ডাক্তারের সহায় হচ্ছে গুগল গ্লাস
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৭
চিকিত্সা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে আধুনিক চিকিত্সার বহুলাংশই নির্ভরশীল প্রযুক্তির উপর। নতুন নতুন প্রযুক্তি পণ্যের আবির্ভাব এই ধারাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। কিছুদিন ধরেই পরীক্ষামূলকভাবে স্মার্টফোনের মাধ্যমে রোগীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের রোগ বিশ্লেষণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। এবারে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম এক উদ্ভাবন গুগল গ্লাস নিয়েও এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খবর মিলেছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধীনে পরিচালিত ম্যাসাচুসেটের বোস্টনে অবস্থিত বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের ডাক্তাররা এবারে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জরুরি বিভাগেই ব্যবহার শুরু করেছেন এই ডিভাইসটি। রোগীদের বিভিন্ন তথ্যে হ্যান্ডস-ফ্রি অ্যাকসেসের জন্যই এটি ব্যবহার করছেন তারা। তাদের বক্তব্য, শীঘ্রই এর ব্যবহার বাড়বে সবক্ষেত্রেই।
মূলত চিকিত্সাকেন্দ্রে গুগল গ্লাসের ব্যবহারে এই মেডিকেল সেন্টারটিই পথিবৃতের ভূমিকা পালন করছে। প্রাথমিকভাবে চারজন ডাক্তারের চোখে উঠে এসেছে গুগল গ্লাস। ডাক্তাররা তো বটেই, রোগীরাও খুশি নতুন এই প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবহারে।
গুগল গ্লাসের ব্যবহার প্রসঙ্গে বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ডা. জন হালামকা বলেন, ‘২০১৪ সালটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট যে স্বাস্থ্যসেবায় এখন আর ডেস্কটপ কম্পিউটার খুব একটা আদরণীয় নয়। গত বছর দুয়েক হলো এই খাতে ট্যাবলেট পিসির ব্যবহার নিয়ে একটা উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল। তবে এর চেয়েও গুগল গ্লাস অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যেই আমরা এটি সফলভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছি। আমরা ধারণা করছি, এ বছরে এসে আরও অনেকেই স্বাস্থ্যসেবায় গুগল গ্লাস ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠবে।’
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জরুরি বিভাগে কর্মরত একজন ডাক্তার হলেন স্টিভেন হর্ং। তিনিও অন্য তিন সহকর্মীর মতো ব্যবহার করছেন গুগল গ্লাস। জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালনের সময় নিয়মিতই এই প্রযুক্তি-চশমা পড়ছেন তিনি। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এর মাধ্যমে অনেক জটিল তথ্য বের করে নিয়ে আসা যায় বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। সম্প্রতি তার কাছে একজন রোগী এসেছিলেন যার মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং তার শরীরের অ্যলার্জি এবং বিভিন্ন ঔষধ সম্পর্কে জানাতে পারছিলেন না। ওই রোগীর কথা উল্লেখ করে ডা. হর্ং বলেন, ‘রোগীটি তার সংকটময় শারীরিক অবস্থার কারণে তেমন কোনো তথ্য জানাতে পারছিলেন না। তিনি কেবল মনে করতে পারছিলেন যে তার অ্যালার্জিজনিত কিছু সমস্যা রয়েছে। ওই রোগীর জানানো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তথ্য গুগল গ্লাসের সাহায্যেই বিশ্লেষণ করে তার শারীরিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যা বের করতে পারি।’ হর্ং বলেন, ‘গোটা একটি কম্পিউটার ওয়ার্ক স্টেশনে যে পরিমাণ তথ্য সংরক্ষিত থাকে, তার পুরোটাই আসলে গুগল গ্লাসের মাধ্যমে তত্ক্ষণিকভাবে জেনে নেওয়া যায়। ফলে পুরোনো কোনো রোগীর যাবতীয় তথ্য এই গ্লাসে চাওয়ামাত্রই পাওয়া সম্ভব। শুধু তাই নয়, গোটা মেডিকেল সেন্টারের সকল তথ্যই চোখের নিমেষে হাজির হয় গুগল গ্লাসে। ফলে এই ডিভাইসের ব্যবহার ডাক্তারকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।’
গুগল গ্লাসকে নিজেদের মেডিকেল সেন্টারে ব্যবহারের জন্য নিজেদের ডাটাবেজকেও খানিকটা নতুন রূপ দিয়েছে বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের প্রশাসন। এখানকার রোগীদের তথ্যগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে এগুলো খুব সহজেই গুগল গ্লাসের ছোট্ট ডিসপ্লেতে এঁটে যায়। তবে এসব তথ্যে মেডিকেল সেন্টারের বাইরের কেউ যেন অ্যাকসেস না পায়, তার জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তারা। হাসপাতালের ফায়ারওয়ালের মধ্যেই সুরক্ষিত রয়েছে এখানকার বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য। সুনির্দিষ্ট বারকোডের মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই গুগল গ্লাস। আর সেটি সক্রিয় হয়ে ওঠামাত্রই কোনো রোগীর সংরক্ষিত তথ্যে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যান ডাক্তার। ফলে তথ্য ঘেঁটে বের করার সময়টা রোগীর পেছনেই ব্যয় করা সম্ভব হয়।
এর মাধ্যমে আরও একটি সুবিধা পাওয়া যায় বলেও জানান পরিচালক হালামকা। সেটি হলো—ট্যাবলেট পিসির মতো মোবাইল ডিভাইস ব্যবহারের সময়ও হাতের স্পর্শ দিতে হয়। কম্পিউটারের কিবোর্ডের ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য। এর ফলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ঝামেলা থেকে একেবারেই মুক্ত গুগল গ্লাস। সে কারণেই এই গুগল গ্লাসকেই বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবিষ্যত হিসেবে মনে করছেন বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের ডাক্তাররা। তাদের মতো অনেক মেডিকেল সেন্টারই এর পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে। ভবিষ্যতের চিকিত্সা খাত হয়ত গুগল গ্লাসময় হয়ে উঠবে।