নীরব সন্ত্রাসের অজানা কাহিনী
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৪, ২১:৫৪
কিছুকাল আগেও সাধারণ মানুষের মাঝে পানি কিনে খাওয়ার ধারণাটি অমূলক ছিল। ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে রাজধানী ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বোতলজাত ও জারজাত পানির একটি বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। দূষিত পানি ব্যবহারে আমাশয়, কলেরা, টাইফয়েট, জন্ডিসসহ নানা দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অফিস কিংবা বাইরে কোথাও বের হলে দশ টাকায় এক বোতল পানি কিনতে অনেকেই আমরা দ্বিধা করি না। প্রতিনিয়ত যাদের বাইরের পানি খেতে হয় তারা একটু সাশ্রয়ী হতে নীল জারের এক গ্লাস পানি ১/২ টাকায় কিনে খান। কিন্তু পয়সা খরচ করে পানি কিনে খেয়েও আমরা কতটা নিরাপদ। র্যাবের ধারাবাহিক অভিযানে বেরিয়ে এসেছে নীরব সন্ত্রাসের অজানা কাহিনী। এমনই দুটি কাহিনী তুলে ধরা হল যার সময় ও চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও মূল ঘটনা বাস্তব থেকে নেয়া।
কেইস স্টাডি-১ ঃ বিশুদ্ধ খাবারপানি জারে বাজারজাতকরণে যারা পাইওনিয়ার ছিলেন তাদের অন্যতম মোস্তাক সাহেব-শিক্ষিত, মার্জিত, বিনয়ী। শিল্পপতি বাবার মৃত্যুর পর ব্যবসায়ে ধস নামে। ধানমন্ডির পৈত্রিক বাড়ী বিক্রয় করে গাজীপুরে অত্যাধুনিক খাবার পানি তৈরির প্ল্যান্ট স্থাপন করেন। তার হাত ধরেই এদেশে আরও বেশ কিছু মানসম্মত প্ল্যান্ট তৈরি হয়েছে এবং এ সেক্টরে বাজার সৃষ্টি হয়েছে। আজ বুকের ব্যথা নিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে গিয়েছিলেন চেকআপ করতে। খবর পেলেন র্যাব তার বনানীর বাড়িটি ঘিরে রেখেছে। নিজেই গাড়ী ড্রাইভ করে ছুটে এলেন বনানীতে। ম্যাজিস্ট্রেট ও র্যাব কর্মকর্তাগণ তাকে নিয়ে বাড়ীর ভিতর ঢুকলেন। আবিষ্কার হল একটি অবৈধ খাবার পানি তৈরির কারখানা। অসংখ্য উইপোকা বাসা বেঁধেছে দেয়ালে। অপরিচ্ছন্ন দেয়ালগুলোতে কতনা জীবানুর ছড়াছড়ি। একজন সচেতন মানুষ হয়েও গাজীপুরে একটি অত্যাধুনিক প্ল্যান্ট থাকা সত্ত্বেও নোংরা পরিবেশে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে কেন তিনি এমন অপরাধ করছেন জানতে চাইলে তিনি আবেগী হয়ে উঠে বলেন, ‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি অপরাধী, আমি চোর, আমার শাস্তি হওয়া উচিত; কিন্তু কেন আমি অপরাধ করেছি তাও জানতে হবে; মানুষকে বিশুদ্ধ পানি খাওয়াতে আমি একটি বাড়ী বিক্রি করেছি; গাজীপুরের প্ল্যান্ট কেমিস্ট এবং কর্মচারীদের বেতন দিয়ে প্রতি জার পানি উত্পাদন খরচ পড়ে চল্লিশ টাকা; পরিবহন খরচ যোগ করলে ষাট টাকার কমে পানি বিক্রি করলে লাভ থাকে না; কিন্তু এখন পঁচিশ টাকার কমে সর্বত্র পানি পাওয়া যাওয়ায় আমার পানি বাজারে টিকে থাকতে পারছে না; তাই দুই গাড়ী পানি গাজীপুর থেকে এনে কিছু নির্দিষ্ট কাস্টমারকে দেই আর বাকি আট গাড়ী পানি এখান থেকেই যায়; দেনার দায়ে গাজীপুরের প্লান্ট বিক্রির ব্যবস্থা নিচ্ছি।’’ তার পাশের বাড়ীর ভদ্রলোকের অবস্থা আরও শোচনীয়। বাড়ীর ছাদের ট্যাংকে পাইপ লাগিয়ে সরাসরি ভরছেন জারগুলো।
