ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংস্কার ও সংরক্ষণ

রাজধানীর পুরাতন ঢাকার আরমানিটোলা কে পি ঘোষ স্ট্রিটে অবস্থিত মোগল আমলের হিঙ্গাবিবি মসজিদ। মসজিদটি ১৬৬৪ সালে প্রায় সাড়ে আট কাঠা জমির উপর নির্মিত হয়। মুসলিম নিদর্শনের অন্যতম সাক্ষী এই মসজিদটির নকশা ও কারুকাজ মনোমুগ্ধকর। কিন্তু দুই মাস আগে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল তথাকথিত সংস্কারের নামে মসজিদটির আসল আদল নষ্ট করিয়া ভাঙিবার কাজ শুরু করে। আংশিক ভাঙ্গিয়া ফেলার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের টনক নড়ে। শেষপর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন মসজিদটি ভাঙিবার কাজ বন্ধ করিয়াছে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর তাহা আগের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পুনঃনির্মাণের আশ্বাস দিয়াছে। স্থানীয় নাগরিকদের এই প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, মসজিদের মোতোয়াল্লী ও মসজিদ পরিচালনা কমিটি ইহার ঐতিহাসিক মূল্য অনুধাবনে ব্যর্থ হইয়াছে। আমরা বলিতেছি না যে, মসজিদটিকে বা এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ রাখিতে হইবে। সংস্কার বা মেরামত অবশ্যই করিতে হইবে। তবে জরাজীর্ণতা দূর করা আর ঐতিহ্য ধ্বংস করা এক কথা নহে। প্রাচীন স্থাপত্য ও নকশা অবিকল রাখিয়াও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় অবলীলায়। আরবান স্টাডি গ্রুপের দাবি অনুযায়ী গত চার মাসে পুরাতন ঢাকায় হেরিটেজ তালিকাভুক্ত ৫০টি ভবন ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছে। এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এইসব স্থাপনা রক্ষায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। অবশ্য তাহার আগে হেরিটেজ বা ঐতিহ্যময় স্থাপনার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেই কাজটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো করিতে পারেন নাই। ২০১৩ সালের মধ্যে এইরকম একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করিতে তাগিদ দেয় আদালত। তবে আমাদের আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন না করার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত আছে। এই ক্ষেত্রেও ইহার ব্যতিক্রম হয় নাই। এই অবহেলা ও কালক্ষেপণের কারণেও অনেক স্থাপনা ধ্বংস হইতেছে বৈকি। এই ধরনের যে কোন স্থাপনার আশেপাশে পর্যাপ্ত জায়গা থাকিলে সেখানে অনায়াসেই আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন পৃথক কোন ভবন এমনিতেই নির্মিত হইতে পারে। কিন্তু আদি ভবনের কাঠামো ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্যে হাত দেওয়া অনুচিত। ইহাতে স্থাপনাগুলি প্রত্ন বৈশিষ্ট্য হারায়। বাংলাদেশের কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ইতোমধ্যেই বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করিয়া নিয়াছে। যেমন-ষোড়শ শতাব্দীর ইসলামী স্থাপত্যের বড় নিদর্শন বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। ইহার বাহিরে কুমিল্লার কোর্টবাড়ি, বগুড়ার মহাস্থানগড়সহ আরও নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা রহিয়াছে আমাদের দেশে। এইসব স্থাপনা রক্ষার গুরুত্ব আসলে অপরিসীম। ইহা না থাকিলে আমরা জাতি হিসাবে নিঃস্ব হইয়া যাইব। এইসব স্থাপনা সংশ্লিষ্ট দেশ বা এলাকার পরিচিতি ও নান্দনিকতার প্রতীক। প্রাচীন, মধ্যযুগ এমনকি একশত-দুইশত বত্সর আগে আধুনিককালে বাংলাদেশ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী দ্বারা শাসিত হইয়াছে। যেমন-মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, হিন্দু রাজা-মহারাজা-জমিদার, মুসলিম সুলতান ও ইংরেজদের দ্বারা। তাহাদের শাসনামল ভাল-মন্দ যাহাই হউক না কেন, তাহাদের রাখিয়া যাওয়া কীর্তি ও স্মৃতিময় স্থাপনা ধরিয়া রাখা অত্যাবশ্যক। ইহার মাধ্যমে একটি দেশের পর্যটন খাত বিকশিত হয় এবং ইহা শিল্পের মর্যাদা লাভ করিয়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বার খুলিয়া দেয়। তবে তাহার চাহিতেও বড় কথা হইল, এইগুলি জাতির গৌরবময় ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের স্মারক। একইসঙ্গে সভ্যতার ধারক-বাহক। অতীতের এই নিদর্শনাবলী আমাদের ভবিষ্যতের চলার পথ বাতলাইয়া দেয়। এমনকি প্রতিবেশীসহ সংশ্লিষ্ট সভ্যতার অধিকারী দেশের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রক্ষায় ইহার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যতদূর জানা যায়, এই উপমহাদেশে প্রত্নসম্পদ রক্ষায় প্রথম আইন হয় ১৯১৯ সালে যাহা ট্রেজার ট্রব অ্যাক্ট নামে পরিচিত। ১৯৬৮ সালে অ্যান্টিকুইটিজ অ্যাক্ট নামে আরও একটি আইন করা হয়। অর্থাত্ প্রত্নসম্পদ বা ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষায় আইনের অভাব আছে বলিয়া মনে হয় না। তাহার পরও এইগুলি ধ্বংস, চুরি, পাচার ইত্যাদির মাধ্যমে বিলুপ্তির পথে। ইহার সুরক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর গঠন করা হইয়াছে ঠিকই, তবে ইহাকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা দরকার। অধিদফতরের অফিস ও মাঠ পর্যায়ে জনবল বাড়ানো আবশ্যক। ইহাছাড়া বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় প্রত্নতত্ত্ব জরিপ ও তালিকা প্রণয়নের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করিতে হইবে। নূতন নূতন যেইসব প্রত্নসম্পদ আবিষ্কৃত হইতেছে, তাহার সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নিতে হইবে।