দুই পক্ষের বাকযুদ্ধে আতংকিত শান্তিপ্রিয় জনগণ

৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পারস্পরিক বাকযুদ্ধে পরিবেশ কেমন জানি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও এমপিরা বলেই চলেছেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি না এসে চরম ভুল করেছে এবং উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে দুধের সাধ ঘোলে মিটাচ্ছে। অপরদিকে বিএনপির নেতৃবৃন্দ নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল এবং দ্রুত একাদশ নির্বাচনের ব্যবস্থা না করলে সামনে ব্যাপক আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি দলের নেতৃবৃন্দ একাদশ নির্বাচনের জন্য আগামী পাঁচ বছর অপেক্ষা করার জন্য বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছেন। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ সকল নেতৃবৃন্দই বলেছেন- এটি সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। তিনি বিএনপিকে জামায়াত ছেড়ে আলোচনায় আসার কথাও বলেছেন। নির্বাচনের দিন বিকেলে নির্বাচনোত্তর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদও বলেছিলেন এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। এ কথাগুলো একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে অনেককেই আশ্বস্ত করেছিল। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে অনেকটাই শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে পেরেছে অর্থাত্ রাজনৈতিক খেলায় বিএনপিকে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট (বর্তমানে ১৯ দলীয় জোট) আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততার চেয়ে নেতাদের সম্পৃক্ত করতে না পেরে সফল হতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন। ভিডিও বার্তা প্রদান ও নেতাদের আত্মগোপনে চলে যাওয়া ছিল তাদের রাজনৈতিক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। উভয়দলের সফলতা ও ব্যর্থতার সমীকরণে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল এ ভেবে যে ১৮ দলীয় জোট আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত না রেখে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। অপরদিকে নবগঠিত সরকারের সকলেই এটাকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলে আলোচনার পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দু’দিক থেকেই নরম সুরের কথাবার্তার কারণে দেশে শান্তির সুশীতল বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল। আর্থ-সামাজিক শিক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আবারো নেতা-নেত্রীদের মুখে তীর্যক কথাবার্তার কারণে শান্তি বিনষ্ট হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্ব অনেকটাই আনন্দমুখর হলেও দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে পেশীশক্তি ও হামলা ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সন্ত্রাসে বেশ কয়েকজন মারা পর্যন্ত গিয়েছে। তৃতীয় দফা নির্বাচনের সময় আরও বেশি সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে ইতিমধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় নির্বাচনী সংঘর্ষে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার এবং একই দলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহতের ঘটনায় নির্বাচন কমিশন বাধ্য হয়ে নির্বাচন স্থগিত করেছেন। তৃতীয় দফা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন দু’দফা নির্বাচনের ন্যায় গা-ছাড়াভাবে থাকলে অনেক বেশি মারামারি হওয়ায় সাধারণ নাগরিকরা আতংকিত। সরকারকেও প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে জনমনের আশংকা দূর করতে হবে। এমপি মন্ত্রীরা তাদের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা থেকে নিবৃত করতে হবে। যদি এমপি মন্ত্রীরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চান তাহলে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হবে নিঃসন্দেহে। সরকারকে মনে রাখতে হবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী এ শান্তিপূর্ণ অবস্থাকে ধরে রাখতে হলে মন্ত্রীদের কর্মী উদ্দীপক ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বাক্যবাণ পরিহার করতে হবে। প্রতিবারই নতুন সরকার আসার পরপরই উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু গবেষকদের মতে- এ নির্বাচন পূর্বের যে কোন উপজেলা নির্বাচন হতে সহিংসতার মাত্রা ছাড়িয়েছে, তার কারণ নির্বাচনে উভয় দলই যে কোনভাবে জেতার ব্যাপারে মরিয়া। উভয় দলের মুখোমুখি অবস্থানে সরকার নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেয়ার মধ্যেই সার্থকতা খুঁজে পাবে বলে মনে হয়। আর যদি এমপি মন্ত্রীরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন তাহলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি আবারো সামনে চলে আসবে। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দফার পরিবেশ রক্ষায় সরকার ও নির্বাচন কমিশন যেমন আন্তরিক ছিলেন তৃতীয় দফাসহ বাকি সকল পর্যায়ের নির্বাচনেও আন্তরিকতার সাথে সুষ্ঠু নির্বাচন করার লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষায় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কতগুলো চেয়ারম্যান পেল বা না পেল তা সরকারের বিবেচনায় আনা উচিত হবে না। উত্সবমুখর পরিবেশে সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতা করে আর কর্মীদের সংযম থাকার পরামর্শ দেয় তাহলে এ সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব মন্ত্রী এমপিদের এ দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণিত হবে, অপরদিক থেকে ১৯ দলীয় জোটকে আন্দোলনের পথ থেকে আলোচনার পথে নিয়ে আসা যাবে। দেশটাতো সবার কেবল সরকারের নয়। সুতরাং সরকারের সাথে সাথে বিএনপি তথা ১৯ দলীয় জোটকেও পরিবেশ উন্নতির জন্য কাজ করতে হবে। কেবল আন্দোলনের তর্জন-গর্জন নয় সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে। বারবার অবৈধ সরকার বলে সরকারকে গালি দিয়ে আরো জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার দিকে অগ্রসর হলে বিএনপির জন্যই হবে আত্মঘাতী। উপজেলা নির্বাচনে এসে বিএনপি যে পজেটিভ রাজনীতির ধারা সূচনা করেছে উপজেলা নির্বাচনের শেষ ধাপ পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রাখবে বলে আশা করি। উপজেলা নির্বাচনে ধীরে ধীরে উত্তাপ ও সহিংসতা হয়েছে কথাটি যেমন সত্য গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচন হয়েছে এটাও তেমন সত্য। আমাদের মত উন্নয়নশীল বিশ্বের যে কোন দেশে স্থানীয় নির্বাচনে একটু উত্তাপ ছড়ায়, বিষয়টি কাম্য না হলেও অস্বাভাবিক বলা যাবে না। সকলকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে যাতে নির্বাচনের সর্বশেষ পর্যায়টিও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়। ১০ম নির্বাচনে বিরোধীদল দলীয় সরকারের অধীন অংশ না নিয়ে ব্যাপক কর্মসূচি দিলেও আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন হয়েছে এটাই সত্য এবং বাস্তবতা। নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন নতুন সরকারের সাথে রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যথাযথভাবে কাজ করছে। নির্বাচনের পর চলমান এ শান্তিপূর্ণ অবস্থা ধরে রাখার জন্যে সরকার ও বিএনপি তথা ১৯ দলীয় বিরোধী জোটের উচিত হবে স্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং উভয়কেই পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল করা। মনে রাখতে হবে, ২০১৩ সালের দীর্ঘ আন্দোলনে মানুষের মধ্যে যে আতংক ছড়িয়েছে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য এ মুহূর্তে সময় দেয়া দরকার। ১৯ দলীয় জোট নিজেদেরকে না গুছিয়ে হঠাত্ আন্দোলনে গেলে আগের মতই বিফল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে। জনসম্পৃক্ততাহীন আন্দোলনে সরকারের কিছু করা যায় না বিগত আন্দোলন থেকে বিরোধী দলের শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে অগ্রসর হওয়া উচিত হবে। সুতরাং অস্বস্তিকর তীর্যক বাক্য চালাচালি না করে উভয় দলই গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির করে জাতিকে দুশ্চিন্তামুক্ত করবেন- এটাই প্রত্যাশা। লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক