স্মরণ
হামিদা খানম আলোকিত সমাজের কারিগর
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৪, ২১:৪১
হামিদা খানম এদেশের একটি আলোকিত নারী সমাজ গড়ে তোলার জন্য তার সমস্ত মেধা, প্রজ্ঞা, সৃষ্টিশীলতাকে নিবেদন করে গেছেন। তার নিরন্তর পথ চলা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীকে পরিপূর্ণ বিন্যস্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে উপমহাদেশীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক, সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন আর এটি সম্ভব হয়েছিল এক শিক্ষিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠার কারণে। উদার, অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত চিন্তার এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যই নানা ক্ষেত্রে আলোকিত, বর্ণাঢ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল ধারক এবং বাহক। স্বামী ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. সালাহউদ্দিন আহমদ, খালা কবি মাহমুদা সিদ্দিকা, ভাই প্রখ্যাত সুরকার গীতিকার রবীন্দ্র সংগীত বিশেষজ্ঞ আব্দুল আহাদ ও ছোট বোন পথিকৃত্ নারী আলোকচিত্রী সাঈদা খানম।
বাবা মরহুম আব্দুল সামাদ খাঁ ছিলেন সরকারি স্কুলের পরিদর্শক। ফরিদপুর তাদের আদিবাড়ি কিন্তু চাকরির কারণে তার পুরোটা জীবন কেটেছে রাজশাহী ও পাবনাতে। পাবনায় তখন মেয়েদের কোন স্কুল না থাকায় হামিদা খানমকে পড়তে হয়েছে গোপালচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামক ছেলেদের স্কুলে। পূর্ব বাংলার মফস্বল শহরের শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মেধাবী ছাত্রীটি তখন চারপাশের জীবন ও প্রকৃতি দেখেছেন চির চেনা জগতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিয়ে, মিশিয়ে। দেশ ও মানুষের জন্য ভালোবাসার মূল সুরটি তখন তিনি আস্বাদন করেছেন হূদয়ের গভীর থেকে। বিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে চল্লিশের দশকে চলে যান কলকাতায়। বেথুন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন ঐতিহ্যবাহী লেডী ব্রেবোর্ণ কলেজকে। ইতিমধ্যে দেশ বিভাগের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। হামিদা খানম কলকাতা থেকে শিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে ১৯৪৭ সালের ২২ আগস্ট চলে যান বিলেতে আরো উচ্চতর ডিগ্রী গ্রহণের জন্য। এর পূর্বে তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে যোগদান করার নির্দেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু লন্ডনে পড়তে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ায় তখন তিনি লন্ডনে যাওয়াকেই অগ্রাধিকার দেন। লন্ডনের পড়া শেষে দর্শন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে তিনি ১৯৪৯ সালে ইডেন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে যখন কর্মরত তখন তিনি জানতে পারলেন, ঢাকায় একটি হোম ইকনোমিক্স কলেজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি অধ্যক্ষার পদের জন্য আবেদন করেন এবং ১৯৫৯ সালে তিনি এই পদে যোগদান করার সুযোগ পান। এর পরপরই তাকে আমেরিকায় যেতে হয় হোম ইকনোমিক্সের প্রশাসন বিষয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য।
১৯৬০ সালে দেশে ফিরে তিনি এই ব্যতিক্রমধর্মী কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন হোম ইকনোমিক্স বিষয়টি বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য জীবন ও মননের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। এটি হবে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি নতুন সংযোজন। এই কলেজের ছাত্রীরা কর্মজীবনের দক্ষতার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে যাতে সমৃদ্ধ করতে পারে সেই লক্ষ্যেই এর পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। শুরু থেকেই এ কলেজকে তাই Professional Institution for Women বলে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৬৯ সালে এই শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ‘ঝরা বকুলের গন্ধ’ নামে একটি অনবদ্য স্মৃতি আলেখ্য রচনা করেন যাকে সমাজ সত্যের অনুপম দলিল হিসেবে অভিহিত করা যায়। এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবন অভিজ্ঞতা। সুললিত ভাষায় লেখা সুখপাঠ্য এই বইটিতে বিভিন্ন সময়ের স্মৃতিগুচ্ছ, কাব্যিক, প্রাঞ্জল ভাষায় সন্নিবেশিত হয়েছে, কালের নিরিখে যার মূল্য অপরিসীম। তার সব কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এ সত্যই প্রতিভাত হয় তিনি শুধু একজন কর্মোদ্যোগীই ছিলেন না এর নেপথ্যে একটা দর্শনও ছিল তাঁর। তাঁর মৃত্যুর পর তাই মনে হয়েছে বহু সম্মানে ভূষিত এই মানুষটি তার সেরা সম্মান পেতে থাকবেন নারী সমাজের স্নেহ, ভালোবাসা ও চোখের জলের মাঝে। শিক্ষা ও সমাজকর্মের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব ২০১১ সালের ১৮ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আজ তাঁকে স্মরণ করছি।
লেখক :সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী