বঞ্চিতদের সামাজিকীকরণের প্রচেষ্টায়

পেশায় তিনি ইঞ্জিরিয়ার। তিন এখন আবার ঢাকা পলিটেকনিকের শিক্ষক। এর পাশাপাশি তিনি কাজ করে যাচ্ছেন বঞ্চিত মানুষের সেবায়। সুবিধা বঞ্চিত কয়েক শ ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ভার তিনি তুলে নিয়েছেন নিজ কাঁধে। আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োগ করা এই সম্মানীর মানুষটির নাম ইঞ্জিরিয়ার জি.সি. মজুমদার। তার গল্প শোনাচ্ছেন আহসান রনি তখন তিনি প্রাইমারি স্কুলে পড়েন। মধুমতী নদীর পাশে তার বসবাস। প্রতিদিন ঘুরতে যান নদীর পাড়ে। একদিন দেখলেন এক নারী নদী থেকে কলসিতে পানি নিয়ে বন্ধুর নদীর পাড় বেড়ে রাস্তায় উঠতে গিয়ে আছাড় খেলেন এবং পানিতে পড়ে গেলেন। শুনলেন প্রায়ই নাকি এ রকম ঘটনা ঘটে। কারণ নদীতে কোনো ঘাট নেই। তখনই তিনি চলে গেলেন বাড়িতে। বাড়ি থেকে দোকাল নিয়ে নদীর পাড় কেটে কেটে সিঁড়ি তৈরি করে ফেললেন। দুইদিন পর সেই পাড়ও ভেঙে গেল। ছোট্ট সেই বালক আবারও পাড় কাটতে নদীর পাড়ের দিকে ছুটলেন। এ রকমভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবসেবা করে গেছেন তিনি। পাঁচ ভাই ও ৪ বোনের সংসারে থাকলেও তার প্রতি সবার আলাদা নজর ছিল। ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে জীবনের শেষ একাডেমিক পরীক্ষা পর্যন্ত প্রতিটিতে প্রথম হয়েছেন তিনি। তাকে হারাবে সাধ্য কার! মা তাকে ডেকে নিয়ে নীতিবাক্য শেখাতেন। মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার জন্য বলতেন, মানুষের সেবা করতে বলতেন। পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার উপদেশ দিতেন। মায়ের প্রতিটি আদেশ-নিষেধ মেনে চলেছেন এই সমাজ সেবক। বেড়ে উঠেছেন নড়াইলে। সেখানে কামঠানা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির শরত্ থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে মাইকেল বা সুকান্ত, প্রায় সব বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন তিনি। জ্ঞান অর্জনই ছিল তার প্রধান ও একমাত্র নেশা। সাথে ছিল মানুষের সেবার কাজ করার ব্রত। চাকরির বেতনের টাকা দিয়ে নিজে গ্রামে কেটে দিলেন বিশাল এক পুকুর। অনেকে বিরোধিতা করল, অনেকে পাগল বলে ডাকল। কিন্তু পুকুরহীন গ্রামে একটি পুকুর খনন থেকে তাকে দূরে সরাতে পারল না কেউ। দীর্ঘ ২০ বছরের প্রচেষ্টার পর তিনি নিজ গ্রাম ও আশপাশের ২৬ কিমি এলাকা বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করেছেন। ২০০৬ সালের দিকে যশোরের ৯৬টি গ্রাম পানিতে ডুবে থাকত। সরকারের কাছ থেকে ৭৩ কোটি টাকা অনুদান নিয়ে নদী কাটানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। টাঙ্গাইলের সখীপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটিকে বর্তমানে সরকারি বিদ্যালয়ের রূপ দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় বস্তির ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার জন্য সামাজিক বিশ্ববিদ্যালয় বা কমিউনিটি ইউনিভার্সিটি খুলেছেন তিনি। তিনি জানালেন দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে ব্যবসার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে, এরই প্রতিবাদ হিসেবে নিজ অর্থায়নে ও নিজ প্রচেষ্টায় তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, শিক্ষক ও অর্থদাতা তিনি নিজেই। তিনি এখানে বস্তির কয়েক শ ছেলে-মেয়ের প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রদানের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি এখানেই থেমে নেই। আরও দুটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছেন। এর একটি হবে খুলনায় ও অপরটি হবে মাদারিপুরে। খুলনার বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য ইতোমধ্যে ২৫ বিঘা জমি পেয়ে গেছেন তিনি। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ই ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে ঢাকা তেজগাঁওয়ে বসবাস মানবতার সেবায় নিজেকে উত্সর্গ করে দেওয়া এই মানুষটির। তিনি ঢাকা পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ও রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং বিভাগে বিভাগীয় প্রধান ও চিফ ইন্সপেক্টর। এখান থেকে যে বেতন পান তা দিয়ে সংসার ও সমাজ সেবা করেন তিনি। সারাজীবনে অসত্ পথে একটি পয়সাও আয় করেনি । মানবসেবার কাজে তিনি তার পরিবারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা পান। পরিবারকে সময় দিতে পারেন না বলে তার পরিবারের অনেক অভিযোগ থাকলেও তারা তাকে সবসময় উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যান। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আট নম্বর সেক্টর থেকে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনি। তার মধ্যে তাই গভীর দেশপ্রেম। তিনি প্রত্যাশা করেন তরুণ প্রজন্ম দেশকে ভালোবাসবে এবং দেশ ও সমাজের কল্যাণে সবসময় কাজ করে যাবে। তার বড় ছেলে বুয়েটে এবং ছোট ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ছে। তিনি চান তার ছেলেরাও মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করুক। তারা ভালোমানুষ হবে গড়ে উঠুক এবং তার অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পূর্ণ করুক। মানবসেবায় অন্তপ্রাণ এই মানুষটি তার মানবসেবা সফলতার সাথে চালিয়ে যান এই প্রজন্মের পক্ষ থেকে এই শুভকামনা রইল তার জন্য। ইঞ্জিনিয়ার জি সি মজুমদার, জন্ম তারিখ ও স্থান :১৬ জানুয়ারি, নড়াইল। মায়ের নাম :শ্রীমতি শৈলা কালা মজুমদার। বাবার নাম :মৃত মন্মথ মজুমদার প্রথম স্কুল :কালনা-কামঠানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :বঙ্গবন্ধু, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষ বসু, মাহাত্মগান্ধী, চে গুয়েভারা, নেলসন ম্যান্ডেলা, বারাক ওবামা প্রিয় উক্তি :নীতির প্রশ্নে আপস করা যাবে না প্রিয় পোশাক :সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, ফরমাল ড্রেস অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, পুরো দিনের গান শুনে, লেখালেখি ও দুঃখী মানুষ নিয়ে চিন্তা করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :কোনো স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়াই সাফল্য।