দেশে প্রথম অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশান ইউনিট প্রতিষ্ঠার পরে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সফলভাবে ‘বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশান’ (অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন) করা হইয়াছে। গত সোমবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক এমএ খান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিত্সক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডা. বিমলাংশু দে’র নেতৃত্বে চিকিত্সকদের একটি দল এই প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করিয়াছেন। তাহারা ৫২ বত্সর বয়সী এক ব্যাংক কর্মকর্তার দেহে সফলভাবে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করিয়াছেন। তিনি একধরনের ব্লাড ক্যান্সারে ভুগিতেছিলেন। পত্রপত্রিকায় এই খবরটি ফলাও করিয়া প্রকাশ করা হইয়াছে। কেননা, নিশ্চিতভাবেই ইহা বাংলাদেশের চিকিত্সাসেবার অগ্রগতির একটি স্মারক হইয়া থাকিবে। লিউকেমিয়ার মতো ব্লাড ক্যান্সার বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট আরও কিছু প্রাণঘাতী রোগে হাড়ের মধ্যস্থিত অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হইয়া থাকে। গত তিন বত্সর ধরিয়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই চিকিত্সা চালু করিবার অদম্য চেষ্টা চলিয়াছে এবং অবশেষে এই সপ্তাহে তাহা সফলও হইয়াছে। ফলে অনেকেই নিশ্চয় দুর্লভ এই চিকিত্সা হাতের নাগালে পাইয়া আশান্বিত হইয়া উঠিবেন। মানুষকে এখন আর অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করিয়া বিদেশে ছুটিতে হইবে না। উল্লেখ্য যে অস্থিমজ্জা বা বোনম্যারো মানুষের হাড়ের ভিতরে থাকে। ইহাকে বলা হয় রক্ত তৈরির কারখানা। কোনো ব্যক্তি যখন রক্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, তখন মজ্জা আর ঠিকমতো রক্ত উত্পাদন করিতে পারে না। রুগী রক্তশূন্যতা, রক্তক্ষরণ ও নানা প্রকার সংক্রমণে ভুগিয়া শেষ পর্যন্ত মারা যায়। এই রোগের চিকিত্সায় খারাপ মজ্জাটিকে ফেলিয়া দিয়া রোগীর শরীরে ভালো মজ্জা প্রবেশ করাইতে হয়। বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশে যতো ধরনের ক্যান্সার রহিয়াছে তাহার শতকরা ১১ দশমিক ০৪ ভাগ হইল ব্লাড ক্যান্সার। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশন এই রোগের নিরাময়যোগ্য চিকিত্সা। বাংলাদেশের চিকিত্সক ও সেবিকারা বেশ কয়েকবার বোস্টনে এই বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়াছেন। ইতোমধ্যে, প্রাথমিকভাবে ২০ জন রুগীর একটি তালিকা করা হইয়াছে। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হইলেও আপাতত এই রুগীগণ বিনা মূল্যে সেবা পাইতেছেন। অস্বীকার করা যাইবে না যে, দেশের সার্বিক চিকিত্সাসেবা এখনও বেহাল। দেশের সিংহভাগ মানুষই সুচিকিত্সা হইতে বঞ্চিত, অনেকেই দালালের খপ্পড়ে পড়িয়া সর্বস্বান্ত হন, এমনকি ভুল চিকিত্সায় প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়। আধুনিক নিরাময়যোগ্য অনেক চিকিত্সাকৌশলই আমাদের নাগালের বাহিরে, প্রত্যন্ত জেলা উপজেলাগুলির স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিত্সকেরা থাকেন গরহাজির, উপযুক্ত লোকবলের অভাবে সরকারি হাসপাতালগুলিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি পড়িয়া পড়িয়া নষ্ট হয়। এই হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির মধ্যেও অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মতো অত্যাধুনিক ও জটিল সেবা প্রদানে আমাদের চিকিত্সাকর্মীগণের সাফল্য অনেকটা আশা জাগাইয়া তোলে। নিশ্চয়, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই চিকিত্সাসেবা আরও বহুকাল সিংহভাগ মানুষের সাধ্যের বাহিরে থাকিয়া যাইবে; তবু এই সাফল্য চিকিত্সাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বাংলাদেশের চিকিত্সকদের দক্ষতা ও আস্থার চিহ্ন হইয়া থাকিবে।