কেন এই অশুভ ছায়া

সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ১০ বিলিয়ন টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৯ বিলিয়ন টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৭২ অনুযায়ী ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ব্যাংক অব বাহাওয়ালপুরকে অধিগ্রহণ করে সোনালী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৭ সালের ৩ জুন এটি নিবন্ধিত হয় পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসাবে। যেসব স্থানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো শাখা নেই সেসব স্থানে সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশের সরকারি কোষাগারের দায়িত্ব পালন করে থাকে। ব্যাংকটি স্ট্যাম্প শুল্ক, খাজনা এবং নিবন্ধীকরণ ফি আদায় করে থাকে, বিশেষ সঞ্চয়ী হিসাব পরিচালনা করে, সরকারি কর্মচারীদের পেনশন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করে থাকে। সোনালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এর ওপর থেকে অশুভ ছায়া কাটছে না মোটেই। এ যাবত্ বড় বড় আর্থিক যে কেলেঙ্কারি ঘটেছে সেগুলোর বেশিরভাগই সোনালী ব্যাংককে ঘিরে। হলমার্কের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লুটের ঘটনায় সারাদেশে হৈচৈ পড়ে যায়। সাধারণত আমাদের দেশে সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে লুটপাটের মৃগয়াক্ষেত্র বলে ভাবা হয়। দেশের বৃহত্তর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংক এ ঐতিহ্যের বাইরে থাকবে এমন প্রথাবিরুদ্ধ অবস্থা কল্পনা করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন। বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেখানে আঙুল ফুলে কলাগাছের রূপ ধারণ করছে, সেখানে সরকারি আনুকূল্য পেয়েও সোনালী ব্যাংককে জিইয়ে রাখা হয়েছে কোরামিন দিয়ে। বলা হয়, এ ব্যাংককে ফতুর করতে সদা প্রস্তুত সরকার কর্তৃক নিয়োজিত চাপিয়ে দেওয়া ব্যক্তিরা। ব্যাংক কর্মচারীদের মহাক্ষমতাধর ইউনিয়নও এক্ষেত্রে দোসরের ভূমিকা নাকি পালন করে। এসব অভিযোগ কতটা সত্যি তা একমাত্র যথাযথ পোস্টমর্টেমের মাধ্যমেই জানা যেতে পারে। লুটপাটের মৃগয়াক্ষেত্র হিসেবে সোনালী ব্যাংকের ঐতিহ্য জেনেই সম্ভবত হলমার্কসহ লুটেরা চক্র এ ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা লোপাটের সাহস পেয়েছে। ভদ্রবেশী চোরদের পাশাপাশি সুড়ঙ্গ কাটা চোররাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সোনালী ব্যাংককে লোপাট করতে। কয়েক মাস আগে সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখা থেকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লোপাট করা হয় সুড়ঙ্গ কেটে। সে ঘটনার রেশ না কাটতেই বগুড়ার আদমদীঘিতে সুড়ঙ্গ করে সোনালী ব্যাংকের ৩২ লাখ টাকা লুট হয়েছে। লুটেরা আর চোরেরা সোনালী ব্যাংককে লোপাট করার জন্য টার্গেট করেছে এ ব্যাংকের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকে। ব্যাংক কর্মচারীদের একাংশ গ্রাহক বা সঞ্চয়কারীদের স্বার্থরক্ষার বদলে লুটেরাদের কাছে নিজেদের বিবেককে জিম্মি করায় এ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে লোপাট করা নাকি সহজ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন কৃষক পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিতে গেলে তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো হয়। কিন্তু শত শত কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে। ব্যাংকের সত্ ও নিবেদিত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য বিড়ম্বনা ডেকে আনছে এ বিপর্যয়ের ঘটনা। সোনালী ব্যাংক রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর্থিক লেনদেন সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংক। সারাদেশে সোনালী ব্যাংকের শাখা যেভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং বড় আকারের যে লেনদেন হয় তাতে এই ব্যাংকটির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখা জরুরি। সোনালী ব্যাংকের ওপর আস্থা-অনাস্থার ব্যাপারটি দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কাজেই ব্যাংকটিতে যে অশুভ ছায়া ভর করছে তা দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ শুধু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিষয়টি প্রকাশ করেই খালাস। তারা এই দুর্বলতা দূর করতে কী ব্যবস্থা নিয়েছে সেটি সাধারণ মানুষকে জানানো দরকার—বিশেষ করে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের কেউ অনৈতিক কোনো কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের মানুষ সোনালী ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে দেখতে চায়। দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এটি জরুরি। আমরা মনে করি বগুড়ার আদমদীঘির চুরি বা ডাকাতির ঘটনা উদ্ঘাটন শুধু নয়, কেন বার বার সোনালী ব্যাংককে চৌর্যবৃত্তির জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে তারও কারণ উদ্ঘাটিত হওয়া দরকার। যেসব দুর্বলতার কারণে লুটেরারা সুযোগ পাচ্ছে তা বন্ধেরও ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকা