[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া সংকট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শীতল যুদ্ধের আবির্ভাব ঘটে। দীর্ঘ চার দশকেরও অধিক কাল শীতল যুদ্ধের বাস্তবতা পৃথিবীর সকল প্রান্তে অপরিসীম প্রভাব রেখেছিল। বিশ্বে তৈরি হয়েছিল একটি দ্বিমেরু কেন্দ্রিক শক্তি ব্যবস্থা। ১৯৯০-৯১ সালে শীতল যুদ্ধ এবং দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার অবসান ঘটে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নায়ু যুদ্ধোত্তর বাস্তবতা নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। কারো মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণা উঠে আসে, কেউ কেউ বলেছেন, একটি বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার কথা। কিন্তু বলকান অঞ্চলের গৃহযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালের বসনিয়াসহ নতুন নতুন রাষ্ট্রের আবির্ভাবে উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং নাইন ইলেভেনের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিকে একটি জটিল হিসাব-নিকাশের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, পাশাপাশি আমরা লক্ষ্য করছিলাম স্নায়ু যুদ্ধোত্তর বিশ্ব নেটো সদর্পে তার উপস্থিতি বজায় রাখে। সংস্থাটি শীতল যুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত হলেও শীতল যুদ্ধের সমাপ্তির পরেও এর বিস্তার অব্যাহত থাকে। যা আফগানিস্তান থেকে শুরু করে সাবেক সোভিয়েত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ইউরোপিয় ইউনিয়নও পশ্চিম ইউরোপ থেকে বাল্টিক অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। নেটো এবং ইউরোপিয় ইউনিয়নে ব্যাপক সম্প্রসারণ রাশিয়ার নেতৃত্বের কাছে বরাবরই একটি উদ্বেগের বিষয় ছিল। তথাপি বিশ্বায়নের বাস্তবতায় কোন ধরনের সংঘর্ষ কিংবা বড় কোন সংকট ছাড়াই ইউরোপিয় রাজনীতি ও নিরাপত্তা স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলে। এই ধরনের একটি প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনে আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সম্প্রতি একটি নতুন মাত্রা লাভ করে। ইউক্রেন সংকটের মূলে ছিল দেশটি। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রুশ সমর্থিত সরকারের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল তথা পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি অবস্থান। সিদ্ধান্তের বিষয়টি ছিল ইউক্রেনের সঙ্গে ইউরোপিয় ইউনিয়নের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা, যার মাধ্যমে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। দেশটির বিরাজমান ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকট এই মুখাপেক্ষিতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারে এই ধরনের একটি বাস্তব আশংকা তৈরি হয়। ইউক্রেন সরকারের কাছে এই ধরনের পরিস্থিতি মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কয়ারে শুরু হয় ব্যাপক সরকার বিরোধী বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভ নিয়ে গণমাধ্যমের বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয় ইউনিয়ন সরাসরি এই বিক্ষোভকে মদদ দিচ্ছে। সামগ্রিক বিষয়টি ইউক্রেন সরকার এবং প্রতিবেশি রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক পর্যায়ে দেখা গেলো, রাশিয়া সমর্থিত সরকার বিক্ষোভ ও বিরোধীদের চাপে ইউক্রেন থেকে পালিয়ে যায় এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন কার্যত পশ্চিমা বিশ্বের সম্পূর্ণ দ্বারস্থ হয়ে পড়ে। রাশিয়া বিষয়টিকে তার জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট হিসাব বিবেচনা করে ইউক্রেন সংকটের বিষয়ে। তার প্রথম প্রকাশ হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা অস্বীকার এবং প্রত্যাখ্যান করা। রাশিয়া এটিকে অভ্যুত্থান হিসাবে বিবেচনা করে এবং এর পেছনে একদিকে রুশ বিরোধী ইউক্রেনিয় জাতীয়তাবাদী এবং তাদের পেছনে পশ্চিমাদের সমর্থনকে দায়ী করে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের রাজনৈতিক সংকট ক্রিমিয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে এবং বর্তমান বিশ্ববাসী ক্রিমিয়া সংকটের বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বস্তুত ক্রিমিয়া সংকট ইউরোপে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ক্রিমিয়া সংকট মূলত একটি চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে এই অঞ্চলটির স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তীকালে রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। ক্রিমিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইতিহাস এক্ষেত্রে বিশেষ তাত্পর্য বহন করে। ১৯৫৪ সালের আগে ক্রিমিয়া রুশ প্রজাতন্ত্রের অংশ ছিল। পরবর্তীকালে ইউক্রেনের অংশ হিসাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের মধ্যে এই ভূখন্ডটি তার নিজস্ব পরিচয় বহন করে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর রাশিয়ার নেতৃত্ব ক্রিমিয়ার ব্যাপারে নতুন কোন দাবি উত্থাপন না করে ইউক্রেনের অংশ হিসাবে মেনে নেয়। ফলে ক্রিমিয়া রাশিয়ার জন্য ভূরাজনৈতিকভাবে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি ক্রিমিয়ার অংশ হিসেবে থেকে যায়। পাশাপাশি ক্রিমিয়াতে সাত শতাংশের বেশি রুশ জাতীয়তাবাদী পরিচয়ধারী জনগণ বাস করে। দেখা যাচ্ছে, জাতিগত এবং সামরিক কৌশলগত দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অংশ হলেও রাশিয়ার জন্য একটি ভাইটাল রিজিয়াম। ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে ক্রিমিয়ার জনগণ তাদের জাতিগত আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ এবং রাশিয়ার কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জনের একটি মোক্ষম সুযোগ চলে আসে। এই সুযোগে রাশিয়ার জন্য বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক হলেও ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর একটা বড় ধরনের আঘাত। আন্তর্জাতিক আইনে একটি স্বাধীন দেশের ভূখন্ডে সরাসরি আক্রমণের কিংবা দখলের সুযোগ নেই। কিন্তু ক্রিমিয়া পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রম দাবি রাখে। যা এই নিবন্ধের প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রিমিয়া এই গণভোটের আগেও ইউক্রেনিয় রাষ্ট্রের অধীনে বেশ স্বায়ত্তশাসনের সুবিধা ভোগ করছিল। যে কারণে ক্রিমিয়াতে একটি পৃথক আইন সভা এবং সরকার ব্যবস্থা ছিল যা ক্রিমিয়ার স্বাধীনতা তথা রাশিয়ার সংযুক্তিকে এক ধরনের বৈধতার সুযোগ করে দেয়। তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বৈধতা ও অবৈধতার বিতর্কে তোলা গেলেও ক্রিমিয়া পরিস্থিতি মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক। যে ক্রিমিয়া পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে তা বস্তুত ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ব্যর্থতার ফলাফল। একটি দেশ তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশি শক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ায় যে ধরনের দেউলিয়াত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় তার একটি নমুনা হলো ইউক্রেন। দেশটির স্বাধীনতার বয়স খুব বেশি নয়। তবে জাতি গঠনের সময়ও বেশি পায়নি। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব বহুধাবিভক্ত হয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অনেক আগেই বিপন্ন করে তুলেছে। তথাকথিত পশ্চিমাপন্থি, রুশপন্থি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির এক ক্রমবর্ধমান সাংঘর্ষিক খেলায় পরিণত হয়েছে। এখানে বহিঃশক্তিসমূহ ইউক্রেনকে দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করছে। ফলে দেশটি ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভেঙ্গে পড়ে। নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে সংকট আরো ঘনীভূত হয়। যার ফলে আজকে প্রশ্ন উঠেছে ক্রিমিয়াকে কেন্দ্র করে নয়া শীতল যুদ্ধ শুরু হচ্ছে কি-না। ইতোমধ্যেই ক্রিমিয়া পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব এবং অন্যদিকে রাশিয়া মুখোমুখি অবস্থানে আছে। সম্মুখযুদ্ধের অবস্থা না থাকলেও পরস্পরের মধ্যে কোন নৈতিক অবরোধ আরোপ করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে ক্রিমিয়া এবং রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ীদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তার জবাবে রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় ইউনিয়নের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির উপর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। যতটুকু বুঝা যায়, পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে সীমিত আকারের হলেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে সক্রিয় চিন্তা করছে। ইতোমধ্যে জিএইট থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং রাশিয়াতে অনুষ্ঠিতব্য জিএইচ শীর্ষ বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। ফলে পশ্চিমা বিশ্ব সর্বশক্তি দিয়ে রাশিয়াকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য জাতিসংঘকে ব্যবহার করা হলেও পশ্চিমা বিশ্ব সফল হয়নি। চীন ও ভারত বিশ্বের প্রভাবশালী পক্ষ হিসাবে এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে চেষ্টা করছে। যদিও এটা সকলের কাছে অভিহিত যে, চীন ও ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে অনেক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মতানৈক্য রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়াকে কূটনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা কতটুকু সম্ভব সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। তাছাড়া রাশিয়া বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র। বিশ্বের সর্ববৃহত্ পাঁচটি অর্থনতির একটি হচ্ছে রাশিয়া এবং সামরিক শক্তির দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। ফলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা কোন শক্তি প্রয়োগ করে রাশিয়া বা পশ্চিমা বিশ্ব কোন পক্ষেই দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা অর্জন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এতই জটিল এতই বহুমাত্রিক যে এখানে সহসা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ ব্যাপার। বরং উভয়পক্ষের মধ্যে সংযম প্রদর্শন করে একটি কার্যকর সমাধানের পথ বের করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, ইউক্রেনের ভঙ্গুর অর্থনীতি কিভাবে পুনরুদ্ধার করা হবে। আজকে ইউক্রেনের সামনে ক্রিমিয়া পক্ষ ত্যাগ করেছে কিন্তু দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি কিভাবে উন্নতি করা সম্ভব তাও একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। যেভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গ্রাস করছে সে কারণেই দেশটিতে পশ্চিমাপন্থি, রুশপন্থিরা ডামাডোল বাজাচ্ছে। আজকের এই সংকটময় দেশটিকে উদ্ধার করার জন্য কি ধরনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তা ভাবা আসু প্রয়োজন। আমাদের কাছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধের নতুন করে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি মুখ্য চিন্তার বিষয় হলেও ইউক্রেন রাষ্ট্রটি কি তাই নতুন বাস্তবতায় ধুঁকে ধুঁকে জ্বলবে? লেখক:অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়