সড়ক-মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ গতিরোধক

আমাদের মহাসড়কগুলি এমনিতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। ইহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুতর সমস্যাটি হইল নিরাপত্তা। দ্রুতগামী যানবাহনের অবাধ ও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা এইসব মহাসড়ক নির্মাণের মূল লক্ষ্য হইলেও সামগ্রিক পরিকল্পনায় তাহার ছাপ নাই বলিলেই চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গ্রামগঞ্জের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সড়কও সরাসরি ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে যুক্ত করা হইয়াছে মহাসড়কের সাথে। ফলে অনভিপ্রেত যানজটের পাশাপাশি তৈরি হইয়াছে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। সেই সাথে সমগ্র মহাসড়ক জুড়িয়া অবৈধভাবে গড়িয়া উঠা হাটবাজার, বিভিন্ন সমিতি-সংগঠনের দপ্তর এবং রিকশা, টেম্পু ও বাসসহ নানারকম যানবাহনের স্ট্যান্ড তো আছেই। ময়লার ভাগাড়ও দেখা যায় বেশকিছু স্থানে। অধিকাংশ মহাসড়কে অবাধে চলিতেছে নসিমন-করিমনের মতো শ্লথগতির অননুমোদিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে অযান্ত্রিক বহু যানবাহনও। সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছে যত্রতত্র অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত গতিরোধক। বৈধ গতিরোধকের সংখ্যাও একেবারে কম নহে। বৈধ-অবৈধ যাহাই হউক, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গতিরোধকগুলি দৃশ্যমান করিবার কোনো উদ্যোগ যেমন নাই, তেমনি এইসব গতিরোধক নির্মাণে অনুসৃত হয় নাই যথাযথ নিয়মকানুনও। সর্বোপরি, নাই সতর্কতামূলক কোনো চিহ্ন বা নির্দেশনা। ফলে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে নির্মিত হইলেও গতিরোধকগুলি সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন ও যাত্রীদের জন্য ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হইয়াছে। বাড়িয়া চলিয়াছে দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে বিষয়টি জানেন না এমনও নহে। বিগত বত্সরগুলিতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সহিত সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের যতো সভা অনুষ্ঠিত হইয়াছে—প্রায় সকল সভাতেই বিষয়টি আলোচিত হইয়াছে। মহাসড়কগুলিকে ঝুঁকিমুক্ত করিবার জন্য গৃহীত হইয়াছে নানা সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবায়িত হইয়াছে তাহার অতি সামান্যই। বরং এই সময়ে অবৈধ গতিরোধক যতো না অপসারিত হইয়াছে, নির্মিত হইয়াছে তাহার কয়েকগুণ বেশি। এমনকী উপেক্ষিত হইয়াছে সতর্কতাসূচক চিহ্ন বা সংকেতের মাধ্যমে গতিরোধকগুলি দৃশ্যমান করিবার অতি জরুরি কাজটিও। তাহার মাশুলও কম দিতে হয় নাই জনগণকে। স্বস্তিকর সংবাদটি হইল, অবশেষে অপ্রয়োজনীয় গতিরোধক অপসারণের কাজ শুরু হইয়াছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’র অংশ হিসাবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ গত রবিবার হইতে মানিকগঞ্জ-সিঙ্গাইর-ঢাকা সড়কে এই কার্যক্রম শুরু করিয়াছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বীকার করিয়াছেন যে, এইসব অপ্রয়োজনীয় গতিরোধকের কারণে দুর্ঘটনার পাশাপাশি চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটিতেছে প্রায়শ। আমরা আশা করি, উদ্যোগটি কেবল একটি সড়কেই সীমাবদ্ধ থাকিবে না। দেশের সকল সড়ক-মহাসড়ক হইতে অপ্রয়োজনীয় গতিরোধক অপসারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি যথাযথ সতর্কচিহ্ন বা সংকেতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় গতিরোধকসমূহ দৃশ্যমান করিয়া তোলাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। তবে সড়ক-মহাসড়কগুলিতে দীর্ঘদিন যাবত্ যেই বিশৃঙ্খলা চলিয়া আসিতেছে তাহা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সকল উদ্যোগই বিফলে যাইতে বাধ্য। এই ক্ষেত্রে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টি এড়াইয়া যাওয়া বাস্তবিকই কঠিন। কারণ কথাটি বেপরোয়া যানবাহনের ক্ষেত্রে শুধু নহে, শৃঙ্খলাবিমুখ জনসাধারণের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।