কেইস স্টাডি- ২ ঃ হাসান লেখাপড়া বেশিদূর করতে পারেনি বলে নিজেই কিছু একটা করার চেষ্টা করছিল। বিশ হাজার টাকা সুদে নিয়ে পঁচিশটি নীল জার এবং একটি পুরোনো ভ্যানগাড়ী কিনে একটি বিশুদ্ধ খাবার পানি উত্পাদক প্রতিষ্ঠানের ডিলার হয়েছে। নির্ধারিত এলাকায় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, অফিস আদালতে জার প্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকায় পানি সরবরাহ করে। কিনে আনে পাঁচ টাকায়। অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে তার ব্যবসা বাড়িয়েছে। এখন তার জারের সংখ্যা পঞ্চাশ, প্রতিটির গায়ে নিজের নামে স্টিকার লাগানো আছে। তার একমাত্র কর্মচারী ভ্যানচালক ফরিদকে নিয়ে আজ সকাল সকাল কারখানায় এসে খালি জারগুলো ভরছিল। আচমকা হাজির হলো মোবাইল কোর্ট। কারখানার মালিকের সাথে হাসানকেও ধরা হল, তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল - সে মেহনতী মানুষ, তার কি অপরাধ? মালিক স্বীকার করেছে সে খরচ কমাতে রিফিল করার পূর্বে ডিলারদের জার জীবানুনাশক দিয়ে ধোয় না। ডিলারগণ নির্ধারিত ব্র্যান্ড ছাড়াও নিজেদের নামে পানি বাজারে ছাড়ে যেখানে কারখানার ঠিকানা, মেয়াদকাল ইত্যাদি তথ্য থাকে না। হাসান এসব বুঝতে চায় না। খেয়ে না খেয়ে অতি কষ্টে জমানো টাকায় কেনা জারগুলো জব্দ করা হয়েছে। চোখে জল নিয়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।
নীরব সন্ত্রাসের অজানা কাহিনী ঃ কেইস স্টাডিগুলোর বিষয় ছিল- বিশুদ্ধ পানি তৈরির কারখানা। রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশে বৈধ/অবৈধ প্রায় তিনশতটি খাবার পানি তৈরির কারখানা রয়েছে। অধিকাংশ কারখানার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। সেগুলোতে প্রায় ক্ষেত্রেই যে সমস্যা দেখা যায় তা নিম্নরূপ ঃ
নীল রঙ্গের ১৯ লিটার জারে পানি সরবরাহ করা হয়। রিফিল করার পূর্বে এগুলো জীবানুমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরী। জীবানুনাশক (যেমন হইড্রোজেন পার অক্সাইড) দিয়ে এগুলোকে জীবানুমুক্ত করার বাধ্য বাধকতা থাকলেও তা করা হয় না। কারণ তাতে জার প্রতি খরচ হয় ২/৩ টাকা। শুধু পানি দিয়ে ঝাঁকিয়ে দৃশ্যমান ময়লা পরিষ্কার করা হয় কিন্তু কলেরা, আমাশয়, জন্ডিস, টাইফয়েড প্রভৃতি পানি বাহিত জীবানু ধ্বংস হয় না। জারগুলো যে প্রতিষ্ঠান, হোটেল রেস্টুরেন্টে সরবরাহ করা হয় খালি হওয়ার পর তা অত্যন্ত অনাদরে ফেলে রাখা হয় অনেক সময় স্থানাভাবে বাথরুম বা টয়লেটের ভেতরেও রাখতে দেখা যায়। আবার ফেরত আনার সময় এগুলোর মুখ বন্ধ থাকে না বলে পাখির মল, ধুলা-বালি, জীবানু খুব সহজেই এগুলোর ভেতর ঢুকে যেতে পারে। তাই জীবানু নাশক দিয়ে জার ধোয়া জরুরী। জার ধোয়ার জন্য ওয়াসিং প্ল্যান্ট ব্যবহার করা উচিত, কিন্তু তা না করে হাতে ধোয়া হয়।
জারে পানি রিফিল করার সময় ফিলিং মেশিন ব্যবহার করা উচিত এবং ফিলিং মেশিনের সাথে আল্ট্রাভায়োলেট-রে থাকা উচিত। ফিল্টারের মাধ্যমে পানির ময়লা ছাকা হলেও জীবানু ছাকা যায় না। এই রে এর মাধ্যমে জীবানু ধ্বংস করা হয়। একটি প্রমাণ সাইজের রে এর বাল্বের মূল্য পনের হাজার টাকা। একবার এ বাল্ব নষ্ট হলে তা পরিবর্তন করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে আল্ট্রাভায়োলেট রে (U-V-Ray) মেশিনটিই থাকে না।
আসন্ন গরমে নগরবাসী পানি বাহিত রোগ থেকে মুক্ত থাকুক- বিশ্ব পানি দিবসে এই কামনা।
লেখক :নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, র্যাব