মুজিব বাইয়া যাওরে—

আজ ১৭ই মার্চ জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৫তম জন্মদিন। বৃটিশ ভারতে গোপালগঞ্জের এক অজপাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ শেখ লুত্ফুর রহমানের ঘর আলো করিয়া যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হইয়াছিল কালক্রমে সেই যে একদিন এই অঞ্চলের দারিদ্র্যক্লিষ্ট অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুক্তিদূত হিসাবে আবির্ভূত হইবেন তাহা কে ভাবিতে পারিয়াছিল? টুঙ্গিপাড়া তখন এতদঞ্চলের অসংখ্য অবহেলিত গ্রামের মতই একটি গ্রাম। সেই গ্রাম ধন্য হইয়াছে ইতিহাসের রাখাল রাজা শেখ মুজিবকে নিজ অঙ্কে ধারণ করিয়া। রবীন্দ্রনাথের ভাষা ধার করিয়া বলা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ‘সদ্যই প্রাণের প্রান্ত পথে উঠেছে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে মরণের ছাড়পত্র নিয়ে।’ কে না জানে যে, আশৈশব মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও সহজাত টান অনুভব করিয়াছেন তিনি। মানুষের অসহায়ত্ব, দুঃখ-বেদনায় সদা কাতর থাকিয়াছে তাঁহার মন। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইবার প্রেরণা তিনি জন্মগতভাবেই লাভ করিয়াছিলেন। মানুষে মানুষে বৈষম্য-ভেদনীতি এবং শোষণ-বঞ্চনা সেইদিনের সেই তরুণ শেখ মুজিবের চিত্তে ভিসুভিয়াসের অগ্নিদাহ সৃষ্টি করিয়াছিল। আর সকল ভ্রূকুটিকে অগ্রাহ্য করিবার শক্তি ও সাহস তাহাকে সেই তরুণ বয়সেই সকলের নিকট প্রিয় করিয়া তুলিয়াছিল। এইসব কারণেই অবিভক্ত বাঙলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মত ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টি তাঁহার উপর নিবদ্ধ হইতে দেরী হয় নাই। ‘আঠারো বছর বয়স যে দুঃসহ/এ বয়স কভু মাথা নোয়াবার নয়’- তরুণ শেখ মুজিব যেন কবির এই চয়নেরই প্রদীপ্ত প্রকাশমান রূপ। তাই তরুণ শেখ মুজিব শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সুশীতল স্নেহাস্পর্শে বাড়িয়া উঠিয়াছেন তেজ-শক্তি-সাহস ও দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার বরপুত্র রূপে। কলিকাতায় ছাত্রাবস্থায় তাঁহাকে সাইমুমের বেশে আবির্ভূত হইতে দেখা গিয়াছে। মুসলিম বাঙলার তরুণ নেতৃত্বের অন্যতম কর্ণধার তখন তিনি। তরুণদের মাঝে সকল কাজের কাজী রূপেই তাহাকে দেখা গিয়াছে তখন। বিস্ময়কর এক ধূমকেতুর ন্যায় বাঙলার রাজনৈতিক আকাশে আবির্ভূত হইবার প্রস্তুতিপর্ব চলিতেছিল তখন তাঁহার জীবনে। একদিন তিনি যে প্রাতঃস্মরণীয় এবং সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে বাঙলার ভাগ্যাকাশে বিরাজ করিবেন ইহা শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সেইদিন ঠিকই বুঝিয়াছিলেন এবং তাই তাঁহাকে অপত্য ও পুত্রাধিকস্নেহে গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনে শহীদ সাহেবের অন্যতম প্রধান সৈনিক হিসাবে তিনি কর্মচঞ্চল থাকিয়াছেন আর পাকিস্তান অর্জিত হইবার পর শাসকগোষ্ঠীর