জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কি চলতেই থাকবে?
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২১:২৩
ফরমালিনের রাহু থেকে কিছুতেই মুক্তি মিলছে না আমাদের। ফলমূল যাই খাই না কেন, মনে হয় বিষ খাচ্ছি না তো? আর মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফরমালিনের দৌরাত্ম্য আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি। রাজধানীর বাজারগুলোতে তো বটেই দেশের বাইরে সর্বত্রই ফরমালিনযুক্ত খাবার। কিছুতেই ফরমালিন নামক এই বিষের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। যেন ফরমালিন অপ্রতিরোধ্য!
ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না মাছ-মাংস, ফলমূল, দুধে ফরমালিন ব্যবহার। পণ্য টাটকা দেখাতে এ রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়ছে তো বাড়ছেই। ফরমালিন অতি মাত্রায় শক্তিশালী রাসায়নিক দ্রব্য। মানবদেহে ফরমালিনের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১৬ পিপিবি। ১০০ কোটি লিটার পানিতে মাত্র ৩০ লিটার ফরমালিন মেশালেও ওই পানি শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। ফরমালিন পানি, বায়ু ও অন্যান্য পদার্থের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারে। বিশেষ করে পানিতে ফরমালিন সহজেই মেশে বলে এর যথেচ্ছ ব্যবহার হয়।
দেশের সর্বত্র বিভিন্ন ধরনের ফলমূলে ক্ষতিকারক ফরমালিন মিশিয়ে বিক্রির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেলেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। মাঝেমধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও এক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত হচ্ছে—গত প্রায় এক দশক ধরে বাজারে যেসব ভোগ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে তার শতকরা ৫০ ভাগই ভেজাল। ফরমালিন ও রাসায়নিক শুধু মাছ, মাংস ও সবজিতেই ব্যবহার করা হচ্ছে না; মৌসুমি ফলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে। গম, ডাল, তেল, চিনি, লবন, দুধ, কনডেন্সড মিল্ক, ঘি, মাখন, ফ্রুটজুস, ফ্রুটজেলি, সোডা পাউডার, কর্নফ্লাওয়ার প্রভৃতির সঙ্গে মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রঙ ব্যবহূত হচ্ছে। রাজধানীসহ সারাদেশে বাজারে ফরমালিন ছাড়া মাছ-মাংসের কথা ভাবাই যায় না। মাছ যাতে তাজা দেখায় এজন্য ব্যবহূত হচ্ছে বিষাক্ত রঙ। সর্বস্তরের মানুষ এসব মাছ-মাংস খেয়ে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাপন করছে। যে কোনো সময় তাদের জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্যে ভেজাল বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাছ-মাংসকে টাটকা ও শাকসবজিকে সতেজ দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ফরমালিনসহ নানা ধরনের রাসায়নিক। মাছ তাজা দেখানোর জন্য অনেক মাছেই সুকৌশলে ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত রঙ। প্রতিদিনই খাদ্যের সঙ্গে মানুষের পেটে যাচ্ছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন ও রাসায়নিক। ফলে সাধারণ রোগব্যাধি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সরকারের নেওয়া জনস্বাস্থ্য প্রকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কারণ একদিকে রোগ প্রতিরোধ প্রকল্প, অন্যদিকে নানাবিধ জটিল রোগব্যাধি ছড়ানোর যাবতীয় আয়োজন।
গবেষকদের মতে, দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, শিল্প-কলকারখানা, হাসপাতালগুলোতে বছরে ২৫ থেকে ৩০ টন ফরমালিন ব্যবহার হয়। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ফরমালিনের একাংশ খাদ্যদ্রব্যে মেশানো হচ্ছে। এ রাসায়নিকের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, আজকাল মাছ-মাংস ও ফলের দোকানে মাছি দেখা যায় না। এর ঢালাও ব্যবহারে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। ফরমালিনযুক্ত খাদ্য ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট, লিভার ক্যান্সার, অ্যাজমা ইত্যাদি রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্ধত্বের বিপদও সৃষ্টি করতে পারে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার গ্রহণের কারণে। গর্ভবতী মায়েদের জন্যও সৃষ্টি করতে পারে বড় ধরনের ঝুঁকি। দুধে ফরমালিন মেশানোর ফলে শিশুস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে মৌসুমি ফল বিক্রি বন্ধে হাইকোর্ট সরকারকে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আদালতের এ পদক্ষেপ জনমনে প্রশংসা কুড়ালেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গাফিলতি লক্ষণীয়। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ভেজালকারীরা এখন আর তাদের খুব একটা তোয়াক্কা করছে না। ভেজাল রোধে হাইকোর্টের ছয় দফা নির্দেশনার বাস্তবায়নসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বাড়ানোর কথা ভাবতে হবে। প্রয়োজনে বিচার বিভাগের আওতায় এ ধরনের আদালত গঠন করা যায় কিনা ভেবে দেখা উচিত। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে যে ভেজালকারীরা তাদের দমনে প্রশাসন আপসহীন ভূমিকা পালন করবে এমনটিই কাম্য।
ঢাকা