শিক্ষা
চরিত্র গঠনই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৪, ২০:৪৭
কারও মতে, শিক্ষা সমাজের মেরুদণ্ড গঠন করে। আবার কেউ কেউ বলেন, শিক্ষাই সমাজের অগ্রগতির মূল। এখন কথা হলো-মেরুদণ্ড শুধু থাকলেই হবে না, সেটা কীভাবে আছে দেখতে হবে। জীবজগেক দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে—মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী। অমেরুদণ্ডী অপেক্ষা মেরুদণ্ডী প্রাণীর জ্ঞান ও বুদ্ধি অধিক। আবার মহাযোগীরা সমীক্ষা করে দেখেছেন যে, মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে যাদের মেরুদণ্ড আনুভূমিক তাদের উলম্ব অবস্থায় থাকা মেরুদণ্ডী প্রাণীর চেয়ে জ্ঞান-বুদ্ধি বেশি। নিদ্রিত অবস্থা ছাড়া সর্বক্ষণই মানুষের মেরুদণ্ড উলম্ব (Perpendicular) অবস্থায় থাকে। তাই প্রাণীদের মধ্যে জ্ঞান-বুদ্ধির দিক দিয়ে মানুষই শ্রেষ্ঠ। কুকুর, ভালুক, বানর, হাতি ইত্যাদির মেরুদণ্ড আনুভূমিক (Parallel) থাকলেও প্রায়ই উলম্ব অবস্থাপ্রাপ্ত হয়। তাই এদের বুদ্ধি গরু, ভেড়া, মহিষ ইত্যাদি থেকে অধিক। যাই হোক, কোন কোন পণ্ডিতের মতে, মেরুদণ্ড এখনও সোজা হয়নি। যতদিন পর্যন্ত না বড়লোক তোষণ বন্ধ হবে, ততদিন পর্যন্ত তা সোজা হবে না।
আমাদের পাঠ্য ব্যবস্থায় নৈতিক চরিত্র গঠনের কোনও বিষয় বর্তমানে নেই। আছে শুধু ভাষার ছড়াছড়ি। দুটি ভাষা অর্থাত্ বাংলা, ইংরেজি বাধ্যতামূলক। ছাত্ররা এতগুলো ভাষা আয়ত্ত করবে, না অঙ্ক, বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে জ্ঞান বাড়াবে? তাছাড়া কোনও ছাত্রকে নৈতিক চরিত্র ঠিক না করে শিক্ষাদান হলো সমাজের অমঙ্গল ডেকে আনা।
আমাদের দেশে শিশুদের মধ্যেই দুর্নীতি ঢোকানো হচ্ছে। শৈশবে বাবা-মা তাদের শেখাচ্ছেন ‘বিড়াল ওড়ায় ঘুড়ি, নীল আকাশে রঙিন ঘুড়ি চলছে উড়িউড়ি।’ ছড়ার বইটিতে নাটাই নিয়ে বেড়ালের ঘুড়ি ওড়ানোর ছবিও আছে। আবার, ‘খোকন খোকন করে মায় খোকন গেছে কাদের নায়, সাতটা কাকে দাঁড় বায় খোকনরে তুই ঘরে আয়।’ ছড়াটির ছবিতে কাক ঠোঁট দিয়ে দাঁড় বাইছে। এগুলো শেখাতে গিয়ে মায়েরা খুব আনন্দ পেলেও শিশুরা কিন্তু প্রকৃত ভেবেই শিখছে। শিশুটি পরিণত হলে বুঝতে পারছে যে, বেড়াল ঘুড়ি ওড়াতে পারে না এবং গরুও পারে না গাছে চড়াতে। বাবা-মা যা শিখিয়েছেন, সবই মিথ্যে। বইগুলোতেও সব মিথ্যে লিখেছে। তখন সে ভাবছে যে, বইয়ের লেখক থেকে শুরু করে বাবা-মাসহ সবাই যখন মিথ্যে বলছে, তখন সেটা অর্থাত্ মিথ্যে বলাটা নিশ্চয়ই অন্যায়ের কিছু নয়। মনে হয়, এভাবেই আমাদের শিশুদের মধ্যে মিথ্যের বীজ বপন করা হচ্ছে।
আমাদের বেশিরভাগই যেন শিশুতুল্য। একটি শিশুর কাছে দু’টো তেলভর্তি বোতল ধরা হলো। একটি বোতল কারুকার্য করা ও রং-বেরঙের সুন্দর ডিজাইন করা এবং অপরটি সাদামাটা অর্থাত্ সাধারণ। শিশুটি সুন্দর বোতলটিই নিতে চাইবে। কিন্তু একজন রাঁধুনি বোতলের ছিপি খুলে তেল পরীক্ষা করে বোতল নির্ধারণ করবেন। এখন সবাইকে প্রশ্ন করা হলো যে, কোনটার প্রয়োজন-তেলের, না বোতলের? অনেকেই বলে উঠবেন যে, তেলের প্রয়োজন। কিন্তু না, প্রয়োজন দু’টোরই। কেননা, বোতল ছাড়া আমরা তেল রাখব কোথায়? তবে তেলের অধিক এবং তেলই মুখ্য। তেল থাকা অবস্থায় বোতলে ছিদ্র হলে তা বন্ধ করার জন্য সকলে মরিয়া হয়ে উঠবেন। কিন্তু তেল ফুরিয়ে গেলে বোতলের আর প্রয়োজন নেই।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাই হলো ছেলেমেয়েদের কাঁধে সাধ্যাতীত পুথিগত বিদ্যার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি। মায়েদের ছোটাছুটি। পরীক্ষা নামক প্রতিযোগিতায় উত্তম ফলপ্রাপ্তি। পরবর্তীতে অধিক অর্থোপার্জন হয়, এমন ‘লাইনে’ পড়াশোনা করে উপযুক্ত কর্মস্থলে চাকরিপ্রাপ্তি। দেশের ও দশের অর্থ আত্মসাত্। নিজের নামে প্রাসাদপ্রমাণ অট্টালিকা ও গোটা কয়েক গাড়ি। অধিকাংশ অভিভাবকের ধারণা, এটাই ছেলেমেয়ের উন্নতি। কিন্তু ক’জন ভাবেন যে, ছেলের বাড়ি-গাড়ি ক’দিন পর হয়ে যাবে নাতির। বাড়ি-গাড়িসহ সব বস্তুই রেখে এ জগতে সবাইকে পরপারে দিতে হবে পাড়ি।
লেখক :সাংবাদিক