অবিমৃষ্যকারিতা ও হঠকারিতামূলক আচরণে ব্যথিত ও বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছেন। অতঃপর গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম-আন্দোলনের পথে অবিশ্রান্তভাবে হাঁটিয়া গিয়াছেন; জেল-জুলুম-নির্যাতন কিংবা কোন প্রকার রক্তচক্ষুই তাঁহার চলার গতিতে বাদ সাধিতে পারে নাই। সমুদ্র অভিযাত্রী নদীর চলার গতি সহসা মরুস্তরে ব্যাহত হইলে উহা আপন নিয়মেই তাহার পথ খুঁজিয়া লয়। শেখ মুজিবুর রহমানও বরাবরই যেন বাঙলার সেই প্রমত্ত প্রবল সলিল কন্যার মতই দুই কূল ছাপাইয়া বহিয়া চলিয়াছেন আজীবন। পাকিস্তান অর্জিত হইবার পর তাঁহার যে মোহভঙ্গ ঘটে উহার পরিণতিতে অন্য এক শেখ মুজিব এই বাঙলায় ধূমকেতুর মত পুচ্ছ নাচাইয়া সকল অনাচার-অবিচার দূর করিবার প্রতিশ্রুতি কণ্ঠে ধারণ করিয়া আগাইয়া আসিয়াছিলেন। আর তাহার এই অনন্য সাধারণ চলায় বিমুগ্ধ জাতি তাঁহাকে বঙ্গবন্ধু রূপে বরণ করিয়া নিয়াছে। জলদ গম্ভীর কণ্ঠ, শালপ্রাংশু দেহবল্লরী, অসম সাহস, প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব আর দেশ মাটি ও মানুষের প্রতি অতলস্পর্শী মমত্ববোধ কালক্রমে তাঁহাকে আমাদের ত্রাণকর্তায় পরিণত করিয়াছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জন্মদাতা তিনি। নিজের জীবন অকাতরে বিসর্জন দিয়া তিনি একটি দেশ একটি জাতি রাষ্ট্র তৈরির অঙ্গীকার রক্ষা করিয়া গিয়াছেন। আর এইখানেই তাঁহার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং ব্যতিক্রমী অবস্থান। জীবনের সোনায় মোড়ানো দিনগুলি তাঁহার কাটিয়াছে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে। হতভাগ্য দেশের মানুষের মুক্তির দিশারীরূপে তিনি যে ত্যাগ তিতিক্ষার এবং সংগ্রামের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন তাহা জাতিগতভাবে আমাদেরকে গৌরবান্বিত করিয়াছে। আমরা একাত্তরে যে শেখ মুজিবকে দেখিয়াছি সেই মুজিব যেন সেইদিনের সাড়ে সাতকোটি প্রত্যয়দৃঢ় বাঙালির দুর্জয় সাহসের মূর্তিমান প্রকাশ। গোটা জাতি তাই সেইদিন তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া সদম্ভে গাহিয়া উঠিয়াছে, ‘মুজিব বাইয়া যাওরে/নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাওরে মুজিব বাইয়া যাওরে’। টুঙ্গিপাড়ার অজপাড়াগাঁর শেখ মুজিব এমনিভাবে তাহার ৫১ বছর বয়সে একটি দেশের স্রষ্টা হইয়া উঠিয়াছেন জীবনপাত সংগ্রামের মাধ্যমে জাতির আশা পূরণের দ্বারা। জীবনভর নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম-সাধনা তাঁহাকে অগ্নিগর্ভ সূর্য সম্ভাবনায় ভাস্বর করিয়াছে, অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করিয়াছে। আমাদের জাতিসত্তার মধ্যকার সুপ্ত তেজে, দেশপ্রেম, সাহস, সততা, দৃঢ়চিত্ততা ইত্যাদি সদগুণাবলীর সুষমামণ্ডিতরূপ শেখ মুজিব তাই কাল হইতে কালান্তরে, যুগ হইতে যুগান্তরে, প্রজন্ম হইতে প্রজন্মান্তরে অপার্থিব প্রেরণারূপে বিরাজ করিবেন। তাঁহার আলোতে আমরা পথ চলিতেছি, চলিবও চিরকাল।