লাল গ্রহের পথে

সারাজীবন তিনি আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। অবশেষে সে স্বপ্ন হয়তো সত্যি হতে চলেছে। নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে তিনি সেই স্বপ্নের পথে হেঁটে চলছেন অবিরাম। তিনি লুলু ফেরদৌস। নাসাতে সহযোগী গবেষক হিসেবে বর্তমানে কর্মরত এই বাংলাদেশি নারী মঙ্গলের প্রথম বাসিন্দাদের একজন হতে যাচ্ছেন। তাকে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার মঙ্গল হতে পারে পৃথিবীবাসীর জন্য দ্বিতীয় মঙ্গলময় বসবাসের স্থান। পৃথিবী থেকে অনেকটা লাল দেখানোর কারণে মঙ্গল গ্রহের অপর নাম লাল গ্রহ। দ্বিতীয় পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে মহাকাশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। জনসংখ্যার ভারে পিষ্ট পৃথিবীবাসীর জন্য এটা হতে পারে একটি ভালো খবর। আর এই গ্রহে বসতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মহাকাশ অভিযান চালিয়েছে। এ অভিযানের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে কয়েকদিন আগে মার্কিন রাজ্য ফ্লোরিডার কেপ কেনাভেরাল থেকে কিউরিসিটি নামে একটা মহাকাশযান চলে গেছে মঙ্গলের উদ্দেশে। এই মহাকাশযান পাঠিয়েছে নাসা। আর এই মঙ্গলে পাড়ি দেওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছেন লুলু ফেরদৌস। প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলে এটা কোনো প্রমোদ ভ্রমণ নয়। ডাচ নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান মার্স ওয়ানের পৃষ্ঠপোষকতায় এটা মঙ্গলের উদ্দেশে ওয়ান-ওয়ে যাত্রা। মঙ্গলযাত্রা নিয়ে বেশ রোমাঞ্চিত তিনি। ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা ফেরদৌস সেই ৬ বছর বয়স থেকে নভোচারী হওয়া আর মঙ্গলে যাওয়ার স্বপ্ন লালন করে আসছেন। দশ বছর বয়সে যখন প্রথম সনিক বুম সম্পর্কে পড়েন লুলু, তখন থেকেই তার ভেতর আকাশে ওড়ার স্বপ্ন বাসা বাঁধে। তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, তিনিই প্রথম বাংলাদেশি হবেন যিনি শব্দের বাঁধা ভাঙবেন। একটি ডাচ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সাতমাস আগে ঘোষণা দেয়, ২০২৫ সালে মঙ্গল গ্রহে স্থায়ীভাবে মানুষের বসবাস শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে যারা স্বেচ্ছায় মঙ্গলে বসতি গড়তে চান, তাদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি আবেদনপত্র আহ্বান করে। এরপরই আবেদনপত্র জমা হতে শুরু করে। অসংখ্য আবেদনপত্র জমাও পড়ে যায়। এরপর শুরু হয় যাচাইবাছাই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১ হাজার ৫৮ জন পৃথিবীবাসীকে দ্বিতীয় রাউন্ডের জন্য নির্বাচিত করা হয়। এই একহাজার ৫৮ জনের মাঝে লুলু ফেরদৌসও একজন। বাকি ধাপগুলো পার হওয়ার পরেই চূড়ান্ত হবে লুলু মঙ্গলে না ফেরার টিকিট নিয়ে ওয়ানওয়ে জার্নিতে যেতে পারবে কি না। লুলু জানান, ২ লাখের বেশি আবেদনপত্র জমা পড়ে এই প্রোগ্রামে। পুরো প্রোগ্রামে মাত্র চারজন মহাকাশচারীকেই এ সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি এই চারজনের একজন হতে যাচ্ছেন। এই একমুখী যাত্রার একমাত্র অর্থ—হয় মঙ্গলে গিয়ে লড়াই কর, নাহয় মর। তবে এ নিয়ে মোটেও ভীত নন লুলু। তিনি বলেন, ‘আমি এই অভিযানের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষায় আছি। নিজেকে প্রস্তুতও করে ফেলেছি আমি। এমন অভিযানের ঝুঁকি সম্পর্কে আমার জানা আছে। এসব আমি শিখেছি যখন পাইলট ও মহাকাশচারী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছি।’ পরিবারের সদস্যদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানাতে গিয়ে লুলু বলেন, ‘পরিবারের সবাই তো বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার সিদ্ধান্তের কথা জানার পর। কিন্তু আমি জানি, আমার এই অভিযান তাদেরকে গর্বিত করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মঙ্গলের বাসিন্দাদের সাথে পৃথিবীর বাসিন্দাদের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ থাকবে। কাজেই আমি শারীরিকভাবে পরিবারের সাথে না থাকতে পারলেও ভার্চুয়ালি অবশ্যই থাকব।’ প্লেন চালানর স্বপ্ন নিয়ে ২০০০ সালে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে জিডি পাইলটের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তিনি সুযোগ পাননি, কারণ তিনি নারী। নারীরা জিডি পাইলট হতে পারবে না। বিমান বাহিনী থেকে তাকে ডাক্তার বা শিক্ষাবিভাগে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং আবেদন করতে বলা হয়। তার পরও তিনি হাল ছেড়ে দেননি। বিদেশে পাড়ি দেওয়ার জন্য দীর্ঘ ১১ বছর কাজ করে অর্থ সঞ্চয় করেন। ২০০৭ সালে বিমানচালনা বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ২০১২ সালে ‘এয়ার ট্রান্সপোর্টেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ ডিগ্রি নিয়ে ওমাহার ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাসকা থেকে গ্র্যাজুয়েট হন। পরে তিনি নেব্রসকাতে নাসার গবেষণা সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। বর্তমানে তিনি অ্যারোস্পেস সায়েন্সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনে পড়াশোনা করছেন। যখন মঙ্গলের জন্য আবেদনপত্র চাওয়া হয়, তিনি প্রথমেই ওয়েবসাইটে গিয়ে পরীক্ষা করেন সেখানে নাগরিকত্ব, লিঙ্গ বা বয়স নিয়ে কোনো বাধা আছে কি না। কিন্তু যখন দেখা গেল তা বিশ্বাবাসীর সবার জন্য উন্মুক্ত, তিনি আবেদন করে বসেন। তারপর তো শুধু দিন গোনা আর এগিয়ে যাওয়া। লুলু ফেরদৌসের বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নে। তার বাবা ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক পরিচালক ওবায়েদুর রহমান খান। মা রেজিয়া সুলতানা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (আইইউবি) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। লুলুর একমাত্র ছোট ভাই ইমরান সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা করছে। লুলুর দাদা প্রয়াত আবদুল মান্নান খান ৪০ বছর যাবত বালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। লুলুর মা অধ্যাপক রেজিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমার মেয়ে প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছে জেনে ভালো লাগছে। তবে চূড়ান্ত ধাপের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ভাগ্য ভালো হলে নিশ্চয়ই সে চারজনের একজন হবে।’ মঙ্গলযাত্রায় নির্বাচিত হন বা না হন তিনি উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে চান লুলু ফেরদৌস। তবে ওই মিশনটি তার জন্য তাত্পর্যপূর্ণ এক মিশন হতে পারে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। ফেরদৌস আরও বলেন, অবশেষে যদি মার্স ওয়ানের জন্য নির্বাচিত হয়েই যান তাহলে এটাই প্রমাণিত হবে যে, কোনো দেশের সীমানার মধ্যে স্বপ্ন সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশি এই হার না মানা নারীর প্রতি রইল শুভকামনা। লুলু ফেরদৌস ডাকনাম :লুলু জন্মস্থান :ঢাকা মায়ের নাম :রেজিয়া সুলতানা বাবার নাম :ওবায়েদুর রহমান খান প্রথম স্কুল :ভিকারুন্নেসা স্কুল সাফল্যের সংজ্ঞা :স্বপ্ন সীমাবদ্ধ নয়, স্বপ্ন বাস্তবায়নই সাফল্য।