিদেশি বন্ধুটি আমাদের ঢাকার পরিবহনের যে চিত্র তুলে ধরেছে তা অত্যন্ত সত্য। এই চিত্র বিদেশিদের কাছে আমাদের মাথা নিচু করে দেয়। অথচ আমাদের এই স্বল্প সক্ষমতা ও অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটু ধৈর্যশীলতা, মানবিকতা আর ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
ফিলিপাইন