রাশিয়ার ঝাঁপ অগ্নিতে, না কি অন্য পরিকল্পনা
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২১:২১
কৃষ্ণ সাগরের ছোট উপদ্বীপ ক্রিমিয়া। তাহা এক্ষণে বিশ্ব আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। সেইখানে এখন বাজিতেছে দুই দশক পূর্বের সোভিয়েত-যুগের গান। ‘আমরা মুক্ত,’ ‘আমরা মুক্ত’ শ্লোগান-চিত্কারে মাতোয়ারা রুশপন্থি ক্রিমিয়ার অধিবাসীরা। ক্রিমিয়া নহে, বলা যায়, সমস্যা আবর্তিত হইতেছে ইউক্রেন লইয়া। অতি সংক্ষেপে বলিলে, ইউক্রেনে কাহাদের শক্তিবলয় বিরাজ করিবে—রাশিয়া, নাকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের—সেই রেষারেষিতেই দুই দশক ধরিয়া অনভিপ্রেত টানাপোড়েনে আটকে ছিল ইউক্রেন। সমপ্রতি রুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ জনবিক্ষোভের মুখে পলায়ন করিলে দৃশ্যত মনে হইতেছিল, রাশিয়ার বুঝি দাঁতের কোণা ভাঙিল। তাহার পর অসম্ভব তত্পরতার সহিত রাশিয়া যাহা করিল তাহাতে পুরা বিশ্ব যেন দুইভাগে বিভক্ত হইয়া গেল। গত ১৬ মার্চের বিতর্কিত গণভোটের পর ক্রিমিয়ার রুশপন্থি নেতারা জানাইয়াছেন, ক্রিমিয়ার ৯৭ শতাংশ মানুষ রায় দিয়াছেন রাশিয়ার সহিত যুক্ত হইবার পক্ষেই।
ক্রিমিয়াকে একটুখানি বুঝিয়া দেখা যাক। রাজনৈতিক মানচিত্রে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অংশবিশেষ হইলেও সাংবিধানিকভাবে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ভোগ করিয়া আসিতেছে। শতকের পর শতক ধরিয়া সাম্রাজ্যবাদীদের ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হইয়াছে ভূখণ্ডটি। যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে সর্বাধিককাল অবস্থান করিবার ইতিহাস রহিয়াছে টার্কিভাষী মোঙ্গলীয়দের। তাহারা স্থানীয়দের মধ্যে মিশিয়া ‘ক্রিমিয়ান তাতার’ জাতিগোষ্ঠী সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬ সালে রাশিয়া এবং ইউরোপের (ব্রিটেন, ফ্রান্স, তুরস্ক মিলিয়া) যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় ক্রিমিয়া। বিংশ শতকে ক্রিমিয়া পরিণত হয় রাশিয়ান, ক্রিমিয়ান তাতার, ইউক্রেনিয়ান এবং ইহুদিদের মিলিত আবাসভূমিতে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের পূর্বে গৃহযুদ্ধ শুরু হইলে ক্রিমিয়াতেও সংঘর্ষ ছড়াইয়া পড়ে। ১৯৫৪ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ইউক্রেন প্রশাসনকে প্রশাসনিক কার্যনির্বাহের সুবিধার্থে ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে ‘উপহার’ দেন। তবে উপদ্বীপটির সেভাস্টোপোল শহরে রাশিয়ান নৌঘাঁটি বহাল থাকিবার ফলে নব্বইয়ের দশক ইউক্রেন স্বাধীন হইবার পরও তাহা রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করে।
ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী সার্বভৌম দেশ হিসাবে তাহার কোনো অঞ্চল লইয়া বিশেষ সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হইলে ‘গণভোট’ অনুষ্ঠিত হইতে হইবে সমগ্র ইউক্রেনে। তাই ক্রিমিয়ার এই ‘আঞ্চলিক’ গণভোট ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী অবৈধ। ইউক্রেন ১৯৯৯ সালে ক্রিমিয়ার জন্য পৃথক সংবিধান কার্যকর করিলেও ইউক্রেনের সংবিধানের ১৩৫ ধারায় বলা আছে যে, ক্রিমিয়ার সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে ইউক্রেনের পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগিবে। তাই ক্রিমিয়া এক্ষণে গণভোটের আলোকে নিজেকে ‘স্বাধীন’ ঘোষণা করিলেও ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী তাহার বৈধতা নাই।
তবে বিশ্বের কোনো অঞ্চল নিজেকে ‘স্বাধীন’ করিতে চাহিলে তাহাকে নানাবিধ ‘অবৈধ’ পরিক্রমার ভিতর দিয়াই যাইতে হয়, তাহা ব্যতীত কোনো পথ খোলা রাখাও হয় না। গভীর তাত্পর্যের একটি দিক হইল, ক্রিমিয়ার রুশপন্থি জনগণ জয়োল্লাসে যে পতাকা উড়াইতেছে তাহা বর্তমান রাশিয়ার নহে, দুই দশক পূর্বের অখণ্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের। তবে কি ইহা আরও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার অংশ, যাহা নূতন বিন্যাসে জন্ম দিতে চেষ্টা করিতেছে মৃত সোভিয়েত ইউনিয়নকে? তাহা কি এই বিশ্বকে নূতন করিয়া পুরানো স্নায়ুযুদ্ধের দিকে ঠেলিয়া দিবে? দৃশ্যত মনে হইতেছে, রাশিয়া এক পা পিছাইয়া লম্বা লাফ দিল। সেই লাফঝাঁপ অগ্নি অভিমুখে, নাকি কিনারা হইতে খাদ অতিক্রমের পথে—তাহা এখনই বলা সহজ নহে।