আলোকপাত

নারীর নিরাপত্তা

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার? এই ফরিয়াদ আজকের নয়, যুগ যুগ ধরেই নারী কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে আসছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী যে কেবল পণ্য, একথা মেনে নিতে সমাজসচেতন ভদ্রবেশী শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী কিংবা কর্তাব্যক্তিদের কোনও দ্বিধাবোধ হয় না, লজ্জায় একবারও মাথানত হয় না। অথচ নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরকই নয়, উভয়ে মিলেই ভারসাম্য ও জীবনসত্তা রক্ষা করে চলছে সৃষ্টির প্রথম থেকেই। আজ সেই পরিপূরকের জায়গাটায় ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে না পুরুষতান্ত্রিক পেশীর জোরের কারণে। এটাই কি আধুনিকতার পরিশীলিত রূপ? আজকে এ বিষয়টা প্রায় সকলেই বুঝে গেছেন নারী কেবল পুরুষের বিনোদনের যন্ত্রমাত্র। সুলভ কমোডিটি। কিন্তু আজ মানে তো একবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞানের যুগ। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগ। মানুষ শিক্ষায়-দীক্ষায়, রুচি, সংস্কৃতিতে অনেক এগিয়ে। এমন কি নারীশিক্ষা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণার ধ্বনি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ বিরাট সংখ্যাক নারী বাড়ির ভেতরের যাবতীয় কর্মের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ঘরের বাইরের কর্ম অঙ্গনকেও সচল করে রেখেছেন। বিরাট সংখ্যক নারী তাদের ক্যারিয়ারের সঙ্গে সঙ্গে সন্তান সংসার ও সামাজিক আচার, সবকিছুর মধ্যে সমতা রক্ষায় লিপ্ত। এমন কি নারী সমাজ তথা দেশের হালও ধরেছেন। অথচ চূড়ান্ত শীর্ষে পৌঁছেও সেই নারী নিজেকে অসহায় ভাবতে থাকেন। শরীরটাকে একটা শামুকের মতো খোলায় আবদ্ধ করে রাখেন। ভয়, কখন কী ঘটে যায়, কিছুই বলা যায় না। সভ্যতার এই চরম উন্নতির মুহূর্তে পরমপ্রাপ্তির ঝুলিতে কিন্তু এখনও নারীর নিশ্চিত নিরাপত্তা আসেনি। কেবল নারী নয় বাংলাদেশে শিশুরাও নিরাপদ নয়। সদ্য বুলি ফুটতে শেখা শিশুর প্রতিও যৌন নির্যাতন হয়। তাদের নিষ্পাপ সরলতার সুযোগ অধিক বিশ্বাস ও নির্ভরতার মধ্য দিয়ে শিশু কন্যাটিকে কোনও খাবারের লোভ দেখিয়ে বা টিভি দেখার কথা বলে নিকট আত্মীয়-পরিজন একান্তে নিয়ে গিয়ে তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে। সেই শিশুর কিশলয় মনে তখনও যৌন চেতনার কোনও ভাবই জাগ্রত হয় না। অথচ নিয়তির পরিহাসে তারা কিছু বিকৃতমনা লোকের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এছাড়াও বাইরে অপেক্ষা করে আছে লোলুপ দুর্যোধনের হিংস্র ভয়ানক থাবা। ধৃত ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করছে, আইনী সাজা হচ্ছে, কিন্তু সমাজ থেকে তা একেবারে বিলুপ্ত হচ্ছে না। এর কারণ কি? সহজ উত্তর— দারিদ্র্য। অর্থাত্ অর্থনৈতিক সংকটের ফলে আট-দশ বছর বয়সের বাচ্চা মেয়েদের বেরিয়ে পড়তে হয় অর্থ রোজগারের আশায়। আর, এই সুযোগ নিয়েই সুযোগ সন্ধানীর দল ঘটিয়ে চলে যত অঘটন, দুর্ঘটনা। আজ এক ভয়াবহ জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত এই সমাজ। এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকভাবে চরম অবক্ষয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও সেই নির্মম সত্যটা বারবার উঁকি দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, সভ্যতা এগোয়নি এক ফোঁটাও। আজও মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার নারী। তাদের স্থায়িত্বের সাম্মানিক নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের সমাজে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির মূলত কয়েকটি কারণের মধ্যে যৌনতাকে ভোগবাদের উপকরণে পরিণত করার পশ্চিমী ধারণা আজ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। আবার মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ার কারণেও নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। নারীর অবদান নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। প্রচার মাধ্যমেও বিষয়টি তুলে ধরছে কিন্তু যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হচ্ছে, সমাজের যে চালিকাশক্তি রাজনীতিবিদগণ, যাদের ওপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ভালো-মন্দ, যাদের নেতৃত্বের সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে জনগণের ভাগ্য জড়িত। তারা বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে মঞ্চের ভাষণে কেবল নারীর অবদানের কথা তুলে ধরেন। আবার নারীর প্রতি ভয়াবহ নির্যাতনের চরম মুহূর্তে তারা কোনও ভূমিকা রাখেন না। বা এই বিপর্যয় রোধে জাতীয় ঐক্যমত নিয়ে বসেন না। যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অপরদিকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে— জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সম্মিলিতভাবে সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এক গণসচেনতা সৃষ্টি করে নারীর জন্য এক নিরাপদ ভয়হীন ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ফলে বাংলাদেশ হবে নারীর প্রতি সহিংসতা বর্জিত সমতাভিত্তিক একটি দেশ। নারীর অভয়ারণ্য। এর ফলে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন লাল সবুজ রঞ্জিত পতাকা হাতে সভ্যতা ও আধুনিকতার বিরল দৃষ্টান্ত তুলে, মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশের নারী। শুধু সময়ের অপেক্ষা। লেখক :নারী অধিকার কর্মী