স্মরণ

বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী ড. জামাল নজরুল ইসলাম

গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞান এবং জ্যোর্তিবিদ্যার একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হলেন ড. জামাল নজরুল ইসলাম। আইনষ্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, কসমোলজি ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্বের মতো জটিল বিষয় নিয়ে তিনি করেছেন মৌলিক গবেষণা। অধ্যাপক জামাল নজরুল আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন গত বছরের ১৬ মার্চ। আক্ষেপ হয়, বিশ্বের বিজ্ঞান মহলে যিনি ছিলেন রীতিমত সেলিব্রিটি, সেই জগত সেরা বিজ্ঞানী সম্পর্কে মাতৃভূমি বাংলাদেশে অনেকের কোনো ধারণাই ছিল না। এজন্য তার নিভৃতচারী জীবন, নাকি মিডিয়ার নির্লিপ্ততা দায়ী, তা ঠিক বলতে পারবো না। ড. জামাল নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ঝিনাইদহ জেলায়। পাকিস্তানের মারীরলরেন্স কলেজ থেকে তিনি সিনিয়র কেমব্রিজ (ও লেভেল) এবং হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ (এ লেভেল) পাস করেন। এরপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিএসসি অনার্স করে কেমব্রিজে আবারও গ্রাজুয়েট করেন। কেমব্রিজ ট্রিনিটি কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে প্রয়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার উপর পিএইচডি করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে ডিএসসি (ডক্ট অবসায়েন্স) ডিগ্রী অর্জন করেন। ড. নজরুল লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে শুরু করে কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অবথিওরেটিক্যাল এস্ট্রনমি, আমেরিকার প্রিন্সটন ইনস্টিটিউট ফর এডভান্সডস্টাডি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বের সেরা বিদ্যাপিঠে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেছেন। বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ প্রেস থেকে তার লেখা “দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স (১৯৮৩)”প্রকাশিত হবার পর বিশ্বের বিজ্ঞান মহলে হৈচৈ পড়ে যায়। মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি কি হতে পারে, এই জটিল বিষয় নিয়ে লেখা তার বইটি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। এরপর এই প্রকাশনা থেকে বেরিয়েছে তার বই, “রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৫)” এবং “অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টুম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি (১৯৯২)”। তার লেখা বইগুলো কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, প্রিন্সটন, হার্ভার্ডের মতো বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। অধ্যাপক ইসলামের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বিশাল। যার মধ্যে রয়েছে তাত্ত্বিক কণা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, মহাকর্ষ তত্ত্ব, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, আইনষ্টাইন ম্যাক্সওয়েল সূত্র, নক্ষত্রের গঠন, মহাবিশ্ব তত্ত্ব অন্যতম। মহাবিশ্বের ভবিষ্যত বা অন্তিম পরিণতি নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধে ড. জামাল নজরুল মহাবিশ্ব যেসব সময় প্রসারিত হবে সে রকম একটি ধারণার কথা বলেন যা বিজ্ঞান বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি অংক কষে দেখিয়েছেন আগামী ১০০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে আমাদের গ্যালাক্সি অর্থাত্ মিল্কিওয়ের সব তারার মৃত্যু হবে। তবে বিলেতের মোহ, লাখ টাকার মর্যাদাপূর্ণ চাকরি এবং গবেষণার অফুরন্ত সুযোগ তাকে ধরে রাখতে পারেনি বেশিদিন। সবকিছু ছেড়ে ১৯৮৪ সালে তিনি স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন পৈতৃক ভূমি চট্টগ্রামে। যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ৩ হাজার টাকা বেতনের অধ্যাপক পদে। জানা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বেতন সাব্যস্ত করেছিল মাত্র আটশ টাকা, তাই তিন হাজার টাকা দিতে রীতিমত গড়িমসি করছিল। ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, ড. ইসলাম যদি বিদেশে থেকে যেতেন তাহলে নিশ্চিত নোবেল পুরস্কার পেতেন। কিন্তু এই ক্ষণজন্মা মনীষী দেশের টানে মাতৃভূমিতে ফিরে এসে স্থাপন করলে দেশ্রপ্রেমের এক বিরল দৃষ্টান্ত! দেশকে তিনি এতো ভালোবাসতেন বলে একাত্তরে পাক-বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা বন্ধের জন্য চাপ দিতে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছ চিঠিও লিখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মাতৃভাষা বাংলাতেও উচ্চতর বিজ্ঞান চর্চা করা যায়। তাই বাংলায় বিজ্ঞানের উপরও তিনি লিখেছেন বেশক’টি বই। যেমন বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত “কৃষ্ণবিবর”, “মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা” ইত্যাদি। ড. জামাল নজরুল ছিলেন একের ভিতর অনেক। তিনি ভালো গাইতে পারতেন, বাজাতেন পিয়ানো ও সেতার। আবার ছবি আঁকতেও খুব পছন্দ করতেন। বিজ্ঞানের উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি কাজ করেছেন দারিদ্র্য দূরীকরণে এবং শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়নে। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি হিসাবে দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম নগর ও পরিবেশ উন্নয়নে স্ট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম করে গেছেন। বিশ্বমানের তত্ত্বীয় ও গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণার জন্য ড. জামাল নজরুল চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যািলয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। যার মূল লক্ষ্য হল মৌলিক বিজ্ঞান চর্চার জন্য বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা। বিস্ময়কর কথা হল, ড. জামাল নজরুলের বাসায় ছিল না কোনো কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ। তিনি বলতেন মৌলিক গবেষণার জন্য কম্পিউটারের দরকার হয় না, মাথা খাটিয়ে করলেই হয়। জগত্ খ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোস যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর যুগান্তকারী গবেষণা করেছিলেন, তেমনি ড. নজরুল স্বপ্ন দেখতেন আমাদের দেশের তরুণ বিজ্ঞানীরা একদিন দেশে বসেই বিজ্ঞানের মৌলিক শাখায় গবেষণা করে বিশ্ব জয় করবে। লেখক :প্রকৌশলী